১৮টি এলএইচবি কোচের প্রথম ট্রায়াল রান, সৈয়দপুর থেকে পৌঁছাল পঞ্চগড়ে
১৭ অক্টোবর ভারত থেকে প্রথম চালানে আসা ১৮টি রেলকোচ সৈয়দপুর পৌঁছায়।
নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কমিশনিং শেষে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু করেছে ভারত থেকে আমদানি করা আধুনিক ১৮টি এলএইচবি ব্রডগেজ রেলকোচ।
রোববার বেলা ১১টার দিকে কারখানা থেকে পঞ্চগড়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে কোচগুলোর বহর। বিকাল সাড়ে ৪টায় সেটি পঞ্চগড় রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছায়। সেখানে অবস্থান নেওয়ার পর কোচগুলো আবার সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় ফিরিয়ে আনা হবে।
১৯ নভেম্বর পাবনা-ঢাকা রুটে ‘পাবনা প্রভাতী’ ও ‘পাবনা গোধূলী’ নামে দুটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন উদ্বোধনের জন্য এসব কোচ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
১৭ অক্টোবর ভোর ৪টার দিকে ভারত থেকে প্রথম চালানে আসা ১৮টি এলএইচবি (লিংকে-হফম্যান-বুশ) রেলকোচ সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় পৌঁছায়। এরপর কারখানায় কোচগুলোর বিশেষ ডিপ্রিজারভেশন, যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এসব কাজে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ভারতের বিশেষজ্ঞরাও অংশ নেন।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ বলেন, কারখানায় আনা কোচগুলো বিভিন্নভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। এ কাজে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ভারতের বিশেষজ্ঞরা ২০ সদস্যের একটি টিমও কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, কোনো ধরনের ত্রুটি ছাড়াই ট্রায়াল রান সফলভাবে সম্পূর্ণ হয়েছে। ১৮টি কোচের মধ্য থেকে ১২টি কোচ নিয়ে একটি রেক প্রস্তুত করা হবে ১৯ নভেম্বর পাবনা-ঢাকা রুটের নতুন ট্রেনের জন্য।
রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ১৯ নভেম্বর পাবনা রেলওয়ে স্টেশনে সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পাবনা প্রভাতী’ ও ‘পাবনা গোধূলী’ নামে দুটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন উদ্বোধন করবেন বলে পরিকল্পনা রয়েছে।
সকালে পাবনা থেকে ৮০৮ নম্বর ‘পাবনা প্রভাতী এক্সপ্রেস’ ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিবে। এরপর বিকাল ৩টা ২৫ মিনিটে সেই ট্রেনটি ৮০৭ নম্বর ‘পাবনা গোধূলি এক্সপ্রেস’ ঢাকা থেকে পাবনার উদ্দেশে রওনা দিবে।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, ভারত থেকে আমদানি করা এসব কোচ আধুনিক এলএইচবি প্রযুক্তির ব্রডগেজ কোচ। ইউরোপীয় মানদণ্ড অনুসারে তৈরি কোচগুলোতে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও আরামদায়ক ভ্রমণের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় একটি কোচের ওপর অন্য কোচ উঠে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে এতে অ্যান্টি-টেলিস্কোপিক ও অ্যান্টি-ক্লাইম্বিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
পুরনো স্ক্রু কাপলিং ব্যবস্থার পরিবর্তে কোচগুলোতে রয়েছে আধুনিক সেন্টার বাফার কাপলিং (সিবিসি) ব্যবস্থা। এতে কোচগুলোর সংযোগ আরও মজবুত হবে এবং চলাচলের সময় ঝাঁকুনি কমবে। এ ছাড়া রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা, প্যাসেঞ্জার অ্যালার্ম সিস্টেম, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম ও জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা।
যাত্রীদের সুবিধার জন্য কোচগুলোতে রয়েছে শিশু পরিচর্যার আলাদা বেবি কেয়ার রুম ও নামাজ আদায়ের স্থান। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বায়ো-টয়লেট, ইলেকট্রো-নিউম্যাটিক চাপযুক্ত ফ্লাশিং ব্যবস্থা, একাধিক অবস্থানে হেলানো যায় এমন বিশেষ আসন, স্টেইনলেস স্টিলের হাতল ও পায়ের বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আধুনিক অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও ফোল্ডিং সুবিধাযুক্ত আসনও রয়েছে। বাংলাদেশের রেলওয়ের পরিচালনব্যবস্থা বিবেচনায় কোচগুলোর ছাদ কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে। এগুলো ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬০ কিলোমিটার গতিতে চলার উপযোগী করে তৈরি।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহের চুক্তির আওতায় ভারত থেকে প্রথম চালানে ১৮টি কোচ পাঠানো হয়েছে। ১২ অক্টোবর ভারতের পাঞ্জাবের কাপুরথালায় অবস্থিত রেল কোচ ফ্যাক্টরি থেকে কোচগুলো বাংলাদেশের উদ্দেশে পাঠানো হয়। পরে গেদে-দর্শনা আন্তদেশীয় রেল সংযোগ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সেগুলো সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় আনা হয়।
ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রেল ইন্ডিয়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক সার্ভিসেস লিমিটেডের (রাইটস) সঙ্গে ২০২৪ সালের ২০ মে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২০০টি এলএইচবি ব্রডগেজ কোচ সরবরাহের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ৯ অক্টোবরের মধ্যে এসব কোচ সরবরাহ, পরীক্ষণ ও চালুর কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রথম চালানের ১৮টি কোচের মধ্যে রয়েছে ১১টি নন-এসি শোভন চেয়ার কার, তিনটি এসি চেয়ার কার, দুটি এসি স্লিপার কার এবং দুটি এসি পাওয়ার কার। পাওয়ার কার দুটিতে গার্ডের কক্ষ ও মালপত্র রাখার জায়গা রয়েছে। কোচগুলোর কাঠামোতে স্টেইনলেস স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে।
এর আগে ভারত ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে ৩০টি এবং ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর আরও ১০টি ব্রডগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সরবরাহ করে। পরে ২০১৮ সালের ১ জুন সরবরাহ করা হয় ১২০টি এলএইচবি ব্রডগেজ কোচ। এসব লোকোমোটিভ ও কোচ ভারত সরকারের ঋণসহায়তার আওতায় বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছিল।
