নির্মাণকাজে রডের বদলে বাঁশ: স্রেফ অনিয়ম, নাকি আরও গুরুতর কোনো প্রশ্ন?
গত ২০ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলায় প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি ব্যবহার করে রাতের আঁধারে কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ চলতে দেখা যায়।
বাজারে রডের যে দাম, তাতে আরসিসি নির্মাণকাজে রডের পরিবর্তে বাঁশ বা শক্ত কাঠ ব্যবহার করা গেলে কী মজাই না হতো! কারণ, বাংলাদেশে বাঁশ ও কাঠের অভাব নেই; উপরন্তু এগুলো স্বল্পমূল্যে হাতের কাছেই পাওয়া যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কংক্রিটের নির্মাণকাজে রডের জায়গায় বাঁশ ব্যবহারের চিন্তা মাথায় এল কীভাবে?
বাংলাদেশে কংক্রিটের স্থাপনায় রডের পরিবর্তে গোপনে বাঁশ বা অন্য উপকরণ ব্যবহারের ঘটনা আগেও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। তবে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার সাম্প্রতিক ঘটনাটি বিষয়টিকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলায় প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি ব্যবহার করে রাতের আঁধারে কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ চলতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা কাজটি বন্ধ করার দাবি জানালে তাদের চাপে কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। কিন্তু জনসমাগম কমে গেলে আবার ঢালাই শুরু হয়, যা সকাল প্রায় ৬টা পর্যন্ত চলে বলে জানা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও বাঁশের ফালির ওপর সিমেন্টের খালি ব্যাগ বিছিয়ে তার ওপর কংক্রিট ঢালাইয়ের দৃশ্য দেখা যায়।
উপজেলা প্রশাসনের তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়। উপজেলা প্রকৌশলীর তাৎক্ষণিক বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে ঠিকাদারের সাব-ঠিকাদার গভীর রাতে কাজটি করেছেন।
চিরাচরিত নিয়মে ঘটনার পর একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এলজিইডির এক উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ও বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। পরে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। এ ঘটনায় শাহ আলম নামের এক সাব-ঠিকাদারকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে সেতু এলাকায় অভিযান চালিয়েছে বলেও শুনেছি।
অর্থাৎ, বিষয়টি এখন আর কেবল একটি নির্মাণস্থলে অনিয়মের অভিযোগ নয়; এটি আনুষ্ঠানিক তদন্তের বিষয়। তবে এ লেখা তৈরির সময় পর্যন্ত কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া প্রকৌশলীবৃন্দ কী জবাব দিয়েছেন, তা জানা যায়নি। উল্লেখ্য, অনুমোদিত নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের প্রধান কর্তব্য।
যারা নোটিশ পেয়েছেন তারা কী ধরনের ব্যাখ্যা দিতে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
প্রথমত, তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি চাকুরেরা দাবি করতে পারেন, তাদের অগোচরেই ঠিকাদার কাজটি করেছেন। ঠিকাদার বলতে পারেন, তার অজান্তে সাব-ঠিকাদার এমন কাজ করেছেন। আবার সাব-ঠিকাদার দায় চাপাতে পারেন শ্রমিকদের ওপর। অর্থাৎ, প্রত্যেক পক্ষই নিজেদের দায় এড়িয়ে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে, একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নির্মাণকাজে এমন গুরুতর বিচ্যুতি কীভাবে সম্ভব হলো, বা এক্ষেত্রে দায় এড়ানোর যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
আমার নিজের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বাংলাদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে নির্মাণকাজে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে নিম্নমানের কাজ করে ঠিকাদার যে অর্থ সাশ্রয় করেন, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ হয়ে যাওয়ার ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে। কানাডার উদ্দেশে দেশ ছাড়ার আগে কয়েক বছর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমার ধারণা, এ ধরনের দুর্নীতি অনেক ক্ষেত্রেই কেবল ঠিকাদারের একার কাজ নয়; এর সঙ্গে কাজের তদারকি, বিল যাচাই, প্রশাসনিক অনুমোদন ও অডিটের বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা থাকে। যদিও নির্মাণকাজে অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের ওপর দায় চাপিয়ে অন্যরা তাদের ‘টেকনিক্যাল জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা’ দেখিয়ে ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা এড়িয়ে যেতে চান।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক সময় চুক্তির শর্ত ও স্পেসিফিকেশনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করার পরিবর্তে অনিয়মের মাত্রা ও অবৈধ অর্থযোগের যথাযথ হিসাব নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অথচ চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং জনগণের অর্থের যথাসম্ভব সদ্ব্যবহার করা।
