২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী ছেলের মৃত্যুর খবরে ঘুম ভেঙেছে বাবার

দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউনের একটি দোকানে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ গেছে ছয় বাংলাদেশির।

বিডিনিউজ২৪

সৌরভ হোসেন সিয়াম. নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Jul 2026, 08:32 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের হাতছানি ছিল তার সামনে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা তরুণ মো. ফাহিম পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা আনতে ওই বয়সেই পাড়ি জমান সূদুর দক্ষিণ আফ্রিকায়। 

১০ বছর ধরে সেখানেই ছিলেন ২৮ বছর বয়সী এ তরুণ। এ বছরই কাগজপত্র ঠিক করে বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা ছিল তার।

কিন্তু সেই ফেরা আর হল না। দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউনের একটি দোকানে (সুপারশপ) অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ গেছে ফাহিমের। এ দোকানেই ১০ বছর ধরে চাকরি করতেন তিনি। 

ফাহিমের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামে। আগুনে মারা যাওয়া ছয়জনের তিনজনই এ গ্রামের বাসিন্দা।

ক্ষতিগ্রস্ত দোকানটির মালিক রওশন আলী এ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য এবং একই গ্রামের বাসিন্দা।

বিকালে ফাহিমের বাড়িতে গিয়ে শোকের মাতম দেখা যায়। সকালে এ বাড়ির মানুষের ঘুম ভেঙেছে ফাহিমের মৃত্যুর খবরে।

ঘরের ভেতর আর্তনাদ করে কাঁদছিলেন ফাহিমের মা লুৎফুন্নেছা, ছোট দুই বোন মুনমন, মিম এবং জমজ দুই ভাই জাহিদ ও নাহিদ। শোকাহত পরিবারের সদস্যদের বুকভাঙা কান্নার মধ্যে স্বজনরা যখন সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন ফাহিমের বাবা মনির হোসেন ছিলেন পাশের ঘরে চুপচাপ বসা।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বড় সন্তানকে হারিয়ে নির্বাক মনির বলেন, “আমার কিছু বলার নাই। ঘুম ভাঙলো পোলার মৃত্যুর খবর শুইনা। আমি আর কী কমু!”

এই বলে আবারও চুপ হয়ে গেলেন এই বাবা। আশপাশের স্বজনরা তাকে কান্না করে অন্তত ‘মনটা হালকা’ করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তাতেও কোনো বিকার দেখা গেল না মনিরের।

নিহত ফাহিমের ফুফাতো ভাই মো. আল-আমিন বলেন, “সুপারশপের কর্মীদের দেখাশোনারও দায়িত্ব ছিল ফাহিমের। পুরা দায়িত্বে ছিল সে। কাগজপত্র ঠিক কইরা কয়েক মাসের মধ্যে ফেরারও কথা ছিল। পুরা সংসারটা সেই চালাইতো। এত বছর বাইরে, বাড়ি ফিরে বিয়ে করবো। কিন্তু কিছুই তো আর হইলো না।”

এদিকে, ছেলের শোকে কাঁদতে কাঁদতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন একই ঘটনায় নিহত মো. আপনের মা আঁখি বেগম। ২০ বছর বয়সী আপন চার বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান।

‘আমার পুতেরে আইন্না দেও’

আপনের মা ছেলের শোকে নিজেদের নির্মাণাধীন একতলা পাকা ভবনের মেঝেতেই শুয়ে বিলাপ করছিলেন, “আমার পুতেরে আইন্না দেও। তোমরা কেউ আমার পুতেরে আইন্না দেও।”

আগের দিনও ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল জানিয়ে আপনের বড়ভাই সৌদি প্রবাসী মো. জুয়েল বলেন, “আমার ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল বাড়িঘরটা পাকা করবো। সেই বাড়িতে বাবা-মারে নিয়া উঠবো। বাড়ি ঠিকই হইতেছে কিন্তু আমার ভাইয়ের স্বপ্ন স্বপ্নই রইয়া গেল।”

কথাগুলো বলেই ঢুকরে কেঁদে ওঠেন জুয়েল। বলেন, “যতটুকু শুনছি লাশ পুইড়া ছাই হইয়া গেছে। লাশ আনার কোনো ক্যাপাসিটি নাই। পোড়া লাশের ছাইটুকুও যদি আমাগোরে আনার ব্যবস্থা কইরা দেয়, তাইলে আমরা একটু কবর দিতাম।” 

শোকের পরিবেশ নিহত ৫৫ বছর বয়সী নূর মোহাম্মদের বাড়িতেও। তার তিন বোন রঙ মালা, আরিফা ও কনিকা খাটের উপর আহাজারি করছিলেন। আরেক ঘরে কাঁদছিলেন তার স্ত্রী কামরুন্নাহার।

তার পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০১৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যান নূর মোহাম্মদ। তার আগে সিঙ্গাপুরে বেশ কয়েক বছর চাকরি করেছেন তিনি। তার উপার্জনেই দুই কন্যা সায়মা ও সাদিয়াকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট ছেলে সিয়াম এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।

নূর মোহাম্মদের ভাগনি মোসাম্মৎ ফিমা বলেন, “মামা দেশে ফিরবেন বলে ভাবছিলেন। আগের দিনও তিনি কাগজপত্র করার জন্য গেছিলেন। জীবনের বেশি বছর বিদেশেই কাটাইছেন। আর ফেরার সময়ই তিনি ফিরতেছেন লাশ হইয়া।”

ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত অন্যরা হলেন- সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের তৈলখিরারচর গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল (২৬), পাশের বক্তাবলী ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামের প্রয়াত আক্তার হোসেনের ছেলে মো. শাহিন (২৬) এবং মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভার কালিন্দিপাড়া গ্রামের প্রয়াত সালাম বেপারীর ছেলে মো. রাজিক (৫৫)।

আরও পড়ুন:

দক্ষিণ আফ্রিকায় অগ্নিকাণ্ডে ৬ বাংলাদেশির মৃত্যু