২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

সাজেক সড়কে অবরোধ: খাগড়াছড়িতে ‘সংসার চলছে না’ ৩ হাজার পরিবহন শ্রমিকের

পাঁচ দফা দাবিতে রাঙামাটির স্থানীয় দুই সংগঠনের ডাকে সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে।

সমির মল্লিক সমির মল্লিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 28 Oct 2026, 09:15 PM

Updated : 28 Oct 2026, 09:15 PM

রাঙামাটির সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে সড়ক অবরোধের প্রভাব পড়েছে খাগড়াছড়ির পর্যটনশিল্পেও। সাজেককে কেন্দ্র করে আসা পর্যটকেরা খাগড়াছড়ি ভ্রমণ করেন। এরপর খাগড়াছড়ি থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে পর্যটকেরা সাজেকে বেড়াতে যায়।

রাঙামাটির স্থানীয় দুই সংগঠনের ডাকা সাজেক সড়কে অবরোধের কারণে ২২ অক্টোবর থেকে পর্যটনকেন্দ্রেটি বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন পরিবহন শ্রমিক, হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।

বুধবার সরেজমিনে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক, আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র, রিছাং ঝরনা ও মায়াবিনী লেকসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পর্যটকদের আনাগোনা নেই। পর্যটন মৌসুমে এসব স্থানে দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও এখন অনেকটা সুনসান পরিবেশ বিরাজ করছে।

এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে পরিবহন শ্রমিকেরা। খাগড়াছড়িতে চাঁদের গাড়ি (জিপ), পিকআপ, সিএনজি চালিত মাহেন্দ্র চালকেরা এখন বেকার হয়ে পড়েছে। পরিবহন মালিকদের আয়ের বিকল্প উৎস থাকলে শ্রমিকেরা আয়শূন্য হয়ে এখন দিশেহারা।

অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের কারণে পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় পরিবর্তন এসেছে। সাজেকে যেতে না পারার আশঙ্কায় অনেকে খাগড়াছড়িতে ভ্রমণও বাতিল করছেন। ফলে সাজেকের পাশাপাশি খাগড়াছড়িও পর্যটক শূন্য হয়ে পড়েছে।

খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কে নিয়মিত পর্যটকদের আনা নেওয়া করেন মাহেন্দ্র চালক মনসুর আলী। তিনি বলেন, “খাগড়াছড়িতে ৪৫০টি মাহেন্দ্র গাড়ি আছে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক আসা যাওয়া ভাড়া সাত হাজার টাকা।

“মাসে অন্তত ১০টি ট্রিপ ঘুরলে একজন চালকের আয় হয় অন্তত ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু গত সাত দিন ধরে কোনো আয় নেই। অনেকে গাড়ি লোকাল ট্রিপ মারছে। কিন্তু সেখানেও কোনো আয় নেই। সারাদিনে উপজেলাগুলোতে একটা ট্রিপ মারতে পারি। জ্বালানি তেলের খরচও উঠে না।”

হোটেল মোটেল মালিকদের বিকল্প আয় থাকে কিন্তু রুটি রুজির একমাত্র খোরাক পর্যটক না আসায় উপার্জন একেবারি বন্ধ হয়ে গেছে বলে আক্ষেপ করেন মনসুর আলী।

সাজেক সড়ক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হওয়ায় হতাশ অটোরিকশা চালক মোহাম্মদ হারুন। বলেন, “আমাদের খুবই কষ্ট বা হতাশার মধ্যে দিন যাপন করতেছি। এখন যে অবস্থা হয়ে গেছে, কিস্তি আছে, ধারদেনা আছে।

“আমরা তো গাড়ি চালিয়ে ভাত খাই। কিন্তু আমাদের গাড়িগুলো বন্ধ। সারা বছর আশা করি এই সময়ে পর্যটক সংখ্যা বাড়বে। আমরা চাইব সমস্যাটা সমাধান করে দেওয়া হোক।”

পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন দেড়শ থেকে দুইশ পিকআপ সাজেক যাতায়াত করে বলে জানিয়েছেন চালক প্রদীপ ত্রিপুরা। বলেন, “প্রতিটি গাড়িতে চালক ও সহকারী থাকে। গাড়িগুলো এখন বন্ধ। শ্রমিকেরা বেকার।

“পর্যটন মৌসুমের আগে অনেকে ঋণ করে কিস্তিতে গাড়ি কিনেছে। তারা এখন বেকার। সাত দিন ধরে গাড়ির চাকা ঘুরছে না। এভাবে আর কত দিন? চালক, সহকারীদের দিশেহারা অবস্থা।”

প্রতিদিন খাগড়াছড়ির সাজেক কাউন্টার থেকে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যটকবাহী জিপ সাজেকের উদ্দেশে ছেড়ে যেত; যা অবরোধের কারণে সাত দিন ধরে বন্ধ রয়েছে।

এই কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মো. আরিফ উদ্দিন বলেন, “তৃতীয়বারের মতো অবরোধ শুরু হওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে কোনো পরিবহন সাজেকের উদ্দেশে ছেড়ে যায়নি। পরিস্থিতি জানিয়ে পর্যটকদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

সাজেকে পরিবহন বন্ধ হওয়ায় বর্তমানে জেলায় অন্তত তিন হাজার চালক ও সহকারী বেকার অবস্থায় দিন পর করছেন বলে দাবি করেছেন পার্বত্য যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা।

সংকট সমাধানে প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের চলাফেরা খুবই কষ্ট হচ্ছে। দ্রুত সাজেকে পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেওয়া হোক। পর্যটকরা যেন নিরাপদে ঘুরে ফিরে আসতে পারেন।

“আর আমাদের যে হাজার তিনেক পরিবহন শ্রমিক আছেন, তারা যেন জীবিকা নির্বাহ ও পরিবার চালাতে পারেন। তাদের ছেলে-মেয়ের লেখাপড়াসহ অবাধে যেন চলতে পারেন।”

পাঁচ দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে ইউপিডিএফ-সমর্থিত সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে।