উত্তাপের ক্লাসিকোয় রেয়ালের প্রতিশোধ নাকি বার্সেলোনার আধিপত্য
মৌসুমের প্রথম ক্লাসিকোয় বার্সেলোনার আরও এগিয়ে যাওয়ার হাতছানি এবং রেয়াল মাদ্রিদের ব্যবধান কমানোর চ্যালেঞ্জ।
‘বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক ম্যাচ আছে, কিন্তু ক্লাসিকো একটাই, এটি এলে যেন পুরো পৃথিবী থমকে যায়’- সংবাদ সম্মেলনে বলছিলেন জুজে মরিনিয়ো। রেয়াল মাদ্রিদ কোচ যথার্থই বলেছেন। ক্লাসিকোর মাহাত্ম্য এমনই। এর চেয়ে আকর্ষণীয় লড়াই ক্লাব ফুটবলে আছে নাকি আর!
ক্লাসিকো মানেই যে রুদ্ধশ্বাস উত্তাপ ও রোমাঞ্চ। অপার্থিব অনুভূতি নিয়ে ধরা দেয় স্পেনের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা ও রেয়াল মাদ্রিদের এই দ্বৈরথ। বিশ্ব ফুটবলে খুব কম ম্যাচই ক্লাসিকোর মতো বৈরিতা, নাটকীয়তা আর নিখুঁত মানের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। আর এবার মরিনিয়ো রেয়ালের ডাগআউটে ফেরায় লড়াইটি বাড়তি উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
এই মৌসুমের প্রথম ক্লাসিকো মাঠে গড়াবে রোববার। কাম্প নউয়ে লা লিগার ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত দুইটায়।
এই ম্যাচের আগে রেয়ালের ওপর রয়েছে প্রচণ্ড চাপ। হান্সি ফ্লিকের হাত ধরে টানা তৃতীয় লিগ শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে বার্সেলোনা প্রথম নয় ম্যাচেই জিতেছে। অন্যদিকে, রেয়াল বেতিস ও আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে হারের ফলে মরিনিয়োর দল এখন পয়েন্ট তালিকায় বার্সেলোনার চেয়ে ৬ পয়েন্টে পিছিয়ে আছে।
২০১২-১৩ মৌসুমের পর এই প্রথম মৌসুমের শুরুর দিকে লা লিগার শীর্ষ দলের চেয়ে রেয়াল এত বড় ব্যবধানে পিছিয়ে আছে। সেবার নয় ম্যাচ শেষে তারা বার্সেলোনার চেয়ে ৮ পয়েন্টে পিছিয়ে ছিল এবং শেষ পর্যন্ত ১৫ পয়েন্ট পিছিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থেকে মৌসুম শেষ করেছিল-সেবারও দলের দায়িত্বে ছিলেন মরিনিয়ো।
টানা দুই মৌসুমে বড় কোনো শিরোপা জিততে না পারায় ব্যর্থতা ঘোচাতে এই মৌসুমে দ্বিতীয় মেয়াদে সান্তিয়াগো বের্নাবেউয়ে ফেরানো হয় মরিনিয়োকে। কিন্তু দলকে সাফল্যের পথে ফেরানোর অভিযানে অভিজ্ঞ এই কোচের শুরুটা প্রত্যাশানুযায়ী হয়নি।
ফ্লিকের কোচিংয়ে বার্সেলোনার ফুটবল বরাবরই নান্দনিক, তবে চলতি মৌসুমে তাদের আক্রমণভাগ যেন আরও বিধ্বংসী-লা লিগার প্রথম নয় ম্যাচেই তারা প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছে ৩৯ বার!
রেয়ালের বিপক্ষে ঘরের মাঠে নিজেদের সবশেষ দুটি লিগ ম্যাচেই বার্সেলোনা জিতেছে। গত মে মাসে অনুষ্ঠিত সবশেষ ক্লাসিকোয় এখানে জিতেই ফ্লিকের দল শিরোপা নিশ্চিত করেছিল। ২-০ গোলের সেই জয় কাতালোনিয়ায় এনে দিয়েছিল বাঁধভাঙা উল্লাসের উপলক্ষ।
একবিংশ শতাব্দীতে লিগে একবারই রেয়ালের বিপক্ষে ঘরের মাঠে টানা তিন ম্যাচ জয়ের নজির আছে বার্সেলোনার। ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে পেপ গুয়ার্দিওলার কোচিংয়ে তারা এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। সেই স্মৃতি ফেরানোর হাতছানি ফ্লিকের দলের সামনে।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে সবশেষ সাত ম্যাচের কেবল একটিতে বার্সেলোনা হেরেছে।
১৩ বছরের মধ্যে প্রথমবার কোনো ক্লাসিকোয় দায়িত্ব সামলাতে যাওয়া মরিনিয়োর সামনে তাই কঠিন চ্যালেঞ্জ। ৬৩ বছর বয়সি এই কোচ একটি দিক থেকে কিছুটা এগিয়েও থাকবেন। বার্সেলোনার বিপক্ষে মোট ২৭টি ম্যাচে এবং রেয়ালের ডাগআউটে ১৭টি ক্লাসিকোয় দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তিনি।
গুয়ার্দিওলার বার্সেলোনার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে রেয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেস ২০১০ সালে প্রথমবার মরিনিয়োকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এবারও পেরেস আশা করছেন যে, এই পর্তুগিজ কোচ আবারও লা লিগার শিরোপা বের্নাবেউয়ে ফিরিয়ে আনতে পারবেন।
