২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

এবারও ফেনীর চামড়ার বাজারে ধস, দাম না পেয়ে মাটিচাপা

দাম কম পাওয়ায় গত বছরের মতো এবারও ফেনীর কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে।

ফেনী প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Jul 2022, 01:39 PM

Updated : 25 Oct 2022, 10:55 AM

জেলা-উপজেলায় মৌসুমী ব্যব্সায়ীর দেখা না পেয়ে অধিকাংশ কোরবানিদাতা পশুর চামড়া মাদ্রাসা ও এতিমখানায় দান করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। আর ছাগলের চামড়া কেউ নেয়নি বলে মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন।

ঈদের দিন বোববার বিকেল থেকে পরদিন সোমবার বিকেল পর্যন্ত জেলার চামড়ার আড়ত পাঁচগাছিয়া, শহরের ট্রাংক রোড ও রেলগেইট এলাকার অস্থায়ী বাজার ঘুরে ও বিভিন্ন উপজেলার চামড়া ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, মহামারীর তৃতীয় বছরেও চামড়ার বাজার মন্দা।

সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রেতারা চামড়া বিক্রি করতে পারেননি। এতে গবাদিপশু মালিক ও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা ক্ষোভের কথা জানান।

সরকারের বেঁধে দেওয়া দর অনুযায়ী, ট্যানারি ব্যবসায়ীদের এবার ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া কিনতে হচ্ছে ৪৭ থেকে ৫২ টাকায়। আর ঢাকার বাইরে এই দাম ৪০ থেকে ৪৪ টাকা। লবণযুক্ত খাসির চামড়া সারাদেশে ১৮ থেকে ২০ টাকায় কিনবে ট্যানারি। আর ছাগলের চামড়া প্রতি বর্গফুট ১২ থেকে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে ফেনীতে এ দামে কোরবানির পশুর চামড়ার কেনাবেচা নেই বলে জানান বিক্রেতারা।

শহরে ও গ্রামে এলাকাভেদে গরু ও মহিষের ছোট-বড় সব ধরনের চামড়া ১০০ থেকে ৩০০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে।

পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামান ভুট্টো বলেন, “কোরবানির জন্য আড়াই লাখ টাকা দিয়ে কেনা মহিষের চামড়া বিক্রি করেছি মাত্র ১০০ টাকায়।“

সোয়া লাখ টাকায় কেনা গরুর চামড়া ১৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে কাজিরবাগ গ্রামের আনোয়ার হোসেনকে।

আর শহরের কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা জোহরা হক বলেন, “রোববার সকালে কোরবানির পর পরিস্থিতি দেখে দুপুরের পরপরই বিকালে স্থানীয় মাদরাসাকে দান করে দিয়েছি। কারণ বিকাল হলে চামড়া থেকে গন্ধ বের হবে, তখন অল্প দামেও বিক্রি করতে পারব না।“

সোনাগাজীর বগাদানা গ্রামের সারওয়ার হোসেন জানান, কোরবানির জন্য ১৫ হাজার টাকা দিয়ে কেনা ছাগলের চামড়া ঈদের দিন বিকেল পর্যন্তও কেউ কেনেননি।

“তাই বাধ্য হয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলেছি। আমার মতো জেলায় অনেকে ছাগলের চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন বা কোরবানির বর্জ্যর সঙ্গে ফেলে দিয়েছেন”, যোগ করেন সারওয়ার হোসেন।

ফেনী শহরের ট্রাংক রোডে রোববার রাত ১০টার দিকে বিক্রির জন্য পাঁচটি গরুর চামড়া নিয়ে বসে থাকা মৌসুমি ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, “শহরের দাউদপুর ও রামপুর এলাকা থেকে চামড়াগুলো গড়ে ৩০০ টাকা করে কিনেছি। চামড়া ব্যাপারীরা ১৫০ টাকা বলে চলে গেছেন।“

রাত ১১টার দিকে কোনো ক্রেতা না পেয়ে ওই ব্যবসায়ীকে চামড়া রাস্তায় ফেলে দিয়ে চলে যেতে দেখা যায়।

দাগনভূঞার সিলোনীয়া বাজারের ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম জানান, তার এলাকার মো. রানা নামে একজন মৌসুমি ব্যবসায়ী গ্রামে হেঁটে গড়ে ২০০ টাকা করে ২২টি চামড়া কিনে কয়েকশ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে বাজারে নিয়ে ৩০০ টাকা করে বিক্রি করেছেন।

শহরের শান্তি কোম্পানি রোডের ইসলামিয়া এতিমখানার সভাপতি কে বি এম জাহাঙ্গীর আলম জানান, তাদের এতিমখানায় পাওয়া ২৬৭টি ছোট-বড় চামড়া গড়ে ৩৭০ টাকা বিক্রি করেছেন। তারা কোনো ছাগলের চামড়া সংগ্রহ করেননি।

শহরের একটি মাদ্রাসার তত্ত্বাবধায়ক নাম প্রকাশ না করে জানান, স্থানীয় গরু ও মহিষের ৩৭০টি চামড়া সংগ্রহ করে পাঁচগাছিয়া আড়তে নিয়ে গিয়ে গড়ে ৩৩০ টাকা করে দাম পেয়েছেন।

ফেনীর পাঁচগাছিয়া বাজারের সবচেয়ে বড় চামড়া ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দিন বলেন, এ বছর গড়ে ৩৫০-৪৫০ টাকায় ১০ হাজার গরু-মহিষের চামড়া কেনা হয়েছে।“

আরেক আড়তদার মো. নুর নবী জানান, এবার ঢাকা থেকে তারা চামড়ার কোনো নির্দিষ্ট দর পাননি। এ ছাড়া ঢাকায় ট্যানারিতে বা বড় আড়তে চামড়া বিক্রি করে বকেয়া পড়ে থাকা প্রায় কোটি টাকা গত পাঁচ বছরেও আদায় করতে পারেননি।

ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মাহবুবল হক জানান, একসময় জেলায় একমাত্র তার ইউনিয়নের পাঁচগাছিয়া বাজারে চামড়ার ছোট-বড় ৫৫ থেকে ৬০ জন আড়তদার ছিলেন। বছরের পর বছর লোকসানের কারণে তাদের অনেকেই ব্যবসায় গুটিয়ে নিয়েছেন।

বর্তমানে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ও ধারদেনা করে ১৪ থেকে ১৫ জন আড়তদার ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন বলেও জানান এই ইউপি চেয়ারম্যান।