০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্রের বুকে খেলার মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ, দখলের শঙ্কা

অপরিকল্পিত নদী খনন ও অবৈধ বালু বাণিজ্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন নাগরিক সংগঠনের নেতারা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 06 Nov 2026, 07:19 PM

Updated : 06 Nov 2026, 07:27 PM

ময়মনসিংহ নগরের কাচারীঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ভরাট করে খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে মাঠ নির্মাণের আড়ালে নদীর জায়গায় দখলের শঙ্কার কথা বলেছেন নাগরিক সংগঠনটির নেতারা।

ব্রহ্মপুত্র নদ খননে ধীরগতি ও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড, অবৈধ বালু উত্তোলন-বাণিজ্য এবং দখলের প্রতিবাদে ময়মনসিংহে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে নাগরিক সংগঠন ‘ময়মনসিংহ মঞ্চ’।

শুক্রবার বিকাল ৪টায় নগরের কাচারীঘাট এলাকায় এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অধীনে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা প্রাথমিক ব্যয়ে খনন প্রকল্প নেওয়া হয়।

প্রকল্পের আওতায় নদটির উৎসমুখ থেকে গাজীপুরের কাপাসিয়ার টোক পর্যন্ত ২২৭ কিলোমিটার খননের কথা। কিন্তু সাত বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। ধীরগতি ও অপরিকল্পিত খনন নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বক্তারা বলেন, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল সারা বছর নদে নাব্যতা বজায় রাখা, যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল নিশ্চিত করা এবং কৃষি ও মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন। শুষ্ক মৌসুমে নদে ১০ ফুট গভীরতা ও ৩০০ ফুট প্রশস্ততা নিশ্চিত করার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে পানির প্রবাহ বাড়েনি। বরং দিন দিন নদে পানি কমছে।

এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও নদটির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসার কারণ খতিয়ে দেখার দাবি জানান তারা।

সমাবেশে বক্তারা বিশেষভাবে কাচারীঘাট এলাকায় নদ ভরাট করে খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তাদের অভিযোগ, সদর আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদের উদ্যোগে নদীর বুকে মাঠ তৈরির কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। নাগরিক সুবিধা ও খেলাধুলার কথা বলা হলেও এর আড়ালে নদীর জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে দখলের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে কোনো স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তারা।

বক্তারা বলেন, খননের নামে নদ থেকে তোলা বালু বিভিন্ন স্থানে নদীর পাড়ে ফেলে রাখা হচ্ছে। এতে নদীর জায়গা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি দখলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। ভাঙনের শিকার হয়ে ফসলি জমি ও বসতভিটা হারাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।

তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক ছত্রছায়ায় একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার পরিবর্তন হলেও বালু উত্তোলনকারীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়নি। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

সমাবেশে প্রদর্শিত প্ল্যাকার্ডে ‘ব্রহ্মপুত্রে পানি কই’, ‘নদী নাই, দেশ নাই’, ‘ব্রহ্মপুত্রের বুকে স্থাপনা কেন’, ‘খননকাজের খবর কী’ এবং ‘ব্রহ্মপুত্র মরবে কেন’- এমন নানা স্লোগান লেখা ছিল।

সমাবেশ থেকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ খনন প্রকল্পের প্রকৃত অগ্রগতি, ব্যয় ও বাস্তব চিত্র জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানানো হয়। সেইসঙ্গে পরিকল্পিতভাবে খননকাজ সম্পন্ন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, নদীর জায়গায় নির্মিত সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং কাচারীঘাটে নদ ভরাটের উদ্যোগের বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

ময়মনসিংহ মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ইমতিয়াজ আহমেদের সভাপতিত্বে সমাবেশে সংগঠনটির সহ-মুখ্য সমন্বয়ক আবু বক্কর সিদ্দিক রুমেল, সংগঠক প্রকৌশলী এম এ জিন্নাহ, মো. কামরুজ্জামান সাজ, মো. আনোয়ার হোসেন, শাহরিয়ার আহমেদ আশিক, সজীব আকন্দ, আবু সাইফ মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ, মো. আনোয়ারুল হক এবং মো. রফিকুল ইসলাম বক্তব্য দেন।

ময়মনসিংহ সদর আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ বলেন, এখানে স্থায়ী স্থাপনা হবে না। মাঠের স্বল্পতা থাকার কারণে ফুটবল অনুশীলনের জন্য আপাতত জায়গাটি তৈরি করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসককে জানিয়ে খেলার মাঠ তৈরির কাজ শুরু করা হয়েছে।

জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে খেলার মাঠ স্থাপনের বিষয়ে তাকে কেউ মৌখিক বা লিখতভাবে জানায়নি। তবে আবেদন করলে পর্যালোচনা করে দেখার কথা বলেছেন তিনি।