১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

রামুতে বন্য হাতির আক্রমণে মা ও শিশুর মৃত্যু

ভোরে বন্য হাতির একটি পাল লোকালয়ে ঢুকে কয়েকটি বসতঘরে তাণ্ডব চালায়।

কক্সবাজার প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Apr 2026, 08:13 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:31 PM

কক্সবাজারের রামু উপজেলায় আবার বন্য হাতির আক্রমণে এক মা ও তার তিন বছরের শিশুকন্যার মৃত্যু হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার ভোর ৫টার দিকে উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পশ্চিম খুনিয়াপালং এলাকার সৈয়দ কলোনীতে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ধোয়াপালং রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. তোসাদ্দেক হোসেন।

নিহতরা হলেন- ছেমন আরা (২৫) এবং তার মেয়ে আসমা বিবি। তারা স্থানীয়ভাবে বসবাসরত মো. একরাম মিয়ার স্ত্রী ও সন্তান।

খুনিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য জয়নাল আবেদিন বাবুল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভোরে তিনটি বন্য হাতির একটি পাল লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। হাতিগুলো কয়েকটি বসতঘরের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলের পাশাপাশি গাছপালা উপড়ে ফেলতে শুরু করে।

“বিকট শব্দে বাসিন্দারা ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। একরামও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বের হন। এ সময় দুটি হাতি তাদের দিকে তেড়ে এলে বড় ছেলেকে নিয়ে পেছনের দিকে সরে গিয়ে বাঁচতে পারলেও স্ত্রী ও মেয়ে সামনে পড়ে যান,” বলেন তিনি।

হাতির আক্রমণে ঘটনাস্থলেই মা ও মেয়ের মৃত্যু হয় বলে জানান স্থানীয়রা।

ইউপি সদস্যের ভাষ্য, হাতির পালটি ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। ফলে সামনে পড়ে গেলে পালানোর সুযোগ ছিল না। তাণ্ডব চালানোর সময় হাতিগুলো আশপাশের আম ও কাঁঠাল খেয়ে পাশের পাহাড়ে চলে যায়।

স্থানীয়দের বরাতে জয়নাল আবেদিন বলেন, সম্প্রতি খাবারের সন্ধানে হাতির পাল খুনিয়াপালং ও দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করছে; যা জনজীবনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ধোয়াপালং রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. তোসাদ্দেক হোসেন বলেন, “ঘটনার পর হাতির পালটিকে তাড়িয়ে গভীর বনে পাঠানো হয়। তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

তবে বন বিভাগ বলছে, এ অঞ্চলে মানুষ ও হাতির সংঘাত নতুন কিছু নয়।

দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, তাদের অধীনে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। 

এর মধ্যে প্রায় আট হাজার একর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং আরও প্রায় ১১ হাজার একর বিভিন্নভাবে দখল হয়ে গেছে। এ ছাড়া বনের ভেতরেও বিচ্ছিন্নভাবে বসতি গড়ে উঠেছে।

“আজকের ঘটনাস্থলটি ক্যাম্প থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের বনে। তবে বনের ভেতরে বসবাসকারী অনেকেই ঝুঁকিতে আছেন,” বলেন তিনি।

২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী দক্ষিণাঞ্চলে ৬০ থেকে ৭০টি হাতি ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৪টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর বিপরীতে মানুষ মারা গেছে অন্তত ৮ জন।

অন্যদিকে উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, ২০১৬ সালের হিসাবে উত্তরের বনে ৭০ থেকে ৮০টি হাতি ছিল। গত এক বছরে একটি হাতি মারা গেছে, তবে গত দশকের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহে সময় লাগবে।

৭৪ হাজার একর বনভূমির মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার একর দখল হয়ে গেছে; যা নিয়ে মামলা চলছে বলে জানান তিনি। 

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন উজাড়, বসতি সম্প্রসারণ এবং খাদ্যসংকটের কারণে হাতিরা ক্রমেই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নেকম’-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা শফিক রহমান বলেন, “হাতির বিচরণক্ষেত্র কমে গেছে, খাদ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। তাই তারা লোকালয়ে চলে আসছে।”

“অনেক ক্ষেত্রে বনভূমিতে চাষাবাদ করলেও ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পান না। ফলে কেউ কেউ হাতি ঠেকাতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ বা গুলি ব্যবহার করেন। আর এতে মারা পড়ছে হাতিও”, বলেন তিনি।

এখনি কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।