ভরা বর্ষায় পানি নেই, পাট নিয়ে বিপাকে রাজবাড়ীর চাষিরা

বৃষ্টির অভাবে কৃষকেরা পাট জাগ দিতে পারছেন না। এ কারণে সময়মতো পাট কাটতে না পারায় জমিতে ধানের চারাও রোপন করা হচ্ছে না।

শামিম রেজা, ‍রাজবাড়ী প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 July 2022, 03:04 AM
Updated : 29 July 2022, 03:04 AM

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে চলছে বর্ষাকাল, আর এমন সময়ই দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো রাজবাড়ীতেও পানির অভাবে পাট জাগ দিতে পারছেন না কৃষক। ক্ষেতেই পাট রোদে পুড়ে লালচে হয়ে যাচ্ছে।

উপায় না পেয়ে অনেকে অপরিষ্কার অল্প পানিতে জাগ দিচ্ছেন। এতে পাটের রং কালচে হয়ে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার পাঁচ উপজেলায় ৪৯ হাজার ১২২ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে; যা গতবারের থেকে প্রায় ১ হাজার ১০২ হেক্টর বেশি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সহিদ নূর আকবর বলেন, বৃষ্টির অভাবে রাজবাড়ীর কৃষকেরা পাট জাগ দিতে পারছেন না। যে কারণে কৃষকেরা ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। এদিকে সময়মত পাট কাটতে না পারায় কৃষকেরা ধানের চারাও রোপন করতে পারছেন না। এক্ষেত্রে কৃষকদের অল্প পানিতেই পাট জাগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়ন ও চন্দনী ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, জাগ দেওয়ার পানি না থাকার কারণে কৃষকেরা পাট কাটছেন না। অধিকাংশ কৃষকের পাট মাঠেই রয়েছে। সেগুলো লালচে হয়ে মরে যাচ্ছে। আবার যারা পাট কেটেছেন তারা পানির অভাবে জাগ দিতে না পারায় জমিতেই স্তূপ করে রেখেছেন।

অনেকেই আবার পুকুরে শ্যালো মেশিনের পানি দিয়ে পাট জাগ দিচ্ছেন। এতে চাষিদের অতিরিক্তি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। একই অবস্থা জেলার পাংশা, কালুখালী, বালিয়াকান্দি ও গোয়ালন্দ উপজেলায়ও।

দুই একর জমিতে পাটের আবাদ করা সদরের চন্দনী ইউনিয়নের কৃষক জালাল শেখ বলেন, “অর্ধেক জমির পাট কেটেছি। আর বাকি জমির পাট জমিতেই রয়েছে। যে পাট কেটেছি জাগ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা করতে না পেরে সেটাও জমির এক কোনে ফেলে রেখেছি।”

“গ্রামের একজনের পুকুর লিজ নেওয়ার কথা হচ্ছে। তিনি লিজ দিলে তার পুকুরে পাট জাগ দেব। তবে পুকুরের অল্প পানিতে পাটের রং কালচে হয়। সেই পাট বিক্রি করতে গেলে দাম পাওয়া যায় না।”

আরেক কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, “পাট নিয়ে খুবই দুঃশ্চিন্তায় আছি। কোথাও পানি নেই, জাগ দিতে পারছি না। একটা পুকুর ছিল; তা থেকে মাছ মেরে পাট জাগ দিব। এছাড়া তো কোনো উপায় নেই।”

আট বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করা এনায়েত হোসেন জানান, পাটের ফলন ভালো পেয়েছিলেন। কিন্তু পানি না থাকার কারণে পাট কাটতে পারছেন না। ফলে জমিতে থেকেই পাট গাছ মরে যাচ্ছে। বিকল্প হিসেবে নিজের বাড়িতে দুই বিঘা জমির উপর একটি পুকুর ছিল; সেখানে মাছ চাষ করতেন তিনি। ওই পুকুরের মাছ বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন সেখানে তিনি পাট জাগ দিবেন।

এনায়েত হোসেন বলেন, “নিজের পুকুর থাকার কারণে জাগ দিতে পারছি। কিন্তু যাদের পুকুর নেই তাদের তো ঘুম হারাম হয়ে গেছে। অনেকেই এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গিয়ে পুকুরে পাট জাগ দিচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, প্রতি বছরই এই সময়ে চারদিকে অনেক পানি থাকে। পাট জাগ দেওয়া নিয়ে কোনো চিন্তায় পড়তে হয় না। কিন্তু এবার পানি না থাকায় কৃষকেরা চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন।

খুব তাড়াতাড়িই বৃষ্টি নামার আশা প্রকাশ করে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক সহিদ নূর আকবর বলেন, “কৃষি কর্মকর্তাদের আশা এ বছর এক লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন পাট উৎপাদন হবে। বাংলাদেশের কৃষকদের প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয়। আশা করি পাটের ফলন শেষ পর্যন্ত ভালো হবে।”

রাজবাড়ীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মাহাবুর রহমান শেখ বলেন, পানি না থাকার কারণে কৃষকেরা পাট নিয়ে বিপাকে রয়েছেন। রোববার জেলার উন্নয়ন সমন্বয় সভায় জেলা প্রশাসক এ নিয়ে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন।

যেসব এলাকায় স্লুইচ গেইট রয়েছে সেখানে পানি প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন।

এছাড়াও উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তারা যেন ইউপি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কথা বলেন এবং স্ব স্ব ইউনিয়নের জলাশয়গুলোতে কৃষকদের পাট জাগের ব্যবস্থা করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সে নির্দেশনা দিয়েছেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক