Published : 06 Sep 2025, 09:28 PM
পাঁচ বছর ধরে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পদটি শূন্য থাকায় দ্বায়িত্বটি পালন করছেন একজন প্রকোশলী। নিজ পদের দায়িত্ব পালন করে তার পক্ষে সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির তদারকি করা সব সময় সম্ভব হয় না।
তবে শুধু স্বাস্থ্য কর্মকর্তা না, প্রতিষ্ঠার ১৪ বছর পরও এই সিটি করপোরেশনের দুই তৃতীয়াংশের বেশি পদে কোনো লোক নেই। ফলে নানা সংকট তৈরি হয়ে প্রতিনিয়তই বিঘ্নিত হচ্ছে ২৭টি ওয়ার্ডের ১২ লাখেরও বেশি মানুষের সেবা প্রদান।
সিটি কর্পোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক মো. শাহ আলম জানিয়েছেন, জনবলের চাহিদা জানানো হয়েছে মন্ত্রণালয়। দুই মাসের মধ্যে সংকট কাটিয়ে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
১৮শ শতকের মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠিত ‘কুমিল্লা পৌরসভা’ ছিল এ অঞ্চলের প্রথম প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। পরে ২০১১ সালে কুমিল্লা সদর পৌরসভা ও সদর দক্ষিণ পৌরসভা নিয়ে গঠিত হয় সিটি করপোরেশন।
সরকারিভাবে এই সংস্থায় ২৪২টি পদে জনবলের কথা উল্লেখ রয়েছে। ২২০ জন নিয়ে করপোরেশনের কাজ শুরু হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ৬৭ জনে।

ভোটে নির্বাচিত তিনজন মেয়র এবং একাধিক সময় প্রশাসক নিয়োগ হলেও জনবল সংকট কাটেনি কখনোই। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান প্রকৌশলী, রাজস্ব কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, নগর পরিকল্পনাবিদের মত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো খালি দিনের পর দিন।
এই সংকটের কারণেই সেবাখাতে নাগরিক ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, অপরদিকে বাড়তি দায়িত্বে মানসিক চাপ বাড়ছে কর্মকর্তাদের উপরও।
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি পর্যায়ে মাস্টার রোলে জনবল নিয়োগ দিয়ে চলছে কার্যক্রম। এছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কাজকর্ম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোনোমতে। সে ক্ষেত্রে কর্মচারীদেরও দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের অনেক কর্মকর্তাকেই দুই-তিনটি করে পদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
যেমন নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়েম ভুইয়াকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বের পাশাপাশি পালন করতে হচ্ছে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বও।
একইসঙ্গে একটি প্রকল্প পরিচালকেরও দায়িত্ব পালন করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি ৫ বছর ধরে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে দুইটি পদের দায়িত্ব পালন করছি। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একজন চিকিৎসক স্বাস্থ্যখাত দেখবেন, এটাই হবার কথা ছিল। কিন্তু আমরা বার বার এই পদে লোকবল চেয়েও পাইনি।”
আবু সায়েম ভুইয়া বলেন, “জনবল সংকটটা বাইরে থেকে বুঝা যায় না। একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা থাকলে তিনি সিটি করপোরেশনের আওতাধীন যেসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে সেগুলোর দেখভাল করতে পারতেন।
“এছাড়া যে আটটি উপ-সহকারী প্রকৌশলের পদ খালি রয়েছে, সেগুলোতে জনবল থাকলে তারা অনিয়ম করে হওয়া বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনাগুলোর মনিটরিং করতে পারতেন। এভাবেই জনবলের অভাবে প্রতিটি সেক্টরের সংকট তৈরি হচ্ছে।”

