১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইতালি যাত্রা: ১০ মাস ধরে নিখোঁজ তরুণের সন্ধান চেয়ে মায়ের আকুতি

ছেলে সাগরকে ফেরতের আশায় ধাপে ধাপে দালালদের ৩২ লাখ টাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মাদারীপুর সদরের বাসিন্দা বেলাতুননেছা।

ইতালি যাত্রা: ১০ মাস ধরে নিখোঁজ তরুণের সন্ধান চেয়ে মায়ের আকুতি
মো. সাগর মিয়া।

মাদারীপুর প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 Aug 2026, 03:22 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে ১০ মাস ধরে নিখোঁজ ছেলে। ফেরতের আশায় দালাল চক্রকে ধাপে ধাপে দিয়েছেন ৩২ লাখ টাকা, করেছেন মামলা। তবুও মেলেনি ছেলের খোঁজ।

তাই শনিবার বিকালে নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলনে করে ছেলেকে ফেরত পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন মাদারীপুর সদর উপজেলার খোঁয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা এলাকার বাসিন্দা বেলাতুননেছা। 

তার ২০ বছর বয়সি ছেলে মো. সাগর মিয়া গত বছরের নভেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। বেলাতুননেছার স্বামী খবির মোল্লা পেশায় কৃষক।

সংবাদ সম্মেলনে বেলাতুননেছা বলেন, “দালাল খালি আশা দিচ্ছে। ছেলেকে ফিরাইয়া দেওয়ার কথা কইয়া দালালে ধাপে ধাপে ৩২ লাখ টাকা নিছে। জমিজমা সব শেষ, ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে পড়েছি।

“তারা (দালাল) এখনো কয় না আমার ছেলে নাই। কিন্তু আমার ছেলে আর নাই, এটা বুঝতে পারতাছি। বাঁইচা থাকলে ছেলেতো যোগাযোগ করতো।” 

তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, “আমার বাঁচতে কষ্ট হচ্ছে। আমার ছেলেরে ওরা কি করেছে সেটা জানতে চাই। আমার সোনারটুকরা বাবার সন্ধান চাই। ওই আমার ভরসা।”

দালালের বিরুদ্ধে মামলা করে উল্টো হয়রানি ও হুমকির মধ্যে পড়েছেন বলেও দাবি তার। 

তিনি বলেন, “মামলা দিয়েছি, চালাতে পারতাছি না। মামলা তুলে নিতে দাদালরা হুমকি দিচ্ছে। আমি বিচার চাই, ছেলেকে ফেরত চাই।”

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মাদারীপুর শহরের সৈদারবালী এলাকার মানবপাচার চক্রের সদস্য ও স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারীর প্রলোভনে পড়ে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সাগর। পরে ২৩ লাখ টাকায় সাগরকে সরাসরি ইতালি পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি করে চক্রটি। 

চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর তিন ভাগের এক ভাগ টাকা পরিশোধ করে সাগরের পরিবার। একদিন পর ৩ নভেম্বর সাগরকে আকাশপথে সৌদি আরব নেওয়া হয়। সেখানে দুদিন রেখে মিশর হয়ে লিবিয়া নিয়ে যাওয়া হয় ।

কিন্তু বাংলাদেশি দালাল চক্র সাগরকে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় নিয়ে যায়। পরে সাগরের পরিবার থেকে চুক্তির পুরো ২৩ লাখ টাকা আদায় করে।  

টাকা পেয়ে ১৫ নভেম্বর রাতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পাঠানোর উদ্দেশ্যে সাগরকে লিবিয়ার উপকূল থেকে একটি নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। 

নৌকাটি কিছুদূর যাওয়ার পথে লিবিয়ার সন্ত্রাসীদের হাতে আটক হয়েছে বলে সাগরের পরিবারকে জানায় দালাল চক্রটি। এবং সাগরের মুক্তির জন্য ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়।

টাকা না পাওয়ার সাগরের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। পরে বাংলাদেশি আরেক দালাল গোলাম মওলার (৪৮) মাধ্যমে সাগরের মুক্তির জন্য ৯ লাখ টাকা দেয় তার পরিবার। কিন্তু তারপর থেকে সাগরের কোনো সন্ধান দিচ্ছে না দালাল চক্রটি। 

দালালদের কাছে বারবার ধরণা দেওয়া হলেও তারা আশ্বাস ছাড়া কোনো খোঁজ গত দশ মাসে দিতে পারেনি। তাই বাধ্য হয়ে সাগরের মা বেলাতুননেছা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সন্তানের সন্ধান চেয়ে লিখিত আবেদন করেন। 

একইসঙ্গে গত ৪ জানুয়ারি দালালের বিচার ও ছেলের সন্ধান চেয়ে মাদারীপুর আদালতের মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইবুন্যালে পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন বেলাতুননেছা।

স্থানীয় বাসিন্দা ও নিখোঁজ সাগরের সহপাঠী নাসির ইসলাম বলেন, “সাগররা দুই ভাই এক বোন। ভাইদের মধ্যে সাগর বড়। পরিবারটি সাগরকে বিদেশে পাঠাতে গিয়ে সব কিছু শেষ করে দিয়েছে। ভিটেবাড়িটুকুও বন্ধক রাখা। তবুও যদি ওর সন্ধান পাওয়া যেত, তাহলে কষ্টটা থাকতো না।

“যারা সাগরকে প্রলোভন দিয়ে ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়া নিছে, মুক্তিপণের জন্য টাকা নিছে সেই দালালদের বিচার চাই।”

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে নামজুল ব্যাপারী নিজেকে নিরাপরাধ দাবি করে বলেন, ‘আমি কোনো দালালি করি না। এগুলো আমার নামে মিথ্যে অভিযোগ।’ অন্যদিকে গোলাম মওলার ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

মাদারীপুর সদর মডেল থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, “মানবপাচার রোধে আমরা সব্বোর্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। কোনো আসামিকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। অনেক মামলার আসামি দীর্ঘদিন ধরে দেশছাড়া।”

তিনি আরও বলেন, “সাগরের মা তার সন্তানের সন্ধান চেয়ে যে মামলাটি আদালতে করেছে, সেটি সদর থানার পুলিশ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ঘটনায় এক আসামিকেও ধরা হয়েছিল। বাকি আসামিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”