Published : 11 Jul 2025, 09:25 PM
ফেনীর পাঁচ উপজেলায় সাড়ে ৩৪ হাজার মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে কিছু এলাকায় বন্যার উন্নতি হওয়ায় লোকজন আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়িমুখি হয়েছেন।
শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার ছয় উপজেলার মধ্যে পাঁচ উপজেলা বন্যা আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে; আবার কোথাও কোথাও পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।
প্রশাসন ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এখনো তিনটি উপজেলার যোগাযোগের প্রধান সড়ক দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ফেনী-পরশুরাম সড়কে চতুর্থ দিনের মত ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
একই সড়কের ফুলগাজীর বিভিন্ন অংশে শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে রয়েছে।
ফেনী-ছাগলনাইয়া সড়কের উপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় ছোট যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে সীমান্তবর্তী পরশুরাম উপজেলার অনেক স্থান থেকে পানি কমতে শুরু করলেও ফুলগাজীর বিভিন্ন এলাকায় এখনো কোমর সমান পানিতে বন্দি হয়ে আছেন অনেকেই।
শুরু থেকে বন্যা আক্রান্ত ফুলগাজী ও পরশুরাম এই দুই উপজেলার পাশাপাশি ছাগলনাইয়া (আংশিক), সদর (আংশিক) ও দাগনভূঞা (আংশিক) উপজেলার মোট ১১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি না হওয়ায় এবং নদীর পানি কমায় ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলায় বিদ্যুতের দুর্ভোগ অনেকটা কমেছে।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রিতদের মাঝে পর্যাপ্ত খাওয়ার বিতরণ করছে। তবে অনেকে খাবার না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন।

বন্যা আক্রান্তদের দুর্ভোগ
ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলায় বন্যা আক্রান্তদের অনেকে দুর্ভোগে থাকার কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছেন, তাদের অনেক কিছুই বন্যায় ভেসে গেছে।
ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের উত্তর শ্রীপুর গ্রামের পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ নুর নবী বলেন, ছোট্ট একটি চা দোকান করে পরিবার চালান। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে একচালা ঘর থেকে দোচালা ঘর তৈরি করেছেন সম্প্রতি। হঠাৎ এই বন্যায় তার ঘরটি ভেঙে পড়েছে, নষ্ট হয়েছে মালামাল।
“স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। বুধবার চিড়া-মুড়ির একটি প্যাকেট পেলেও আর কেউ খোঁজখবর নেয়নি। বন্যার পর অন্যত্র আশ্রয় নিলেও এখনো ঘরে ফিরতে পারিনি।”
একই গ্রামের নাপিতকোন এলাকার ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা জাহানারা বেগম বলেন, বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট বন্যায় তার ঘরটি তলিয়ে যায়। তিনি ও তার বৃদ্ধ স্বামী শুক্রবার দুপুরে ঘরের মালপত্র অন্যত্র সরাতে ব্যস্ত ছিলেন। চার দিন অতিবাহিত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কেউ কোনো খোঁজখবর নেয়নি।
ফেনী-ফুলগাজী সড়ক দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী নজির আহমেদ বলেন, সড়কে পানি থাকায় তিন দিন ধরে ফেনী-পরশুরাম সড়কটি বন্ধ রয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ নিতে বাধ্য হয়ে কয়েকগুণ বেশি ভাড়ায় ট্রাক্টরে চড়ে পরশুরাম গিয়েছিলেন।
মাছ ধরতে গিয়ে বৃদ্ধের মৃত্যু
ফুলগাজীতে বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে নুরুল আলম (৬২) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।
নুরুল আলম দৌলতপুর এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক কমান্ডারের ছেলে।
উপজেলার বন্দুয়া দৌলতপুর এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার রাতে ওই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শুক্রবার তাকে দাফন করা হয়েছে।
পরিবারের লোকজন জানিয়েছে, বন্যার পানিতে মাছ ধরতে জাল পেতেছিলেন নুরুল। সেই জাল তুলতে গিয়ে তিনি পানিতে তলিয়ে যান। পরে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

প্রশাসনের তৎপরতা
ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইসমাইল হোসেন বলেন, ফেনীতে চার দিনের বন্যায় পাঁচ উপজেলায় ১১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এদের মধ্যে ফুলগাজীতে ৬৭, পরশুরামে ২৭, ছাগলনাইয়া ১৫, দাগনভূঞায় দুটি এবং সদরে একটি গ্রাম রয়েছে।
এ পাঁচ উপজেলায় ৩৪ হাজার ৬০০ জন বন্যা আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে দুই হাজার ৬২৫টি পরিবারের আট হাজার ৯৬৬ জন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। ৬৪৮টি গবাদিপশু আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করেছে।
ফেনী জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, বন্যা আক্রান্তদের জন্য পাঁচ উপজেলায় ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আক্রান্ত উপজেলাগুলোর নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের সব কর্মকর্তা তৎপর রয়েছেন। পরিস্থিতির দ্রুতই উন্নতি হচ্ছে।