২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫ কার্তিক ১৪৩৩

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুর্গাপূজা: বিবর্ণ জীবনে রঙিন উৎসব

কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে গড়ে ওঠা হিন্দু পল্লিতে দুর্গাপূজা ঘিরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 20 Oct 2026, 10:13 PM

Updated : 20 Oct 2026, 11:15 PM

নিজ দেশে ছিল ঘর, জমি, চাষাবাদ। ছিল স্বস্তিতে বেঁচে থাকার জীবন। বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর সেই জীবনের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে।

কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে গড়ে ওঠা হিন্দু পল্লিতে দুর্গাপূজা ঘিরে এখন উৎসবের আমেজ। প্রতিমা, আলোকসজ্জা, প্রসাদ আর শিশুদের নতুন পোশাকে কয়েক দিনের জন্য রঙিন হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গাদের বিবর্ণ জীবন।

তবে উৎসবের আনন্দের আড়ালেই রয়ে গেছে ঘর হারানোর বেদনা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর নতুন করে সংসার গুছিয়ে নেওয়ার দুশ্চিন্তা।

উখিয়ায় কুতুপালং-বালুখালীর ১ নম্বর ক্যাম্পের এ ব্লকের হিন্দু পল্লিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে দুর্গাপূজার আয়োজন। চারদিকে সাজসজ্জা, প্রতিমার সামনে ভক্তদের আনাগোনা। বসেছে ছোট্ট মেলাও। কয়েকটি দোকানে সাজিয়ে রাখা খেলনা দেখতে ও কিনতে আসছে শিশুরা।

আয়োজনের আকার হয়ত বড় নয়, কিন্তু এই উৎসবের তাৎপর্য এখানকার মানুষের কাছে অনেক গভীর। নিজেদের দেশ ছেড়ে আশ্রিত জীবনে আসার পর দুর্গাপূজা তাদের কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, হারানো জীবনের কিছু স্মৃতি ফিরে পাওয়ারও উপলক্ষ।

এ পল্লির এবারের দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি মোহন বাশি পাল। মিয়ানমারের মংডু এলাকার নাগপুরা ও বলিবাজারের কাছাকাছি গ্রামে ছিল তাদের বসতি। সেখানে সেলুনে কাজ করতেন তিনি। বাংলাদেশে এসেও সেই পেশা ধরে রেখেছেন। ক্যাম্পে তার ছোট একটি দোকান আছে। বয়স বেড়ে যাওয়ায় এখন আগের মতো কাজ করতে পারেন না।

মোহন বাশি বলেন, তাদের এই পূজার আয়োজন শুরু হয়েছে নয় বছর আগে। এর মধ্যে তিনি চার বছর সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, পরে হয়েছেন সভাপতি।

এবারের পূজার বাজেট তিন লাখ টাকার বেশি বলে জানান তিনি। ক্যাম্পের ১৩২টি পরিবারের সদস্যদের চাঁদা, বাইরের মানুষের সহায়তা এবং বিভিন্নভাবে পাওয়া সহযোগিতায় চলে আয়োজন।

কেউ দিয়েছেন ১০০ টাকা, কেউ ৫০০, কেউবা দুই হাজার টাকা। বাইরের লোকজনও সাধ্য অনুযায়ী সহায়তা করেছেন। ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নগদ অর্থ না দিলেও বাঁশ, কাঠ ও ত্রিপল দিয়ে সহযোগিতা করেছে। সাজসজ্জার ব্যবস্থাও করে দিয়েছে তারা।

মোহন বাশির কথায়, এই আয়োজনের পেছনে শুধু অর্থের হিসাব নেই, আছে একসঙ্গে উৎসব করার আকাঙ্ক্ষা। পূজার দিনগুলোতে মন্দিরে নিরামিষ খাবার ও প্রসাদের ব্যবস্থা থাকে। দশমীতে দেওয়া হয় ডাল ও খিচুড়ি। তবে এই আনন্দের মধ্যেও তার কণ্ঠে ফিরে আসে দেশ হারানোর কথা।

মিয়ানমারে তারা দুর্গাপূজায় ‘ঘট পূজা’ করতেন। সেখানে প্রতিমা এনে মণ্ডপে পূজা করার সুযোগ ছিল না। শহরে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় নানা বাধার মুখে পড়তে হতো তাদের।

বাংলাদেশে এসে প্রতিমা পূজার সুযোগ পেয়েছেন তারা। মোহন বাশির কাছে সেটি আনন্দের, কিন্তু সেই আনন্দ নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে মুছে দিতে পারেনি।

“আমরা একটা শ্বাস নিতে পারি না, একটা স্বস্তি পাই না”, কথাগুলো বলতে গিয়ে নিজ দেশের জীবন আর বর্তমান বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরেন তিনি।

