২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯ কার্তিক ১৪৩৩

সৈকত সংলগ্ন ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ আইন প্রত্যাহারের চেষ্টা হচ্ছে: এমপি কাজল

কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরিতে নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করতে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 24 Oct 2026, 11:16 PM

Updated : 24 Oct 2026, 11:16 PM

কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ও নো ডেভেলপমেন্ট জোন-সংক্রান্ত আইন তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল।

শনিবার দুপুরে কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরির শহীদ সুভাষ হলে নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করতে হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতের অংশীজনদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

সংসদ সদস্য বলেন, ১৯৯৫ ও ২০১৩ সালে প্রণীত পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ও নো ডেভেলপমেন্ট জোন-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হলে কক্সবাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ স্থাপনা টিকে থাকতে পারবে না বলে তার ধারণা।

“আমরা এই ইসিএ আইন তুলে দেওয়ার জন্য কাজ করছি। ইনশাআল্লাহ, আমরা অচিরেই এই আইনগুলো তুলে দেব।”

তবে এসব আইন তুলে দেওয়ার উদ্যোগের বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সভায় পাওয়া যায়নি।

সংসদ সদস্য কাজল বলেন, কক্সবাজারের পর্যটন খাত থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব পায়। তার হিসাবে, বছরে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব দেওয়া হয়। সরবরাহকারীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতের হিসাব ধরলে এর পরিমাণ ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।

অন্যদিকে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অনেক পর্যটন স্থাপনা অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সংসদ সদস্য বলেন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) মাস্টারপ্ল্যান তৈরির সময় বিদ্যমান আইন ও পর্যটনশিল্পের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তার ভাষ্য, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ৫০০ মিটারের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণের বিধিনিষেধ থাকলে পর্যটন অবকাঠামোর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

‘অনুমোদনের জটিলতায় অপরিকল্পিত স্থাপনা’

হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, কক্সবাজারের হোটেলগুলোর অনুমোদন নিয়ে জটিলতা রয়েছে। পৌরসভা থেকে নকশা অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণের পর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র বা অকুপেন্সি সনদ পেতে সমস্যায় পড়তে হয় অনেককে।

তিনি বলেন, এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে গেলে অনুমোদনসংক্রান্ত কাগজপত্র চাওয়া হয়। কিন্তু উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে পৌরসভার অনুমোদিত নকশার ভিত্তিতে অকুপেন্সি সনদ দিতে পারে না বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন।

মুকিম খানের ভাষ্য, নতুন হোটেল বা রিসোর্ট নির্মাণের অনুমোদন পেতেও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার বিধিনিষেধ বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, “বাধ্য হয়ে আমরা কোনো না কোনোভাবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এই রিসোর্টগুলো অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করছি, যার কারণে এখানে দুর্ঘটনা ঘটছে।”

সম্প্রতি পর্যটনকেন্দ্রের একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে মুকিম খান বলেন, এ ধরনের দুর্ঘটনা কক্সবাজারের পর্যটন অবকাঠামোর অপরিকল্পিত বিকাশের দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসছে। তার অভিযোগ, পর্যাপ্ত তদারকি ও দক্ষ জনবলের অভাবও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

মুকিম খানের মতে, কক্সবাজারের পর্যটন খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। অথচ অনেক হোটেলে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী নেই।

“প্রতিটি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে প্রশিক্ষিত, সার্টিফায়েড লোক থাকতে হবে। সরকারি দপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনকে তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।”

তিনি বলেন, হোটেল-রিসোর্টের পাশাপাশি অ্যাপার্টমেন্টভিত্তিক আবাসন ব্যবসাকেও নিয়মের আওতায় এনে পর্যটন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

পর্যটকদের নিরাপত্তা ও নেতিবাচক প্রচার নিয়ে উদ্বেগ

সভায় কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান পর্যটনকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের খবর প্রচার এবং হোটেলে অতিথিদের তথ্য সংরক্ষণের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

সম্প্রতি দ্য সি প্রিন্সেস হোটেলে আগুন লাগার প্রসঙ্গ এনে তিনি বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় হতাহতের ঘটনা এড়ানো গেছে। বারবিকিউ করার সময় আগুনের শিখা ও ধোঁয়া দেখে অগ্নিকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার বিষয়েও তিনি মন্তব্য করেন।

পুলিশ সুপার বলেন, “একটা অনুরোধ করে রাখি, গেস্ট লিস্ট আপনারা অনেক হোটেলে দেন, অনেকে দেন না।”

হোটেলগুলোকে অতিথিদের তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রশাসনকে সরবরাহ করার আহ্বান জানান তিনি।

সাজেদুর রহমান বলেন, পর্যটন খাতের স্বার্থ বিবেচনায় কিছু ঘটনায় নেতিবাচক প্রচার এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হোটেল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

কক্সবাজারের পর্যটন নিয়ে নেতিবাচক প্রচার হলে পর্যটকের সংখ্যা কমে যেতে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন পুলিশ সুপার।

অপ্রাপ্তবয়স্ক অতিথিদের পরিচয় যাচাইয়ের আহ্বান

সভায় নারী সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না হোটেলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অবস্থানের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, অভিভাবকের সঙ্গে আসা শিশু-কিশোরদের থাকার ব্যবস্থা করা গেলেও পরিচয়পত্র ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক যুগলকে অতিথি হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে হোটেল কর্তৃপক্ষের সতর্ক হওয়া উচিত।

তার অভিযোগ, পরিচয় যাচাই না করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের হোটেলে থাকতে দেওয়ার কারণে বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে।

শামীম আরা স্বপ্না বলেন, এ ধরনের ঘটনায় হোটেল মালিক ও ব্যবস্থাপকদের দায় পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কক্সবাজারকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা উল্লেখ করে তিনি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হোটেল কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।

সভায় পর্যটন খাতের নিরাপত্তা, হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন, পরিবেশগত বিধিনিষেধ, অগ্নিনিরাপত্তা ও পর্যটন অবকাঠামোর পরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়।