দ্বিতীয়ত, কেউ কেউ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের যুক্তি তুলে ধরে বলতে পারেন, 'সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে স্বার্থান্বেষী মহল রাতের আঁধারে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করেছে, যাতে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে সরকারকে বিব্রত করা যায়।'
এ ধরনের দাবি করা অসম্ভব নয়। কিন্তু তা সত্য বলে গ্রহণ করার আগে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। কে উপকরণ কিনেছে, কারা শ্রমিক নিয়োগ করেছে, কাজটি কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং কারা এতে জড়িত ছিলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। প্রমাণ ছাড়া রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যেতে পারেন।
তৃতীয়ত, কেউ হয়তো দাবি করতে পারেন, ‘অতীতেও রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে নির্মাণকাজ করা হয়েছে, অথচ কোনো স্থাপনা ভেঙে পড়েনি।’ কিন্তু অতীতে কোনো স্থাপনা দৃশ্যত টিকে ছিল বলেই সেটি নিরাপদ প্রমাণিত হয় না। কাঠামোর অভ্যন্তরীণ ত্রুটি দীর্ঘদিন অদৃশ্য থাকতে পারে, আর দুর্ঘটনা না ঘটা মানেই ঝুঁকি না থাকা নয়।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে: অতীতে উপজেলা পর্যায়ে সেতু, ফুটপাত বা অন্যান্য কংক্রিটের স্থাপনায় আরসিসি কাজে বাঁশ বা কাঠ ব্যবহারের মতো অনিয়ম ঘটেছে কি না, তা কি খতিয়ে দেখা উচিত নয়?
সন্দেহজনক স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে রড স্ক্যানারসহ উপযুক্ত নন-ডেস্ট্রাক্টিভ টেস্টিং (এনডিটি) পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা যেতে পারে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে কাঠামোর ভেতরে রডের অবস্থান, পরিমাণ ও বিন্যাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে শুরুতেই এই বিশেষ ঠিকাদারের সম্পাদিত কাজগুলো পরীক্ষার জন্য বিবেচনায় নেওয়া যায়।
আরসিসি নির্মাণে আসলেই কি রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করা যায়?
আরসিসি কাঠামোর কোন অংশে কত ব্যাসের কতটি রড লাগবে, সেগুলো কী দূরত্বে বসানো হবে এবং কাঠামোটি কী ধরনের ভার বহন করবে, এসব নির্ধারণ করা হয় কাঠামোগত বিশ্লেষণ ও নকশার মাধ্যমে। বাংলাদেশে ভবন ও অন্যান্য প্রযোজ্য স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণ করতে হয়।
একজন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এ বিষয়ে আমার নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক মনে করি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পুরকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের সময় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল আমার মেজর। পরবর্তীকালে কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করি। বাংলাদেশ ও কানাডা মিলিয়ে প্রায় দুই দশক কাঠামো প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছি। এই দীর্ঘ সময়ে আরসিসি নির্মাণকাজে রডের পরিবর্তে বাঁশ বা কাঠ ব্যবহার করতে আমি কখনো দেখিনি।
বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য কয়েকজন বিশেষজ্ঞ কাঠামো প্রকৌশলীর (স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার) সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের মধ্যে রয়েছেন, ড. সুকোমল মোদক (বুয়েটে আমার ব্যাচে পুরকৌশলে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষজ্ঞ কাঠামো প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত), ড. আলাউদ্দিন বিশ্বাস (আমার দুই বছর পরের ব্যাচে বুয়েটে পুরকৌশলে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন, বর্তমানে কানাডায় বিশেষজ্ঞ কাঠামো প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত), ড. মিজানুর রহমান (রুয়েটে নিজের ব্যাচে শীর্ষস্থান অধিকার করেছিলেন, বর্তমানে কানাডায় বিশেষজ্ঞ সেতু প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত) এবং প্রফেসর ড. খান মাহমুদ আমানত (দীর্ঘদিন ধরে বুয়েটে কাঠামো প্রকৌশল বিষয়ে অধ্যাপনা করছেন)।
বিশেষজ্ঞবৃন্দের কেউই আরসিসি নির্মাণকাজে লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশের ফালি বা কাঠ ব্যবহার হতে দেখেননি বলে নিশ্চিত করেছেন। প্রকৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রচলিত আরসিসি নকশায় রডের পরিবর্তে এ ধরনের উপকরণ ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তারা অভিন্ন মত প্রকাশ করেন।
কেন লোহার রড, কেন বাঁশ নয়?