রেয়ালে মরিনিয়োর প্রথম মেয়াদটি ছিল সম্ভবত ক্লাসিকোর আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সময়। নিজের প্রথম ১০টি ক্লাসিকোর মধ্যে কেবল একটিতে জয় পেয়েছিলেন তিনি, তবে সবশেষ পাঁচটি ক্লাসিকোয় তিনি অপরাজিত ছিলেন-যার মধ্যে জয় ছিল তিনটি। এবারও তার কাছ থেকে জাদু দেখার আশায় রেয়াল সমর্থকরা।
মৌসুমে দুটি হারের পর এরই মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে রেয়াল। আন্তর্জাতিক ফুটবলের পর সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে চার ম্যাচের সবকটিই তারা জিতেছে। এর মধ্যে সবশেষ তিন ম্যাচেই গোল করেছে চারটি করে।
যদিও ক্লাসিকোয় এসবের মূল্য খুব একটা নেই বলে মনে করেন মরিনিয়ো। তবে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী তিনি।
“আমরা বেশ ভালো ছন্দে আছি-ম্যাচ জিতেছি, ভালো খেলছি, গোল করছি। তবে ক্লাসিকোর ক্ষেত্রে এর আগে কী করেছেন, তা মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর কোনো প্রভাবই এখানে পড়ে না। ক্লাসিকো একেবারেই আলাদা। আশা করি, ম্যাচটি দারুণ হবে এবং আমরাই জিতব।”
প্রতিপক্ষের চুল টেনে লাল কার্ড দেখে চার ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পাওয়া ভিনিসিউস জুনিয়রকে ক্লাসিকোতেও পাচ্ছে না রেয়াল। এবং ওই ম্যাচের পর লা লিগার রেফারিং নিয়ে রেয়ালের দীর্ঘদিনের যে অভিযোগ, তা পায় নতুন মাত্রা। ক্লাসিকোয় রেফারির ওপরও থাকবে তাই বাড়তি নজর।
ভিনিসিউসের অনুপস্থিতিতে বার্সেলোনার বিপক্ষে আক্রমণের নতুন উৎস খুঁজে বের করতে হবে মরিনিয়োকে। এটাও সত্যি যে, এই মৌসুমে ভিনিসিউস তার সেরা ফর্মে নেই; ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১১ ম্যাচে কেবল একটি গোল এবং তিনটি অ্যাসিস্ট করেছেন। বরং গত কয়েক ম্যাচে বেশ ভালো করেছেন তরুণ উইঙ্গার ইয়ান ডিওমান্ডে।
আক্রমণভাগে রেয়ালের বড় ভরসা কিলিয়ান এমবাপে। বার্সেলোনার বিপক্ষে এই ফরাসি তারকার পরিসংখ্যানও দারুণ; সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে দলটির বিপক্ষে ১০ ম্যাচে তিনি গোল করেছেন ১২টি। এর মধ্যে পিএসজির হয়ে তিন ম্যাচে চারটি এবং রেয়ালের হয়ে সাত ম্যাচে আটটি।
এই শতাব্দীতে বার্সেলোনার বিপক্ষে এমবাপের চেয়ে বেশি গোল করেছেন কেবল রেয়ালের দুই কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (২০টি) ও কারিম বেনজেমা (১৬টি)।
অন্যদিকে, বার্সেলোনার তারকাখচিত আক্রমণভাগের নেতৃত্বে থাকবেন লামিন ইয়ামাল। স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পর, মৌসুমের শুরু থেকেই নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এই স্প্যানিশ তারকা। লা লিগায় এখন পর্যন্ত নয় ম্যাচে আটটি গোল করেছেন। একবিংশ শতাব্দীতে মৌসুমের এই পর্যায়ে ২০ বছর বা এর কম বয়সি খেলোয়াড়দের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ গোল।
মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনি ১২ ম্যাচে ১০টি গোল করেছেন, অবদান রেখেছেন আরও ১০টি গোলে।
চোটের কারণে দানি ওলমো, জুল কুন্দেসহ কয়েকজন খেলোয়াড়কে হারিয়েছে বার্সেলোনা। এমনকি সবশেষ ম্যাচে তারা হেরেছে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে পিএসজির মাঠে। তবে ক্লাসিকোর আগে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখছেন না কোচ ফ্লিক।
“ক্লাসিকো সবসময়ই আলাদা। আমি মনে করি, এটা ফুটবলের সেরা ম্যাচ। পুরো বিশ্ব এই ম্যাচে চোখ রাখে। এখানে তিন পয়েন্ট জিততে পারেন, কিন্তু ব্যাপারটা এর চেয়েও বড় কিছু। ক্লাসিকোর অংশ হতে পারা অসাধারণ। আমার দলের সবাই জানে আমরা কীভাবে খেলতে চাই। আমরা প্রস্তুত এবং আত্মবিশ্বাসী।”
সেই আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে লা লিগায় জয়ের ধারা ধরে রাখতে পারবে বার্সেলোনা? পারবে রেয়ালের বিপক্ষে নিজেদের সাম্প্রতিক আধিপত্য বজায় রাখতে? নাকি কাম্প নউকে স্তব্ধ করে প্রতিশোধ নিয়ে মরিনিয়োর ক্লাসিকোয় ফেরার উপলক্ষ রাঙাবে রেয়াল?
উত্তর মিলবে রাতেই।
