০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

শাবি কর্মকর্তার মৃত্যু, হাসপাতাল ও সহকর্মীদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তেজনা

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাহেদ আহমেদ ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

শাবি কর্মকর্তার মৃত্যু, হাসপাতাল ও সহকর্মীদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তেজনা

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা সাহেদ আহমদের ‘চিকিসকের অবহেলায়’ মৃত্যুর অভিযোগ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন সহকর্মীরা।  

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 16 Feb 2024, 01:22 AM

Updated : 16 Feb 2024, 01:22 AM

সিলেট নগরীর বেসরকারি মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের ‘ভুল চিকিৎসায়’ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তার মৃত্যুর অভিযোগ এনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন তার সহকর্মীরা।  

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাহেদ আহমেদ ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর আগে তার মাউন্ট এডোরা হাসাপাতালে অস্ত্রোপচার হয়।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক ও হাসপাতালের সামনের সড়কে কর্মসূচিতে শাবি কর্মকর্তা সমিতির নেতারা চিকিৎসকদের শাস্তি ও হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিলের দাবি জানান।

এতে সংহতি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, শিক্ষক সমিতির নেতা, সহায়ক কর্মচারী ও কর্মচারী ইউনিয়নের সদস্যরা অংশ নেন। তারা সাহেদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও জানান।

তবে মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাহেদের চিকিৎসায় আনা সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বিকালে মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও শাবি কর্মকর্তা সমিতি আলাদা সংবাদ সম্মেলনে করে একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়।

অস্ত্রোপচারের পর সাহেদের মৃত্যু

সাহেদ আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিকিৎসক আখতারুজ্জামানের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন।

Image

সিলেট নগরীর বেসরকারি মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সংবাদ সম্মেলন।

শাবি কর্মকর্তা সমিতি ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ৩০ নভেম্বর সাহেদ নাকের ও জননাঙ্গে সিস্ট অপারেশনের জন্য মাউন্ট এডোরাতে ভর্তি হন। ১ ডিসেম্বর তার অস্ত্রোপচার হয়।

এরপর সাহেদের অগ্নাশয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ৬ ডিসেম্বর তাকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসার পর ল্যাব এইড হাসপাতালে নেওয়া হলে ১৩ ফেব্রুয়ারি সাহেদের মৃত্যু হয়।

সহকর্মীরা জানান, এর মধ্যে সাহেদের শারীরিক গঠন পুরোটাই পরিবর্তন হয়ে যায়। তিনি সবল দেহের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু দুই মাসের ব্যবধানে চেহরাই চেনা যাইনি।

শাবি কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি জামাল উদ্দিন বলেন, তার খুবই ‘করুণ মৃত্যু’ হয়েছে।

হাসপাতালের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

মানববন্ধনে শাবি কর্মকর্তা সমিতির সহসভাপতি আহমদ মাহবুব ফেরদৌসী বলেন, “সাহেদের মৃত্যুর জন্য আমরা মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের চিকিৎসক খালেদ মাহমুদ ও শাহ কামালকে এককভাবে দোষারোপ করতে চাই। একইসঙ্গে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আখতারুজ্জামান আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।

“মনে করিয়ে দিতে চাই, খালেদ মাহমুদ ও শাহ কামাল আমাদের সহকর্মী সাহেদের অপারেশন করেছিলেন। তখন শোভন নামের একজন চিকিৎসক সাহেদের এনেস্থেসিয়া করেছিলেন। সাহেদের সাইনাসের অপারেশন করে যখন ওটি থেকে বের করা হয় তখন দেখা যায় তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে।

“সামান্য সাইনাসের অপারেশন করতে গিয়ে সাহেদের চোখ কেন নষ্ট হবে? একই সময়ে একই ওটিতে তার আরেকটি অপারেশন কেন হবে”, প্রশ্ন রাখেন মাহবুব ফেরদৌসী। 

ক্ষোভ প্রকাশ করে আহমদ মাহবুব ফেরদৌসী অভিযোগ করেন, “শাহ কামাল, খালেদ মাহমুদ ও আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে সেই সময়ে একটি ‘হত্যাযজ্ঞ’ হয়েছে।”