নিজের ঘরেই ছিল সুখ

কমিটির সহসভাপতি রিপন শীলের বয়স ২৫ বছর। মিয়ানমারেও নাপিতের কাজ করতেন, বাংলাদেশে এসেও একই পেশায় আছেন। কিন্তু দুই জায়গার জীবনের তুলনা করতে গিয়ে তার মনে পড়ে যায় ফেলে আসা বাড়ি, জমি আর চাষাবাদের কথা।

মিয়ানমারে নিজেদের ঘর ছিল। জমিতে চাষাবাদ করতেন তারা। নিজেদের প্রয়োজনের অনেক সবজিই উৎপাদন করতেন, ফলে বাজার থেকে তেমন কিছু কিনতে হত না। এখানে জীবন অন্য রকম। থাকতে হয় ত্রিপলের ঘরে। নিজের জমি নেই, নেই আগের মত স্বনির্ভরতার সুযোগ।

রিপন বলেন, মিয়ানমারে তাদের গ্রামে একটি মন্দির ছিল, সেখানে স্থায়ী প্রতিমাও ছিল। তবে প্রতিমা তৈরির কারিগর না থাকায় তারা ঘট পূজাই করতেন। বাংলাদেশে এসে প্রতিমা পূজা করার সুযোগ হয়েছে।

দুর্গাপূজার আয়োজন নিয়ে তার আনন্দ আছে। কিন্তু সেই আনন্দের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি। নিজ দেশে পূজার আয়োজন হয়তো এত বড় ছিল না। কিন্তু নিজ ঘরে, নিজ জমিতে যে স্বস্তি ছিল, তা এখন আর নেই।

রিপনের মতো এই পল্লির অনেকের কাছেই উৎসবের আনন্দ তাই দ্বিমুখী। একদিকে নতুন পরিবেশে ধর্মীয় আচার পালনের সুযোগ, অন্যদিকে নিজের দেশ ও বসতভিটা হারানোর দীর্ঘশ্বাস।

নতুন সংসার, পুরোনো অনিশ্চয়তা

টুকু বালার সংসারেও দুর্গাপূজার আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। তার পাঁচ ছেলে। বড় ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু অন্য ছেলেরাও বড় হয়েছেন। সংসারে নতুন বউ আসায় সীমিত জায়গায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকতে গিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা।

উৎসবের রঙিন আয়োজনের মাঝেও তার ভাবনা, সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে, কীভাবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে চলবেন।

টুকু বালার উপলব্ধি, বাংলাদেশে এসে তাদের পূজার আয়োজন হয়ত বড় হয়েছে, কিন্তু জীবনটা ভালো ছিল নিজ দেশে। নিজ ঘরে থাকার যে স্বস্তি, তা অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন।

আশ্রিত জীবনের এই বাস্তবতা তাদের উৎসবকে ম্লান করে দেয় না, কিন্তু আনন্দের সীমাবদ্ধতাটা মনে করিয়ে দেয় বারবার।

উৎসবে যোগ দেন স্থানীয়রাও

পূজামণ্ডপের চারপাশে ছোট ছোট দোকান নিয়ে বসেছে মেলা। শিশুদের কেউ খেলনা কিনছে, কেউ ঘুরে দেখছে দোকানগুলো। পূজার আয়োজন দেখতে আসছেন আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দারাও।

রিপন শীল বলেন, আশপাশের বাঙালি হিন্দু, মুসলিম ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষও তাদের পূজা দেখতে আসেন। স্থানীয়দের এই অংশগ্রহণ তাদের ভালো লাগে।

উখিয়ার ধোয়াপালং থেকে পূজা দেখতে এসেছেন দীপক রুদ্র। দুই বছর ধরেই তিনি এখানে আসছেন।

দীপক বলেন, “পূজা তো সকলের। এখানে এসেছি, তারাও পূজা করেন। দুই বছর ধরে আসি, দেখে যাই। ভালো লাগে।”

তার কথায়, ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে এই আয়োজনের সৌন্দর্য।

নবমীর বিকালে কক্সবাজার থেকে পূজা দেখতে এসেছিলেন রামুর শহীদ লেফটেন্যান্ট তানজিম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক তর্পনা দে। রোহিঙ্গা হিন্দুদের পূজার কথা শুনে তার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

মণ্ডপে এসে আয়োজন দেখে ভালো লেগেছে তার। আশ্রিত জীবনের কষ্টের মধ্যেও তারা যে উৎসব করতে পারছেন, সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

তর্পনা বলেন, “কয়েকটা দিন ভালো কাটে। শিশুদের দেখে ভালো লেগেছে, নতুন পোশাকে সেজেছে। এই আনন্দটা তাদের দুঃখের জীবনে একটুকরা সুখ।”

তার মতে, উৎসবের এই আনন্দ শুধু পূজায় অংশ নেওয়া মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, দর্শনার্থীদের কাছেও এটি অন্য এক অভিজ্ঞতা।

উপজেলার অন্যান্য পূজামণ্ডপের মতো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মণ্ডপেও নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার। বলেন, মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

সবার জন্য উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।