২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

হাওরে ধানের কাজে কৃষক পরিবারের ‘৩ লাখ’ নারী

স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির ভাষ্য, নাওয়া খাওয়া ভুলে খলায় কাজ করা কৃষক পরিবারের নারী সদস্যরা পুরুষের বেশি পরিশ্রম করেন।

হাওরে ধানের কাজে কৃষক পরিবারের ‘৩ লাখ’ নারী

সুনামগঞ্জের হাওরের ধানকাটা ও মাড়াইয়ের পর গোলায় তোলার জন্য খলায় কাজ করছেন কৃষানিরা।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 01 May 2023, 10:39 PM

Updated : 01 May 2023, 10:39 PM

সুনামগঞ্জের হাওরের ধানকাটা প্রায় শেষ দিকে। আধুনিক প্রযুক্তি ছোঁয়ায় ধানকাটা ও মাড়াইয়ের কাজ সহজ হওয়ার পরও বহু নারী ও পুরুষ শ্রমিক হাওরে কাজ করছেন। এদের মধ্যে প্রায় তিন লাখ রয়েছেন কৃষক পরিবারের নারী। 

মাড়াই থেকে ধান গোলায় তোলা পর্যন্ত কায়িক পরিশ্রম করছেন কৃষক পরিবারের নারীরা। এসব নারী জমির মালিকের মা, স্ত্রী, মেয়ে কিংবা অন্য কোনো স্বজন। তাদের শ্রমের জন্য কোনো মূল্য দেওয়া হয় না। 

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, সোমবার [পহেলা মে] পর্যন্ত হাওরে ৯৭ ভাগ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। হাওরের বাইরে (নন হাওর) ৪২ ভাগ এবং গড়ে ৮৪ ভাগ জমির ধানকাটা শেষ হয়েছে।এবার হাওরে প্রায় পৌনে তিন লাখ শ্রমিক (পুরুষ) ধান কেটেছেন।

এ ছাড়াও পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, সিলেট, হবিগঞ্জ, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আরও প্রায় ১১ হাজার শ্রমিক এসে কাজ করেছেন। মৌসুম ভালো থাকায় তারা দৈনিক মজুরিতে ধান কেটে বছরের অন্তত ৫-৬ মাসের খোরাকি সংগ্রহ করেছেন। 

অন্যদিকে কৃষক পরিবারের প্রায় তিন লাখ নারী কাটা ও মাড়াই করা ধান শুকানো, চিটা ছাড়ানো, খড় নাড়ানোসহ গোলায় তোলা পর্যন্ত কাজ করেছেন।

শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু বলেন, “বৈশাখে হাওরের কিষান-কৃষানিরা নাওয়া খাওয়া ভুলে খলায় (ধান সংগ্রহের স্থান) সময় পার করেন।পুরুষের চেয়ে পরিবারের নারীরা আরও বেশি পরিশ্রম করেন। 

“তাছাড়া কৃষকরা হিস্যায় (অংশ) শ্রমিকদের দিয়ে ধান কাটান। ধান কাটার পর মাড়াই শেষে টুকরি দিয়ে মেপে হিস্যা বুঝে নেন তারা। ৭-৮ টুকরি হিসাবে ১ টুকরি তারা নেন। এতে দিনে গড়ে প্রায় ১ মণ ধান সংগ্রহ করতে পারেন প্রত্যেক শ্রমিক।তবে ইদানীং নগদ টাকাতেও অনেক শ্রমিক ধান কাটেন।”

তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরে ধানকাটতে এসেছেন একই উপজেলার লাউড়েরগড় শাহিদাবাদের শ্রমিক ফারুক মিয়া। ১৭ জন শ্রমিকের দলনেতা তিনি। হাওরে প্রায় ১৫ দিন ধান কেটে সবাই গড়ে ১৫-১৬ মণ ধান সংগ্রহ করছেন। ৮ হিস্যায় ধান কেটেছেন তারা। মালিককে ৭ টুকরি দিয়ে ১ টুকরি হিসাবে মজুরির ধান নিয়েছেন। এই ধানে সবার ৪-৬ মাসের খোরাকি সংগ্রহ হয়েছে। 

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরের পাড়ের গ্রাম হালুয়ার গাওয়ের কৃষানি আছিয়া বেগম বলেন, “বিয়ার আগে মা বাপ, ভাই, বইনের লগে বৈশাখে ধানের খলায় কাজ করতাম। বিয়ার পর জামাইর বাড়ি আইয়া একই কাজ করি।” 

এই কৃষানি আরও বলেন, “ধানের মায়া ছাড়তে পারে না কোনো নারী। সব সময় আমরা খলায় থাকি। ধান শুকাই, ছুছা ছাড়াই, বস্তাত ভরি। কষ্ট অইলেও ফসল তোলাম (তুলতে) পারলে এক ধরনের আনন্দ পাই। আউরের (হাওরের) গিরস্তঘরের সব নারীরাই ই কাম করইন।”

হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসচিব চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, “হাওরে অল্প নারী শ্রমিক আছেন যারা হতদরিদ্র পরিবারের। তারাই মজুরিতে কাজ করেন। কিন্তু সচ্ছল ও অসচ্ছল কৃষক পরিবারের অনেক নারী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাওরের খলায় থাকেন। অমানুষিক কষ্ট করেন তারা।

“ধান শুকানো, চিটা ছাড়ানো, খড় শুকানোসহ অনেক ভারী কাজ করেন তারা। তাদের এই শ্রমের মূল্য তো নেই-ই, তাদের সংখ্যাটা কত এই পরিসংখ্যানও নেই। অথচ এই নারীরা হাওরের কৃষির চাকা সচল রেখেছেন যুগ যুগ ধরে। ঘরের কৃষকের চেয়ে কোনো কোনো সময় পরিশ্রমটা তাদেরই বেশি। নারীদের এই শ্রমবিপ্লব সচেতন মানুষজনও দেখছে না।” 

চিত্তরঞ্জন তালুকদার আরও বলেন, “গৃহস্থ পরিবারের এই নারীরা সাধারণত কখনো ঘর থেকে বের হন না, কিন্তু বৈশাখের চিত্র ঠিক তার উল্টো। সবাই ধানের খলায় চলে আসেন। ধানের মায়া, জীবিকার টান তাদেরকে হাওরে নিয়ে আসে।” 

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, প্রায় ১ হাজার ৫০টি হারভেস্টার যন্ত্রে ধানকাটা ও মাড়াই করা হয়েছে। হাওরে কাজ করা প্রায় তিন লাখ নারী কৃষক পরিবারের সদস্য কিংবা স্বজন।তারা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়া কাজ করছেন।

“তবে পারিশ্রমিক নিয়ে দরিদ্র পরিবারের কিছু নারী কাজ করেন। তাদের হিসাব জানা নেই।” 

কৃষকের স্ত্রী, মেয়ে, মা, বোন, নাতনিরা বৈশাখে ঘরে বসে থাকেন না, ধানখলায় চলে আসেন বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।