Published : 04 Aug 2026, 05:41 PM
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় প্রেমের সম্পর্কের অপবাদ দিয়ে স্কুলছাত্রী ও এক যুবককে গাছে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও তাদের খোঁজ মেলেনি। এ ঘটনায় সাবেক এক বিএনপি নেতাসহ আট জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ওই বিএনপি নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ; আর বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।
পুলিশ জানায়, গত ২৮ জুলাই রাহুথড় গ্রামের ‘রাহুথড় উদয়ন বিদ্যাপীঠ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ এলাকায় অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রী ও এক যুবককে গাছে বেঁধে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি আলোচনায় আসে এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছে, ঘটনার পর থেকে নির্যাতনের শিকার ওই স্কুলছাত্রী ও যুবক আত্মগোপনে রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরাও তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
গোপালগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (মুকসুদপুর সার্কেল) নাফিছুর রহমান বলেন, “ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রধান আসামি নয়ন গোলদারকে রোববার ভোরে মাদারীপুরের রাজৈর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”
গ্রেপ্তার নয়ন গোলদার কাশিয়ানী উপজেলার হাতিয়াড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাহুথড় গ্রামের ধলা গোলদারের ছেলে।
প্রেমের সম্পর্ক আছে অপবাদ তুলে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী ও এক যুবককে গাছে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় হোতা হিসেবে উঠে এসেছে নয়ন গোলদারের নাম। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে নয়ন গোলদার একটি ‘বখাটে বাহিনী’ গড়ে তোলেন।
অভিযোগ রয়েছে, বাহিনীতে সাগর রায় সম্রাট, মিশন রায়, সনাতন সিকদার, জিৎ বিশ্বাস, ভ্যানচালক অনিক মণ্ডল, জয় সিকদার, চয়ন বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। তারা বিভিন্ন অপবাদে গ্রামের নিরীহ মানুষকে ধরে এনে শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে অর্থ আদায় করতেন।
স্থানীয়দের দাবি, আদায় করা অর্থের বড় অংশ নয়ন গোলদারের কাছে যেত এবং বাহিনীর অন্য সদস্যরা সামান্য অংশ পেতেন, যা দিয়ে তারা মাদক সেবন করতেন। তাদের ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৮ জুলাই রাহুথড় উদয়ন বিদ্যাপীঠ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রী ও এক যুবককে বেঁধে রেখে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।
পরে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে। তদন্তে নেমে পুলিশ এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে।
এ ঘটনায় রোববার নির্যাতনের শিকার যুবক সূর্য বাড়ৈয়ের (১৯) বাবা শিবনাথ বাড়ৈ বাদী হয়ে কাশিয়ানী থানায় মামলায় আট জনের নাম উল্লেখ এবং আরও ৫ থেকে ৬ জনকে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করছেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, নির্যাতনের পর সূর্য বাড়ৈকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য নির্যাতনকারীরা চাঁদা দাবি করে। টাকা না দিলে ছেলে ও মেয়ের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরে সূর্য বাড়ৈর মামা অপূর্ব মণ্ডল বিকাশের মাধ্যমে পাঁচ হাজার টাকা পাঠানোর পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এদিকে ঘটনার পর থেকে নির্যাতনের শিকার ওই স্কুলছাত্রীর অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। রোববার বরইভিটা গ্রামে ওই ছাত্রীর বাড়িতে গিয়ে তার মা ও দাদির সঙ্গে কথা হয়। তাদের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট ছিল। তবে নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কারণে তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
ঘটনার পর থেকে মেয়েটি আর বাড়িতে ফেরেনি বলে জানান তার মা । তিনি বলেন, “ঘটনার পর আমার মেয়ে আর বাড়িতে আসেনি। এখন সে কোথায় আছে, সেটাও আমি জানি না।”
রোববার সন্ধ্যায় হাতিয়াড়া গ্রামে ওই যুবকের বাড়িতে গেলে তার মা নিপা বাড়ৈ, যিনি হৃদরোগে আক্রান্ত, শারীরিক অসুস্থতার কারণে কথা বলতে রাজি হননি। এ সময় সেখানে উপস্থিত স্বজন ও প্রতিবেশীরাও কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
রাহুথড় উদয়ন বিদ্যাপীঠ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, “ঘটনার সময় আমি নামাজে ছিলাম। পরে অফিসে এসে দেখি, স্থানীয় নয়ন গোলদার এক ছাত্রী ও এক যুবককে বসিয়ে রেখেছেন। আমি প্রধান শিক্ষককে বিষয়টি জানাই এবং অভিভাবকদের খবর দেওয়া হয়। পরে ছেলেটিকে তার অভিভাবক এবং ছাত্রীকে স্কুলের দপ্তরী ও তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মণ্ডলের জিম্মায় দেওয়া হয়।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইন্দ্রজিৎ সরকার বলেন, “ঘটনার সময় আমি বিদ্যালয়ে ছিলাম না। দায়িত্বে ছিলেন সিনিয়র শিক্ষক আনোয়ার হোসেন। পরে বিষয়টি জেনে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে জানিয়েছি।”
তিনি বলেন, “ঊর্ধ্বতন শিক্ষা কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে না জানানো আমার ভুল হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
নির্যাতনের শিকার যুবকের বাবা শিবনাথ বাড়ৈ বলছেন, “ঘটনার দিন আমি পাট কাটার কাজে বাইরে ছিলাম। পরে জানতে পারি, বাড়ির সামনে থেকে আমার ছেলেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়েছে। ঘটনার পর সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। এখন বাড়িতে নেই, আমার সঙ্গেও যোগাযোগ করছে না।”
সহকারী পুলিশ সুপার নাফিছুর রহমান বলেন, “২৮ জুলাইয়ের ঘটনাটি পুলিশ প্রথমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারেনি। পরে গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হলে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় অভিযান শুরু করা হয়। নয়ন গোলদারকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। তাদের অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তাদের বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো অভিযোগ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
স্থানীয় বিএনপি নেতারাও তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করছেন বলে জানান পুলিশের ওই কর্মকর্তা ।