Image

শাবি কর্মকর্তা সমিতির সংবাদ সম্মেলন।

তিনি বলেন, “হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের আশ্বাস দিয়েছিল, চিকিৎসার খরচ তারা বহন করবে এবং সাইনাসের অপারেশন করতে গিয়ে সাহেদের চোখ নষ্ট হয়েছে এটাও তারা স্বীকার করেছে। কিন্তু তারা সাহেদের চিকিৎসার খরচ বহন করেনি।”

মানববন্ধনে শাবি কর্মকর্তা সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য তাজিম উদ্দিন বলেন, “গত বছরও নুরজাহান ফাতেমা নামের আমাদের এক সহকর্মী মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের ভুল চিকিৎসার ফলে মারা যান। মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামে ভুলভাবে প্রচার করে সিলেটের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে পাচার করছে।”

মানববন্ধন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মস্তাবুর রহমান ও শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হাকিম কর্মকর্তাদের এ দাবির সঙ্গে সংহতি জানান।

তারা এ ঘটনা তদন্তে অতিদ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অপরাধীদের যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান।

এর আগে একটি মিছিল করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ সময় তারা ‘জাগো রে জাগো, শাবিপ্রবি জাগো’, ‘বন্ধ করো, বন্ধ করো, কসাইখানা বন্ধ করো’, ‘মাউন্ট এডোরা কসাইখানা, বন্ধ হোক এই আজাবখানা’- ইত্যাদি স্লোগান দেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায় অস্বীকার

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের চিকিৎসক শাহ কামালকে একাধিকবার মোবাইলে কল দিলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

বেলা দেড়টার দিকে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মেডিকেল সার্ভিসের উপ-পরিচালক মো. তানভীর উজ জামান।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, “৩০ নভেম্বর সাহেদ নাকের অপারেশন ও জননাঙ্গে একটি ছোট সিস্ট অপারেশন করার জন্য ভর্তি হন। ১ ডিসেম্বর তার সার্জারি হয়। পরবর্তীতে তিনি অগ্নাশয়ে প্রদাহ রোগে আক্রান্ত হন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর হন।

Image

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাহেদ আহমেদ।

“এ বিষয়টি হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অডিট কমিটি তদন্ত করে। তদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী, সাহেদ আহমেদের শারীরিক জটিলতার সঙ্গে সার্জারির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।”

শাবি কর্মকর্তাদের অভিযোগ অস্বীকার করে তানভীর উজ জামান বলেন, “সাহেদ আহমেদের শারীরিক জটিলতার সঙ্গে সার্জারির কোনো সম্পর্ক নেই বলে শাবি কর্মকর্তা সমিতিকে অবহিত করা হয়। মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল কোনোভাবে সাহেদের মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়।”

এ ছাড়া মাউন্ট এডোরা ডায়াগনোস্টিক সেন্টার নয়; হাসপাতাল হিসেবে এটি নিবন্ধিত বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, “সাহেদের পরিবার যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাহলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মানবিক সহায়তা করবে; ক্ষতিপূরণ নয়।”

শাবি কর্মকর্তা সমিতির পাল্টা বক্তব্য

এদিকে, সন্ধ্যায় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব কার্যালয়ে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের কর্মকর্তা তানভীর উজ জামানের বক্তব্যের পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন শাবি কর্মকর্তা সমিতির নেতারা। এ সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যকে ‘ডাহা মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেন তারা।

শাবি কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক অশোক বর্মন অসীম বলেন, “তারা যে তদন্ত রিপোর্টের কথা বলছে সেই কমিটিই গঠিত হয়েছে অপরাধীকে নিয়ে। সেই প্রতিবেদক বিশ্বাসযোগ্য কখনো হতে পারে না।

“আগামী সপ্তাহে আমরা স্বাস্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেব; স্বাস্থমন্ত্রীকে অবহিত করব। এ ছাড়া সুষ্ঠু বিচার  না হলে ধারাবাহিক কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হবে।”

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাউন্ট এডোরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা কথা বলব। তাদের কোনো দায় আছে কি-না সেটা স্ট্রংলি দেখা হবে।”