জনবল কেন নিয়োগ হলো না কেন, প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের
নানা সেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হওয়া এই মহানগরীর বাসিন্দারা বলছেন দিন দিন নগরীর জনসংখ্যা বেড়েছে; সেবার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে কিন্তু জনবল বাড়েনি বরং কমেছে। তাই তারা প্রশ্ন তুলছেন, এই উল্টোযাত্রার কারণ কী?
কুমিল্লা সিটির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, “নগরজুড়ে নানান বিশৃঙ্খলা। যানজট-জলাবদ্ধতা নিত্য সমস্যা। শুনলাম, জনবল নাই। সিটি করপোরেশনের ১৪ বছরে জনবল নিয়োগ হলো না কেন? আমরা কি সিটির ট্যাক্স দেইনি? ”
১১ নম্বর ওয়ার্ডের তারিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা জনবল নাই এটা- বুঝি না, এতদিনেও জনবল কেন আসলো না এ প্রশ্নের জবাব কে দিবে? দায়িত্ব অবহেলার কারণে এই শহরটি এখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। আমরা মুক্তি চাই।”
নগরীর ৫ নম্বর ওয়ার্ড মোগলটুলী এলাকার বাসিন্দা সেলিম মাহমুদ বলেন, “বেশ কিছুদিন আগে আমার বাড়িটি বহুতল করার জন্য সব কাগজপত্র জমা দিয়ে রেখেছি। প্রতি মাসে একটি মিটিং হওয়ার কথা।
“কিন্তু গত কয়েক মাসে অফিসার নাই- মিটিং নাই, বলে প্ল্যান পাশ হচ্ছে না। আমিও বাড়ির কাজে হাত দিতে পারছি না।”

নগরীর ১১ নম্বর ওয়ার্ডের নিমতলী এলাকার বাসিন্দা আলমগীর কবির বলেন, “ডাস্টবিনগুলো রাতে পরিষ্কার করার কথা। কিন্তু এগুলো পরিষ্কার করা হয় সকালে, স্কুল-কলেজ টাইমে। তখন দুর্গন্ধ ছড়িয়ে চলাচলে সমস্যা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জিজ্ঞেস করলে, তারা বলে- লোকজন নাই, তাই দেরি হয়। রাতে সম্ভব হয় না, তাই দিনে পরিষ্কার করতে হয়।”
সিটি করপোরেশনের সিসি ক্যামেরা অপারেটর সোলেমান উদ্দিন বলেন, “আমাদের শহরের সিসি ক্যামেরাগুলো দেখাশুনা ও অপারেটিং করতে অন্তত আট জন লোক দরকার। আছি মাত্র দুজন। নগরীর নিরাপত্তা রক্ষায় এসব সিসি ক্যামেরা জরুরি হলেও দেখাশোনার লোক নাই।”
জনবল বাড়লে সেবার মানও বৃদ্ধি করা সম্ভব
সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মাঈন উদ্দিন চিশতী বলেন, “লোকবল দিলেই শুধু হবে না, এখানে দক্ষ লোকবল দিতে হবে। লোকে বলে সংকট বলেই আমাদের লোড বেশি হয়, এক একটা কাজে বেশি সময় লাগে। কিন্তু মানুষ সেটা বুঝতে চায় না, আমরা বিপাকে পড়ি।
“সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের। কোনো উচ্ছেদ কিংবা অভিযান পরিচালনা করতে গেলেই জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কাছ থেকে ম্যাজিস্ট্রেট চাইতে হয়। বেশি সময় ব্যয় হয় কাজে।”

এত কম জনবল দিয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে সেবার মান কখনোই বৃদ্ধি করা সম্ভব নয় বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিক প্রতিনিধিরাও।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, “সিটি করপোরেশনে জনবল তিন ভাগের এক ভাগও নেই। এত কম জনবল দিয়ে মেয়র কিংবা প্রশাসক কীভাবে সেবা দিতে পারবেন!
“সেবার খাতগুলো আলাদা আলাদা, একজনের ভাগে যদি দশটি খাত পড়ে তাহলে তিনি কি কাজ করবেন? তিনি কি সঠিকভাবে সেবা দিতে পারবেন? এ জন্য আমাদের নাগরিক সমস্যাগুলো দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। আমরা চাই পূর্ণ জনবল সম্পন্ন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন।”
সিটি কর্পোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক মো. শাহ আলম বলেন, “জনবলের চাহিদা জানানো হয়েছে মন্ত্রণালয়। সরকার সুদৃষ্টি দিলে সংকট কাটিয়ে সেবার মান বৃদ্ধি করা সম্ভব।”