খোয়া, বালি, সিমেন্ট ও পানি মিশিয়ে যে কংক্রিট তৈরি হয়, তাকে প্লেইন কংক্রিট বলা হয়। এর সঙ্গে প্রকৌশলগত নকশা অনুযায়ী স্টিলের রড যুক্ত করলে তা হয় রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট বা আরসিসি।
কংক্রিট চাপ সহ্য করতে পারে, কিন্তু টান সহ্য করার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে, স্টিলের টান সহ্য করার ক্ষমতা বেশি। পাশাপাশি স্টিল ও কংক্রিটের মধ্যে কার্যকর বন্ধন তৈরি হয়, যার ফলে তারা একসঙ্গে কাঠামোর ওপর কাজ করা বিভিন্ন বল প্রতিরোধ করতে পারে। এ কারণেই আরসিসি কাঠামোয় নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী রড ব্যবহার করা হয়।
বাঁশ বা কাঠকে রডের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করলে কাঙ্ক্ষিত শক্তি ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায় না। এসব উপকরণের যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য স্টিলের মতো নয়; আর্দ্রতা, পচন, পোকামাকড়ের আক্রমণ ও সময়ের সঙ্গে বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনও ঝুঁকি বাড়ায়। কংক্রিটের সঙ্গে তাদের বন্ধনও স্টিলের মতো নির্ভরযোগ্য নয়। বিশেষ করে বাঁশ পানি শোষণ করে ফুলে যেতে পারে এবং পরে শুকিয়ে সংকুচিত হতে পারে। এতে কংক্রিটের সঙ্গে সংযোগ দুর্বল হওয়া, ফাঁক সৃষ্টি হওয়া এবং কাঠামোর কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাঁশ দিয়ে কোনো ধরনের নির্মাণই সম্ভব নয়। বাঁশ নিজেই একটি নির্মাণসামগ্রী এবং উপযুক্ত নকশায় বিভিন্ন কাঠামোয় ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু প্রচলিত আরসিসি কাঠামোয় স্টিলের রডের পরিবর্তে বাঁশ বসিয়ে দিলেই সমতুল্য শক্তি, স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা পাওয়া যাবে, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।
অতএব, সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ফুটপাতের স্ল্যাবেও অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রড ব্যবহার করা অপরিহার্য। বিষয়টি কেবল উপকরণ বদলের নয়; এটি কাঠামোর নিরাপত্তার প্রশ্নও।
তদারকির দায়িত্ব কার?
নির্মাণকাজে ঠিকাদারকে অনুমোদিত নকশা, স্পেসিফিকেশন ও চুক্তির শর্ত অনুসরণ করতে হয়। কাজের গুণগত মান যাচাই এবং এসব শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্বের পরিধি আলাদা হতে পারে, কিন্তু তদন্ত ছাড়া সব দায় কেবল একজন সাইট সুপারভাইজার বা সাব-ঠিকাদারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। সত্য বলতে কি, এই কাজে ঠিকাদারের বিল পরিশোধে যাদেরই সংশ্লিষ্টতা আছে, তাদের কেউই এ অনিয়মের দায় এড়াতে পারেন না।
উল্লেখ্য, সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করা হয়ে থাকলে, সেটি এমন একটি গুরুতর বিচ্যুতি, যা নির্মাণের সময় যথাযথ পরিদর্শনে শনাক্ত করা সম্ভব হওয়ার কথা। এক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরা প্রকৌশলী না হয়েও অনিয়মটি দেখতে পেয়েছেন।
তদারককারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারি দায়িত্ব পালন করেন এবং জনগণের অর্থে বেতন-ভাতা পান। তাই তাদের দায়িত্ব কেবল অনিয়মের পর তদন্তে সহযোগিতা করা নয়; বরং অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও। দায়িত্বপ্রাপ্তদের অগোচরে কাজটি হয়েছে, এমন দাবির পাশাপাশি তদারকি কীভাবে ব্যর্থ হলো, সেই প্রশ্নেরও উত্তর জানা দরকার।
তদন্ত কীভাবে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে?
