Published : 04 Sep 2025, 04:47 PM
ইংল্যান্ড দলে প্রথমবার ডাক পেয়ে এমনিতেই চমকে গিয়েছিলেন জেড স্পেন্স। কোচ টমাস টুখেলের সঙ্গে আগে কখনও কথাই হয়নি তার। জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া তাই তার প্রত্যাশার সীমানায় ছিল না। পরে যখন জানতে পারলেন, ইংল্যান্ডের প্রথম প্রকাশ্য মুসলিম হিসেবে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন তিনি, তার বিস্ময় আর উচ্ছ্বাস যেন ছুঁয়ে ফেলল আকাশ।
২০২২ সালে ইংল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-২১ দলে সুযোগ পেয়েছিলেন স্পেন্স। পেশাদার ফুটবলে পা রাখার সাত বছর পর অবশেষে জাতীয় দলের ঠিকানা পেলেন টটেনহ্যাম হটস্পারের এই ফুল ব্যাক। অ্যান্ডোরা ও সার্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ইংল্যান্ড দলে জায়গা পেলেন ২৫ বছর বয়সী ডিফেন্ডার।
স্পেন্সের জন্ম-বেড়ে ওঠা লন্ডনে। তবে তার মা কেনিয়ান, বাবা জ্যামাইকান। তার বড় বোন কার্লা-সিমোন স্পেন্স বেশ জনপ্রিয় অভিনেত্রী।
এখন তিনি নাম লেখাতে চলেছেন ইতিহাসে। ইংল্যান্ডের প্রথম প্রকাশ্য মুসলিম ফুটবলার হতে যাচ্ছেন, এটা জানার পর স্পেন্সের আনন্দের মাত্রা বেড়ে গেছে বহুগুণে।
“খবরটি দেখেছি আমি। এটা একটা আশীর্বাদ। এটা অসাধারণ ব্যাপার। আমি জানার পর খুবই অবাক হয়েছি… আমিই প্রথম! দারুণ ব্যাপার… ভাষা হারিয়ে ফেলেছি সত্যি বলতে।”
প্রথম মুসলিম ফুটবলার হিসেবে কোনো চাপ অনুভব করছেন না, এই প্রশ্নে স্পেন্স শুরুতে বললেন, “হয়তো… হয়তো নয়!”
পরে বললেন, সবসময় হাসিখুশি থাকাই তার জীবনের নীতি।
“এমনিতে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ে আমি চাপ অনুভব করি না। স্রেফ মুখে এক টুকরো হাসি নিয়ে ফুটবল খেলি, খুশি থাকি। বাকিটুকু নিজস্ব গতিতেই চলে।”
ধর্মের প্রতি অনুরাগের ব্যাপারটি নিয়ে কোনো লুকোছাপা নেই স্পেন্সের। বরং এটা নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন, সামাজিক মাধ্যমেও নিয়মিত তা তুলে ধরেন। স্রষ্টার প্রতি অগাধ আস্থার কথা জানালেন জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পরও।
“প্রথম ব্যাপার হলো, আল্লাহই সর্বশক্তিমান। আমি অনেক প্রার্থনা করি, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে, সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে, সবসময় বিশ্বাস করেছি আল্লাহ আমার পাশে আছেন।”
“যখন আমি জিতে চলেছি, খুব ভালো সময়ে আছি, তখনও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকি, কারণ তিনি সবসময় আমার পাশে থাকেন। আমার বিশ্বাস আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার।”
কঠিন সময় তার জীবনে অনেক এসেছে বটে। ফুটবল ক্যারিয়ারের বেশির ভাগটুকুই তো কেটেছে নানা ক্লাবে ধারে খেলে।
ফুলহ্যামের একাডেমি থেকে উঠে এসে পেশাদার ফুটবলে তার বিচরণ শুরু ২০১৮ সালে মিডলসব্রার হয়ে। উত্তর ইয়র্কশায়ারের ক্লাবটির হয়ে তার অভিষেক হয় ওই বছর। তবে দলে জায়গা পাকা করতে পারেননি লম্বা সময়ে। ২০২১ সালে তাকে ধারে পাঠানো হয় নটিংহ্যাম ফরেস্টে। সেখানে দ্বিতীয় স্তরে দুর্দান্ত পারফর্ম করে বড় ভূমিকা রাখেন নটিংহ্যামের প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত হওয়ায়।
