‘অবৈধ স্থাপনা’: ইনানীতে চার তলা রিসোর্ট ভেঙে দিল প্রশাসন
বারবার নোটিস দেওয়ার পরও ভবনটি সরিয়ে না নেওয়ায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয় বলে ভাষ্য কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের।
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন ইনানীতে ‘প্রায় ছয় কোটি টাকা’ ব্যয়ে নির্মিত একটি চারতলা রিসোর্ট ভাঙার কাজ শুরু করেছে প্রশাসন।
অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানের প্রথম দিন সোমবার দুপুরে উখিয়ার ইনানী সৈকত এলাকায় এ অভিযান চালানোর তথ্য দিয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি।
মেরিন ড্রাইভের ইনানীর তারকা হোটেল ‘রয়েল টিউলিপ’ এবং তারকা হোটেল ‘বে ওয়াচ’ এর মাঝামাঝি এলাকায় ছিল চারতলা রিসোর্ট ভবনটি।
অভিযানে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, এসআরবি, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন।
ভবন মালিক শহিদুল হকের দাবি, ২০১৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিয়ে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন তিনি। চারটি নোটিসের জবাবও দিয়েছেন বলে দাবি তার।
তবে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, বারবার নোটিস দেওয়ার পরও ভবনটি সরিয়ে না নেওয়ায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
সম্প্রতি মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর সড়কটির দুই পাশে গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন হোটেল-রিসোর্টের নিরাপত্তা ও বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে যৌথ অভিযান শুরু করল কর্তৃপক্ষ।
ফজলে রাব্বি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কউকের অভিযান আজই শুরু হয়েছে, বিষয়টি তেমন নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।”
যেভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল ভবন
সোমবার দুপুরে ভবনের নিচতলা ও দুই পাশে থাকা ১০টির মতো দোকানঘর ভেঙে ফেলা হয়। এরপর চারতলা ভবনের কাচ ভেঙে মূল ভবনের পিলার ভাঙার কাজ শুরু হয়।
ফজলে রাব্বি বলেন, অবৈধভাবে নির্মিত ভবনটি মালিকপক্ষকে নিজ উদ্যোগে ভেঙে ফেলতে চারবার নোটিস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে ভবনটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
‘ছয় কোটি টাকা খরচ করেছি’
ভবনটির মালিক শহিদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ২০১৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমতি নিয়ে ভবনটির নির্মাণ শুরু করেন তিনি। সম্প্রতি নিচতলায় কয়েকটি দোকান, দ্বিতীয় তলায় রেস্তোরাঁ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পর্যটকদের থাকার জন্য কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যে রিসোর্টটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা ছিল তার।
শহিদুলের ভাষ্য, ভবনটি নির্মাণে তার প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। উদ্বোধনের আগেই সেটি ভেঙে ফেলা হল।
তিনি বলেন, “চারটি নোটিসেরই জবাব দিয়েছি। ভবন নির্মাণের বিপরীতে কাগজপত্রও আছে, কিন্তু কেউ তা আমলে নিচ্ছে না।”
মেরিন ড্রাইভে দুই শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে আড়াই হাজারের মতো স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে দুই শতাধিক। এসব স্থাপনার বেশির ভাগেরই বৈধ অনুমোদন নেই।
তিনি বলেন, ২০১৬ সালে কউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে কক্সবাজার পৌরসভাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় এক হাজার ৭০০টি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও সেখানে বিপুলসংখ্যক স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
জসিম উদ্দিন বলেন, “বারবার নোটিস করার পরও অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে না নেওয়ায় যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। মেরিন ড্রাইভে অবৈধ কোনো স্থাপনা রাখতে দেওয়া হবে না।”
পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে রিসোর্ট
১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সরকার। পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এই এলাকায় অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও পর্যটন অবকাঠামো সম্প্রসারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ পরিচালনার অভিযোগে সম্প্রতি ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিস দেওয়া হয়েছে।
নোটিসের জবাব না দেওয়ায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয়েছে এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা হয় বলে জানান তিনি।
১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে তিনতলা টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লেগে নিখোঁজ হন ১১ পর্যটক। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী ১০ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার হয়। ওই ঘটনার পর পর্যটনকেন্দ্রিক স্থাপনাগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা, অনুমোদন ও তদারকি নিয়ে আলোচনা জোরাল হয়।