এ ঘটনা খতিয়ে দেখতে একাধিক তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তদন্ত কমিটিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা বিভাগের প্রকৌশলীরাই যদি একমাত্র কারিগরি সদস্য হন, তাহলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষত তদন্তাধীন কাজের অনুমোদন, তদারকি বা বিল যাচাইয়ের সঙ্গে তাদের প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা থাকলে 'কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট' বা স্বার্থের সংঘাতের অবকাশ থেকেই যায়।
এ কারণে তদন্ত কমিটিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের পাশাপাশি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ এবং অন্তত একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপককে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি সুপ্রতিষ্ঠিত কনসাল্টিং ফার্ম ও ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে কর্মরত আছেন এমন প্রকৌশলীদেরও তদন্ত দলে রাখা যেতে পারে। তাদের কারিগরি দক্ষতা, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
তদন্তে অন্তত কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন:
১. অনুমোদিত নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজটি কীভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল?
২. বাস্তবে কোন উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে এবং কতটুকু কাজ ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে?
৩. ত্রুটিপূর্ণ কাজটি কার নির্দেশে হয়েছে এবং ঠিকাদার, সাব-ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল?
৪. রাতের আঁধারে ঢালাইয়ের কাজ চলার সময় নির্ধারিত তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কীভাবে ব্যর্থ হয়েছে?
৫. ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া কাজের কোনো অংশ ভেঙে পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন কি না এবং সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নিতে হবে?
৬. এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের পূর্বাভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে শুধু দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই নয়, ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধের উপায়ও নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
একটি সেতু কেবল ইট-বালি-সিমেন্ট-রডের সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের অর্থ এবং প্রকৌশলীদের পেশাগত দায়িত্ব। বাসাইলের ঘটনায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ নয়; বরং এমন একটি গুরুতর বিচ্যুতি কীভাবে তদারকি ব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে গেল, সেটিও। স্থানীয় বাসিন্দারা সময়মতো প্রতিবাদ না করলে কী ঘটত, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে তাঁদের সচেতনতা সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। এ জন্য তাঁরা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
উন্নত দেশগুলোতে দেখেছি, সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলমান অবস্থায় সাইটের এক স্থানে প্রকল্পের নকশাসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য বড় আকারের সাইনবোর্ডে জনসাধারণের কাছে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়। জনসচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশেও এ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে শুধু কে বাঁশ ব্যবহার করেছেন, তা খুঁজে বের করাই যথেষ্ট নয়; কেন এবং কীভাবে এমন কাজ সম্ভব হলো, কারা দায়িত্বে ছিলেন, তদারকি কোথায় ব্যর্থ হলো এবং অনুমোদিত নকশা ও স্পেসিফিকেশন থেকে কীভাবে বিচ্যুতি ঘটল, এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন। তদন্তে অপরাধ বা দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও দায়ের মাত্রা অনুযায়ী যথাযথ শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কেবল সাব-ঠিকাদার বা নিম্নপদস্থ কোনো প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা দু-একজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার বা বদলি করাই যথেষ্ট নয়।
একই সঙ্গে অতীতে এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণকাজ অন্যান্য স্থানেও হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এ প্রেক্ষাপটে সন্দেহজনক পুরোনো স্থাপনাগুলোকে ঝুঁকির ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে, যাতে কোনো সম্ভাব্য বিপর্যয় ঘটার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আগেই বলেছি, আজকাল নন-ডেস্ট্রাক্টিভ টেস্টিং ও বিশেষ ধরনের স্ক্যানার ব্যবহার করে নির্মাণকাজে রডের উপস্থিতি ও পরিমাণ সহজেই পরীক্ষা করা যায়।
সবশেষে বলি, সরকারি নির্মাণকাজে অনিয়ম কেবল একটি বিল, একটি উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা কিছু মানুষের লাভক্ষতির বিষয় নয়; এটি জনসম্পদের অপচয়, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, এবং সর্বোপরি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই বাসাইলের ঘটনাটির তদন্ত এমনভাবে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত হয়। মানুষের জীবনের নিরাপত্তার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এই গুরুত্বপূর্ণ তদন্তটিও যেন দেশের অন্য অনেক অঘটনের তদন্তের মতো ঘোর অমানিশায় হারিয়ে না যায়।
এম এল গনি: কানাডাপ্রবাসী প্রকৌশলী ও অভিবাসন পরামর্শক। ই-মেইল: lgani2001@yahoo.com
