‘যার বোমা থাকবে সে জিতবে, যার বোমা শেষ সে পালিয়ে যাবে’
শরীয়তপুরের জাজিরায় মুহুর্মুহু হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দুপক্ষের মধ্যে এ সংঘর্ষে কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন।
আধিপত্য বিস্তারে শরীয়তপুরের জাজিরায় মুহুর্মুহু হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পর এলাকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে গ্রাম।
উপজেলার বিলাশপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকরা নিজ নিজ শক্তির জানান দিতেই শনিবার সকালে দূর্বাডাঙ্গা এলাকায়এমন সংঘর্ষে জড়িয়েছেন বলে জানিয়েছেন মধ্যে বিলাশপুর ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশের সদস্য মোহাম্মদ আলী।
সংঘর্ষে পাঁচ শতাধিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “যার যতক্ষণ বোমা থাকবে সে জিতবে। যার বোমা শেষ, সে পালিয়ে যাবে। এবার এক হাজার ফোটানো হোক বা পাঁচশ ফোটানো হোক। এমন ছিল পরিস্থিতি।”
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় হাতবোমার আঘাতে ফাতেমা (৪৫) রিনা (৩৫) ও ফাহিমা (৩৫), শোহরাহ মিয়া, আতাউর মল্লিক (৪৫), সেলিনা বেগম (৩০), জহুরা বেগম (৪৩), ফাতেমা আক্তার (৪৬), লাভলী বেগম (৩২), সাঈদ মিয়া (৫৫) সহ কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছে।
তাদের উদ্ধার করে জাজিরা, ঢাকাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
সংঘর্ষের সময় খালেক মুন্সির বাড়ি, সেকান্দর মুন্সির বাড়ি মোহাম্মদ চৌকিদারের বাড়িসহ পাঁচটি বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়রা ও পুলিশ জানায়, বিলাশপুর ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বর্তমান চেয়ারম্যান আ. কুদ্দুস বেপারী এবং পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আ. জলিল মাদবরের মধ্যে বিরোধ চলছে। তারা দুজনই জাজিরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য।
এই বিরোধের জের ধরে এলাকায় একাধিকবার সংঘর্ষে প্রাণহানিসহ শতাধিক লোকজন আহতের ঘটনা ঘটেছে। উভয় গ্রুপের মধ্যে কয়েক ডজন মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোজার ঈদকে সামনে রেখে উভয় পক্ষের সমর্থকরা বাড়ি আসে। এরপর একে অপরের লোকজনকে কটাক্ষ করে কথা বলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
ঈদের দিন রাতেও কুদ্দস বেপারীর সমর্থকরা তাদের এলাকায় হাতবোমা বিস্ফোরণ করে শক্তির জানান দেয়। এ সংবাদ পেয়ে জলিল মাদবর সমর্থকরাও তাদের শক্তি জাহির করতে এলাকায় হাতবোমা ফাটিয়।
এর জের ধরে শনিবার সকাল ৭টায় জলিল মাদবর সমর্থকরা মুলাই বেপারী কান্দি থেকে শুরু করে সলিমুল্লাহ মাদবর কান্দি ও আহসান উল্লাহ মুন্সি কান্দি পর্যন্ত প্রায় ৪-৫ কিলোমিটার এলাকায় হাতবোমার বিস্ফোরণ করতে করতে পদ্মাপাড়ে চলে যায়।
সেখানে কুদ্দুস বেপারী সমর্থকদের সঙ্গে আধাঘণ্টা মুখোমুখি ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এসময় মুহুর্মুহু হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
বোমার শব্দে এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। ঈদের সময় ঐ এলাকায় বেড়াতে আসা লোকজন আটকা পড়ে চিৎকার শুরু করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করে নিরাপদে সরিয়ে দেয়।
এক পর্যায়ে কুদ্দুস বেপারী সমর্থকদের বোমা শেষ হয়ে গেলে তারা পিছু হটে। এ সময় জলিল সমর্থকরা তাদেরকে ধাওয়া করে পদ্মা নদীর ওপারে তাড়িয়ে দেয়।
এ সময় কুদ্দুস সমর্থক হাচেন মুন্সি ও রাকিব মুন্সির দুটি মোটরসাইকেল ভাংচুর করেছে।
কুদ্দুস সমর্থক ও আহসান উল্লাহ মুন্সি কান্দি এলাকার বাসিন্দা ফেরদৌসি আকতার বলেন, “আমাদের লোকজনের বোমা শেষ হয়ে জলিলের লোকেরা আমাদের বাড়িঘরে হামলা চালায়, বোমা ফুটিয়ে ভাঙচুর করে।”
দুপক্ষের এ সংঘর্ষ ও হাতবোমা বিস্ফোরণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকেও ছড়িয়ে পড়ে।
১৫ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি খোলা মাঠে উভয় পক্ষের লোক মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। সেখানে হেলমেট পরিহিত অনেকের হাতে বালতি দেখা যায়। সেসব বালতি থেকে হাতবোমা নিয়ে প্রতিপক্ষের দিকে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। হাতবোমাগুলো বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে মাঠজুড়ে ধোঁয়ার সৃষ্টি করছে।
জাজিরা থানার ওসি দুলাল আখন্দ বলেন, “আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়েছে। এখন পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। কোনো অস্ত্র বা বোমাও উদ্ধার করতে পারেনি। এ ঘটনায় কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ করেনি।
এ ঘটনার পর জলিল মাদবর ও কুদ্দুস বেপারী মোবাইল বন্ধ করে গা ঢাকা দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে নড়িয়া সার্কেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশিকুর রহমান বলেন, “এলাকা এখন শান্ত। অতিরিক্ত পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। যৌথবাহিনীও আমাদের সঙ্গে আছে। এখনো কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ করেনি।”
