১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

স্বেচ্ছাশ্রমের ভাসমান সেতুতে বদলে গেছে ৩ গ্রামের জীবনযাত্রা

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার সানিয়াজান নদীতে সেতুটি নির্মাণে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা বাঁশ বিক্রি করেই কেনা হয় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

লালমনিরহাট প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Apr 2025, 05:24 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:37 PM

সানিয়াজান নদীর এপার থেকে ওপারে ভাসছে প্লাস্টিকের ড্রামের সারি। তার ওপর বিছানো বাঁশের চাটাই ধরে হাসিমুখে হাঁটছে শিক্ষার্থীরা, গবাদি পশু নিয়ে যাচ্ছেন কৃষক, শিশু কোলে নদী পার হচ্ছেন মা। 

কিন্তু কিছু দিন আগেও লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার এ নদীতে এমন চিত্র ভাবতে পারেনি বাউরা ইউনিয়নের তিন গ্রামের মানুষ। কারণ স্থায়ী সেতুর অভাবে এতোদিন এ নদী পারাপার তাদের জন্য ছিল চরম ভোগান্তির। 

গ্রামের বাসিন্দারা বাঁশের সাঁকো তৈরি করলেও প্রতিবছরের বন্যায় তা ভেসে যেত। ফলে এবার তারা স্বেচ্ছাশ্রমে তৈরি করলেন ২০০ ফুট দীর্ঘ ভাসমান সেতু। এতে বদলে গেছে জমগ্রাম, ছিট জমগ্রাম ও খালপাড়া গ্রামের ১২ থেকে ১৪ হাজার মানুষের জীবনযাত্রা।

বাউরা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম বলেন, “আগে কোমর পানি পেরিয়ে চলাচল করতে হত। মালামাল নিয়ে নদী পার করা যেত না। আবার কেউ অসুস্থ হলেও খুব বিপদে পড়তে হত। 

“বর্ষাকালে বা বন্যার সময় তো কষ্টের শেষ ছিল না। এখন বর্ষায় বা বন্যার সময় নদীর পানি যতই বাড়বে ড্রামগুলো ততই ভেসে উঠবে। এতে চলাচলের কোনো সমস্যা হবে না।” 

বাউরা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমিনুর ইসলাম বলেন, “আগে নদী পার হতে কষ্ট হতো, বই-খাতা ভিজে যেত। এখন সহজেই স্কুলে যেতে পারছি।”

মহিউদ্দিন নামের আরেক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, “এ উদ্যোগ শুধু চলাচলের সমস্যা সমাধান করেনি, এটি দেখিয়েছে কিভাবে একতা ও স্বেচ্ছাশ্রম বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন। এই ভাসমান সেতু শুধু একটুকরো কাঠামো নয়, এটি মানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতিচিত্র।”

তিন লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটিতে ব্যবহার করা হয়েছে ১০০টি প্লাস্টিকের ড্রাম, বাঁশ, লোহার অ্যাঙ্গেল ও প্লাস্টিকের দড়ি। প্রাথমিকভাবে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা বাঁশ বিক্রি করেই কেনা হয় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। 

এই সেতু নির্মাণের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন বাউরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ডাক্তার শামসুল আলম। তার নেতৃত্বে ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবক একত্রিত হয়ে এ টেকসই ভাসমান সেতু তৈরির পরিকল্পনা ও নির্মাণ করেন। 

শামছুল আলম বলেন, “এখানে ব্রিজ না থাকায় কয়েক হাজার মানুষের বিড়ম্বনার অন্ত ছিল না। বর্ষাকালে আরও এই বিড়ম্বনা বেড়ে যেত। সে কারণে স্থানীয়রা মিলে এই ভাসমান সেতুটি তৈরি করা হয়েছে।” 

বাউরা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মামুন হোসেন সরকার বলেন, “স্থানীয়দের এমন মহতি উদ্যোগকে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে স্বাগত জানাই। সবাই মিলে যে অসাধ্য সাধন করা যায় তারই জ্বলন্ত উদাহরণ এই ড্রাম সেতুটি।”

তবে সাময়িকভাবে দুঃখ ঘুচলেও স্থানীয়দের দাবি সরকারিভাবে এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হোক।

এ বিষয়ে পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

একইসঙ্গে স্থানীয়দের ভাসমান সেতু নির্মাণের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি।