১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

কুমিল্লায় ‘অপহৃত’ তরুণ এক মাসেও উদ্ধার হয়নি

আশিকের মায়ের করা অপহরণ মামলায় আসামিদের ‘মাদক কারবারি’ বলে উল্লেখ করেছেন।

কুমিল্লায় ‘অপহৃত’ তরুণ এক মাসেও উদ্ধার হয়নি

আশিকুর রহমান আশিক

আবদুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 31 Aug 2022, 09:24 PM

Updated : 01 Sep 2022, 03:44 PM

কুমিল্লার আশিকুর রহমান ওরফে আশিকের খোঁজ এক মাসেও মেলেনি, যাকে একদল লোক বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে বলে তার পরিবারের অভিযোগ।

চলতি বছরের ৩১ জুলাই সকালে নগরীর ভাড়া বাসা থেকে আশিকুর রহমান ওরফে আশিককে (১৮) একদল লোক তুলে নিয়ে যায় বলে তার মা তাসলিমা বেগমের অভিযোগ।

এই অভিযোগে ২ অগাস্ট তাসলিমা বেগম কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় সাত জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত পরিচয় আরও ২/৩ জনের বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা দায়ের করেছেন।

জেলা ও থানা পুলিশের ভাষ্য, তারা ওই তরুণকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

আশিকের মা তাসলিমা বেগম ও বাবা রিকশাচালক আলমগীর হোসেন কুমিল্লা নগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গোবিন্দপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। তাদের গ্রামের বাড়ি জেলার মুরাদনগর উপজেলার রতনপুর গ্রামে।

বুধবার দুপুরে তাদের এই বাসায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা বলেন আশিকের বাবা-মা।

তাসলিমা বেগম বলেন, “মাদক ব্যবসায়ীরা কইছিল তাগো লগে মাদক বেচার কাম করার লাইগ্যা। আমার পোলাডা তারার লগে এই অন্যায় কামে না যাইয়া মাদকের বিরুদ্ধে কথা কইছিল। এইডাই কি আমার পোলার অপরাধ? এর লাইগ্যা মাদক ব্যবসায়ীরা দিনদুপুরে আমরার ঘরে হামলা কইরা আমার পোলাডারে তুইল্যা লইয়া গেল। এক মাস হইল এহনও পোলাডার কোনো খবর পাইলাম না।

“আমার মনে টানে মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীরা মনে হয় আমার পোলাডারে মাইরা লাশ গুম কইরা রাখছে।”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, পুলিশরে পয়সা দিতে পারি না। এর লাইগ্যা পুলিশও আমার পোলারে খুঁজনের তেমন কোনো চেষ্টা করে না। গত একটা মাস পোলাডার লাইগ্যা দুই চোখে ঘুম নাই। জানি না পোলাডারে আর কহনও দেখতাম পাইরামনি।”
আশিকের মায়ের দায়ের করা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন নগরীর গোবিন্দপুরের জাহের মিয়ার ছেলে মুসি মিয়া, পাশের ঠাকুরপাড়ার রায়হান, নয়ন, পলাশ, বাহারাম, অভি ও সোহাগ।

মামলায় আসামিদের ‘মাদক কারবারি’ বলে উল্লেখ করেছেন তাসলিমা।
আশিকের বাবা রিকশাচালক আলমগীর হোসেনও ছেলের জন্য পাগলপ্রায়।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি রিকশা চালিয়ে যা আয় করি তা দিয়ে ডাল-ভাত খেতেই কষ্ট হয়ে যায়। মামলার খরচ চালাতে পারছি না। আমার ছেলেকে উদ্ধারে তেমন কোনো তৎপরতা নেই পুলিশের। মানুষে বলে টাকা দিতে পারো না, এজন্য পুলিশও দৌড়ায় না। আমার ছেলের বেঁচে থাকা নিয়ে সবার মতো আমারও সন্দেহ আছে। কারণ বেঁচে থাকলে এতদিনে ঠিকই তাকে ছেড়ে দিত ওই মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীরা।”

ছেলের ভাগ্যে কী আছে সেটা জানতে চেয়ে এই রিকশাচালক বলেন, “জীবিত অবস্থায় ছেলেটার মুখটা একবার হলেও দেখতে চাই।”

আলমগীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ছেলেকে উদ্ধার তো দূরের কথা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা বাদীকে নিয়ে ঘণ্টার পর বসিয়ে রেখে বিভিন্ন কথা বলে।

“তাদের অবস্থা দেখে মনে হয় আমরাই ছেলেকে লুকিয়ে রেখেছি। আমি প্রশাসনের বড় অফিসারদের কাছে আমার ছেলের সন্ধান চাই। গরিবের জন্য পয়সা ছাড়া পুলিশ কাজ করে কি-না, সেটা আমরা দেখতে চাই।”

ছেলেকে তুলে নেওয়ার নেপথ্যের কারণ জানতে চাইলে আলমগীর বলেন, “মামলার আসামিরা এলাকায় মাদকের ব্যবসা করে। তাদের সঙ্গে মাদক বিক্রির কাজ করতে বললে আশিক মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। এ নিয়ে সন্ত্রাসী মুসি আমার ছেলের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আমার ছেলে টাইলসের কাজ করে। ঘটনার দিন এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার জন্য কাজে যায়নি। ওইদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে মুসির নেতৃত্বে ওই সন্ত্রাসীরা আমার ভাড়া বাসায় হামলা চালিয়ে আমার ছেলেকে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা আমার ছেলে টেনে-হিঁচড়ে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার কোনো খবর পাইনি আমরা।”

এই বিষয়ে কুমিল্লা কোতয়ালি মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ সহিদুর রহমান বলেন, “আমরা এরই মধ্যে মামলার প্রধান আসামি মুসিকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। এখন পর্যন্ত মামলার দুইজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে প্রধান আসামির দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই করে দেখা হচ্ছে। আর মামলার বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ওই তরুণকে উদ্ধারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

পরিবারের হত্যা ও গুমের শঙ্কার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “ঘটনার এক মাস হওয়ায় তারা এমন কথা বলছে। আমাদের কাছেও এই কথা বলেছেন তারা। তবে আমরা ওই তরুণকে উদ্ধারে কাজ না করে বসে আছি – পরিবারের এই অভিযোগ সত্য নয়। পুলিশ ওই তরুণকে উদ্ধারে কোনো অবহেলা করছে না।”

এ বিষয়ে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) এম. তানভীর আহমেদ বলেন, যেকোনো মামলাই পুলিশ গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে থাকে। আইন সবার জন্যই সমান। ওই তরুণের বাবা একজন রিকশাচালক আর এজন্য পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে না, এগুলো অযৌক্তিক কথা।

“আমি বিষয়টি নিয়ে থানার ওসির সঙ্গে কথা বলব। যত দ্রুত সম্ভব ওই তরুণকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে। পুলিশ এক্ষেত্রে কোনো অবহেলা করবে না।”