সেই মৌসুমের পারফরম্যান্সে বেশ কটি বড় ক্লাবের নজরে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে ২ কেটি পাউন্ডে তাকে পাঁচ বছরের চুক্তিতে দলে নেয় টটেনহ্যাম হটস্পার।
এত বড় ক্লাবে সুযোগ পেয়ে যখন তিনি উচ্ছ্বাসে ভাসছিলেন, আচমকাই ভূপাতিত হয়ে পড়েন কোচের মন্তব্যে। সেই সময়ের কোচ আন্তনিও কন্তে প্রকাশ্যেই বলে বসেন, “তাকে আমি দলে নেইনি। এটা ক্লাবের সিদ্ধান্ত, ক্লাবের বিনিয়োগ…।”
পেছন ফিরে তাকিয়ে স্পেন্স বললেন, সেই সময়টা ছিল তার জীবনের কঠিনতম অধ্যায়। তবে তিনি ভেঙে পড়েননি তাতে।
“তখন খুবই ভালো খেলছিলাম আমি, নটিংহ্যাম ফরেস্টের হয়ে দারুণ খেলে (প্রিমিয়ারে) উন্নীত হলাম। খুশিতে উড়ছিলাম যে টটেনহ্যামে যোগ দিচ্ছি। এরপর এরকম একটি মন্তব্য শোনা ভালো কিছু ছিল না। এসবে আত্মবিশ্বাস কিছুটা ভেঙে যায় বটে।”
“তবে আমি একজন যোদ্ধা। যা কিছুই করি, সবকিছুতে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি।”
বদলি হিসেবে টুকটাক সুযোগ পেলেও অনুমিতভাবেই টটেনহ্যামের স্কোয়াডে তার নিয়মিত জায়গা মেলেনি। ফরাসি ক্লাব রেনে, ইংলিশ ক্লাব লিডস ইউনাইটেড, স্পেনের ক্লাব জেনোয়ায় ধারে সময় কাটতে থাকে তার।
অবশেষে গত বছরের অগাস্টে টটেনহ্যামের হয়ে আবার মাঠে নামার সুযোগ পান তিনি দেড় বছরের বেশি সময় পর। বদলি নেমে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে প্রথম একাদশেও জায়গা করে নেন। টটেনহ্যামে নাম লেখানোর ৮৮১ দিন পর প্রথমবার শুরুর একাদশে ঠাঁই পান তিনি গত ডিসেম্বরে।
তার ফর্ম আর দলের বেশ কজনের চোট মিলিয়ে একাদশে নিয়মিত সুযোগ পেতে থাকেন তিনি। পারফরম্যান্সও মেলে ধরেন। গত ফেব্রুয়ারিতে মাস-সেরার স্বীকৃতিও পান। প্রিমিয়ার লিগে প্রথম গোলের স্বাদ পান ওই মাসেই। পরে ইউরোপা লিগের ফাইনালে বদলি হিসেবে নেমে অবদান রাখেন দলের শিরোপা জয়ে।
সেই পারফরম্যান্সের পথ ধরেই খুলে গেছে জাতীয় দলের দুয়ার। স্পেন্স বললেন, ঝঞ্ঝাবিক্ষু্ব্ধ এতগুলো বছরেও হাল ছাড়েননি তিনি।
“শক্ত মানসিকতা ছাড়া কখনও চূড়ায় ওঠা যায় না। আমি অবশ্যই মনে করি, আমার মানসিকতা দারুণ শক্ত, বিশেষ করে চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়ার জন্য।”
বছরের পর বছর ধরে যাদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, তাদের সমালোচনাকে নিজের ছুটে চলার জ্বালানি মনে করেন তিনি।
“এমন নয় যে আমার কোনো তালিকা করা আছে বা এরকম কিছু। তবে হ্যাঁ, আমাকে নিয়ে যারা সংশয় দেখিয়েছে, তাদের একটি তালিকা আমার মাথায় আছে নিশ্চিতভাবেই এবং তাদেরকে ভুল প্রমাণ করতে পারলে ভালো লাগে।”
যেভাবে লড়াই করে এতটা পথ ছুটে এসেছেন, নিজেকে তিনি এখন মনে করেন অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণার।
“আমি যদি এটা করতে পারি, তুমিও পারবে। শুধু মুসলিম হিসেবে নয়, যে কোনো বিশ্বাসের অনুসারী হিসেবে। স্রেফ এটা মাথায় রাখো যে, আমি করতে পারি।”