২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 08 May 2026, 08:11 AM
বয়সের তুলনায় অনেক পরিণত, মাঝমাঠে সুর বেঁধে দেওয়া, শারীরিক শক্তি ও গতির সঙ্গে অসাধারণ কৌশল, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল করার সামর্থ্য- এই বিষয়গুলো খুব ভালোভাবেই যায় জুড বেলিংহ্যামের নামের সঙ্গে। সময়ের সেরা মিডফিল্ডারদের একজন এই তারকা ক্লাব রেয়াল মাদ্রিদ ও জাতীয় দল ইংল্যান্ডের জন্য খুবই অপরিহার্য। হয়ে উঠেছেন বড় ম্যাচের খেলোয়াড়।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন ইংলিশ মিডফিল্ডার জুড বেলিংহ্যাম।
জুন-জুলাইয়ে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের সময় ২৩ বছর পূর্ণ হবে বেলিংহ্যামের। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অর্ধশত ম্যাচ খেলার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন তিনি। সব কিছু ঠিক থাকলে ইংল্যান্ডের জার্সিতে তার ম্যাচ খেলার হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ হবে বিশ্বকাপের মঞ্চেই।

ফুটবলের আঙিনায় বেলিংহ্যামের অর্জন
পেশাদার ফুটবলে বেলিংহ্যামের অভিষেক হয় ১৬ বছর ৩৮ দিন বয়সে, বার্মিংহাম সিটির হয়ে। তার আগে থেকেই অবশ্য তাকে নিয়ে আলোচনা ছিল অনেক। দারুণ প্রতিভা, অসাধারণ দক্ষতা মিলিয়ে বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত একজন হিসেবে নজর কাড়েন তিনি।
সেই প্রতিভা এখন আরও প্রস্ফুটিত হয়েছে। বার্মিংহামের হয়ে অভিষেকের পর সাত বছরে ফুটবল বিশ্বের বড় নামগুলির একটিতে পরিণত হয়েছেন বেলিংহ্যাম।
বার্মিংহামের একাডেমিতে বেড়ে ওঠার পর, মূল দলে এক মৌসুম কাটিয়ে নিজ দেশ ছেড়ে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেন বেলিংহ্যাম। অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন জার্মান দলটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। আলোড়ন ফেলে দেন বুন্ডেসলিগায়। স্রেফ ১৯ বছর বয়সেই ডর্টমুন্ডের নেতৃত্ব পেয়ে জন্ম দেন নতুন ইতিহাসের।
সব মিলিয়ে ক্লাবটির হয়ে ১৩২ ম্যাচে ২৪ গোল করেন তিনি। আরও অবদান রাখেন ২৫টিতে।
২০২৩ সালের জুনে ছয় বছরের চুক্তিতে তিনি যোগ দেন রেয়াল মাদ্রিদে। সান্তিয়াগো বের্নাবেউয়েও দ্রুত মানিয়ে নেন নিজেকে। দলটির জার্সিতে লা লিগায় প্রথমবার খেলতে নেমে করেন নান্দনিক এক গোল। দ্বিতীয় ম্যাচে গোল করেন দুটি। দুই ম্যাচেই পান সেরার স্বীকৃতি।
বেলিংহ্যামের অনেক গুণের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, যখন দলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই নিজের সেরাটা তিনি দেন। ক্লাব ও দেশের হয়ে বড় বড় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত তিনি তৈরি করেছেন। স্পেনের দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী রেয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার ক্লাসিকোতে যোগ করা সময়ে তার জয়সূচক গোল আছে দুটি। ইংল্যান্ডের হয়েও বড় মঞ্চে গোল করেছেন তিনি।
রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে এখন পর্যন্ত একটি করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা, স্প্যানিশ সুপার কাপ, উয়েফা সুপার কাপ ও ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জিতেছেন বেলিংহ্যাম। ইংল্যান্ডের হয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে দুইবার রানার্সআপ পদক পেয়েছেন তিনি।

