১০ কোটি টাকার সেতুতে রডের বদলে বাঁশ, এবার তদন্তে দুদক
টাঙ্গাইলে নির্মাণাধীন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ালে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনা খতিয়ে দেখতে এবার তদন্তে নেমেছে দুদক।
বুধবার দুদক টাঙ্গাইলের কার্যালয় থেকে সেতুটিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন নেতৃত্ব দেন। এ সময় দুদুক জেলা কার্যালয়ের উপ-সহকারী মো. বাসেদ আলীসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রাথমিক তদন্তের পর বিপ্লব হোসেন বলেন, “এখানে দুর্নীতি হয়েছে। আমরা ফুটপাত স্ল্যাব ও রেলিংয়ের পিলার ভেঙে দেখেছি। এখানে রডের পরিমাণটা কম রয়েছে। রড যতটুকু থাকা দরকার, সেটুকু নেই।
“সরেজমিনে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছি, সেটা আমাদের এক্সপার্ট আছে, ওনারা প্রতিবেদন দেবেন। তার ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক সত্যতা পেলে কমিশনকে বিস্তারিতভাবে জানাব। তারপর কমিশন থেকে যে নির্দেশনা দেবে আমার পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করব।”
সেতুতে বাঁশ ব্যবহার নিয়ে দুদক কর্মকর্তা বলেন, “যে বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলো আমরা দেখতে পাইনি। তবে মিডিয়ার মাধ্যমে সেগুলো দেখেছি। সেখানে সাটারিংয়ে বাঁশের ব্যবহার আমরা দেখেছি।”
এ ঘটনায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসাইল থানার মামলার পর সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ছাড়া ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন।
বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া সেতুর কাছ থেকে শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার শাহ আলম (৪৪) রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বালাপাড়া এলাকার প্রয়াত নবুর উদ্দিনের ছেলে।
একই ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সেইসঙ্গে দুই প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিস দেওয়া হয়।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত আলাদা তিনটি অফিস আদেশ ও চিঠির মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বাদী হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। মামলার প্রধান আসামি ঠিকাদার এস এম জাহাঙ্গীর আলম ও অপর আসামি সাব-ঠিকাদার শাহ আলম।
সেতুটি পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মুহাম্মদ ছাদেক।
ঘটনার তদন্তে বাসাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে আহ্বায়ক এবং বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেনকে সদস্য করা হয়েছে।
বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর ৯০ দশমিক শূন্য ছয় মিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ করা হচ্ছিল। এতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১০ কোটি নয় লাখ ৯২ হাজার টাকা। কাজটি করছে মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া কাজটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তবে নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় সময় বাড়ানো হয়। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যা তৈরিতে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করেন। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখে বাধা দিলে কাজ বন্ধ রাখা হয়। এ সময় ঘটনাটি মোবাইলে ধারণ করেন কেউ কেউ।
স্থানীয়রা চলে যাওয়ার পর রাতে আবার ঢালাই শেষ করা হয়। পরে স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ালে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এ খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেতুটি পরিদর্শন ও তদন্তের উদ্যোগ নেয়।
এলজিইডির অফিস আদেশে বলা হয়, নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করায় সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ কারণে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন এবং বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
টাঙ্গাইলে সেতুতে রডের বদলে বাঁশ: তদন্তে কমিটি ও ঠিকাদারকে ‘শোকজ’