কোচ, সতীর্থ ও পূর্বসূরির চোখে বেলিংহ্যাম
“অবিশ্বাস্য একজন খেলোয়াড় সে। তার খেলার ধরন, যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সে খেলে এবং যেভাবে খেলায় প্রভাব ফেলে, অসাধারণ। এই পজিশনে খেলা ফুটবলারদের জন্য গোল ও অ্যাসিস্ট করাটা গুরুত্বপূর্ণ এবং ঠিক সেটাই করে সে।”
- হ্যারি কেইন, ইংল্যান্ড অধিনায়ক
“এত অল্প বয়সে সে যতটা পরিণত, তা অবিশ্বাস্য। আমার মনে হয়, দেশের বাইরে খেলাটা এক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করেছে। জুডের ক্ষেত্রে বিষয়টা শুধু তার প্রতিভা নয়, বরং তার ব্যক্তিত্বও (ভূমিকা রেখেছে) এবং তার নিজেকে সামলানোর ধরনটাও গুরুত্বপূর্ণ। সে একজন আদর্শ পেশাদার, জানে তাকে কী করতে হবে।”
- ডেভিড বেকহ্যাম, ইংল্যান্ডের গ্রেট ফুটবলার
“বেলিংহ্যাম ফুটবলের জন্য এক উপহার। এমন সম্ভাবনাময় ও ইতিবাচক ভাবমূর্তির একজন খেলোয়াড়কে দেখে গোটা ফুটবল দুনিয়া উচ্ছ্বসিত।”
- কার্লো আনচেলত্তি, রেয়াল মাদ্রিদের সাবেক কোচ ও বর্তমানে ব্রাজিলের কোচ

পরিসংখ্যানের আলোয় বেলিংহ্যাম
• ইংল্যান্ডের ইতিহাসে তৃতীয় কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় দলে অভিষেক হয় বেলিংহ্যামের, ১৭ বছর ১৩৬ দিন বয়সে। তার চেয়ে কম বয়সে ইংল্যান্ডের হয়ে অভিষেক হয়েছে শুধু থিও ওয়ালকট ও ওয়েইন রুনির।
• রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে অভিষেক মৌসুমে (২০২৩-২৪) লা লিগার মৌসুম সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন বেলিংহ্যাম। ওই মৌসুমে তিনি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের বর্ষসেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জেতেন এবং ২০২৪ সালের ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কারের ভোটিংয়ে তৃতীয় হন।

বিশ্ব মঞ্চে বেলিংহ্যাম
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ দিয়ে বিশ্ব মঞ্চে অভিষেক বেলিংহ্যামের। তখন টিনএজার হলেও ইংল্যান্ড দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। বৈশ্বিক আসরে নিজের ছাপ ফেলতে বেশি সময় লাগেনি তার। প্রথম ম্যাচে ইরানের বিপক্ষে ৬-২ গোলের জয়ে তিনিই করেন ইংল্যান্ডের প্রথম গোল।
ওই আসরে ইংল্যান্ডের পাঁচ ম্যাচেই শুরুর একাদশে ছিলেন বেলিংহ্যাম। শেষ ষোলোয় সেনেগালের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে জর্ডান হেন্ডারসনের গোলে অ্যাসিস্ট করেন তিনি। নাটকীয় কোয়ার্টার-ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয় ইংল্যান্ডের।

২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে বেলিংহ্যাম ও ইংল্যান্ডের প্রত্যাশা
কোচ টমাস টুখেলের হাতে যত প্রতিভা আছে, তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশেলে যেমন তার দল, তাতে ২০২৬ বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নিয়েই খেলতে নামবে ইংল্যান্ড।
আর সেখানে বেলিংহ্যাম হতে পারেন ইংল্যান্ডের চালিকাশক্তি, সেটা তিনি মাঝমাঠের নিচে নেমে খেলুন কিংবা আক্রমণভাগে থেকে ‘গোলমেশিন’ নাম্বার নাইন হ্যারি কেইনকে গোলের জোগান দিন।
যে পজিশনেই তাকে খেলানো হোক না কেন, বেলিংহ্যাম বারবার প্রমাণ করেছেন, তিনি বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর মেলার পালা- ৬০ বছরের মধ্যে ইংল্যান্ডকে প্রথম বিশ্বকাপ জেতাতে সাহায্য করতে পারবেন বেলিংহ্যাম?
আগামী ১৭ জুন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ১৯৬৬ সালের শিরোপা জয়ীরা। ‘এল’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ ঘানা ও পানামা।