০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

কালীগঙ্গায় নৌকা বাইচ: বৈঠার ছন্দে উত্তাল দুই তীর

প্রতিযোগিতায় চার ক্যাটাগরির মোট ২২টি নৌকা অংশ নেয়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Oct 2026, 12:11 AM

Updated : 04 Oct 2026, 12:11 AM

মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীর বেউথা ঘাটের শত বর্ষের ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ দেখতে মানুষের ঢল নেমেছিল।

শনিবার সকাল থেকেই জেলার সাতটি উপজেলার পাশাপাশি ঢাকা, সাভার, ধামরাই, নবাবগঞ্জ, দোহার, টাংগাইলের নাগরপুরসহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা জড়ো হতে থাকেন। দুপুরের পর নদীর দুই পাড় রূপ নেয় জনসমুদ্রে।

জেলা বিএনপির আয়োজনে নৌকা বাইচের উদ্বোধন করেন খাদ্যমন্ত্রী ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আফরোজা খানম রিতা।

প্রতিযোগিতায় মানিকগঞ্জসহ কুড়িগ্রামের রৌমারী, টাঙ্গাইলের নাগরপুর, পাবনার সাঁথিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে চার ক্যাটাগরির মোট ২২টি নৌকা অংশ নেয়।

এর মধ্যে খেল্লা-গয়ইটা ১০টি, ঘাসি-ছিপা পাঁচটি, ছান্দি চারটি এবং তিনটি পানসি নৌকা ছিল। পাশাপাশি ৭০ ও ৮০ হাত দীর্ঘ দুটি কলাগাছের ভেলাও অংশ নেয় আয়োজনে।

বাইচে অংশ নেওয়া নৌকাগুলোর মধ্যে বিশেষ আকর্ষণ ছিল কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে আসা খেল্লা নৌকা ‘মায়ের দোয়া’। নৌকাটি ৩০ সেপ্টেম্বর রৌমারীর বন্দবেড় ইউনিয়নের বাগুয়ারচর গ্রাম থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে মানিকগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেয়। বিভিন্ন নদীপথ পাড়ি দিয়ে তিন দিনে কালীগঙ্গার বেউথা ঘাটে পৌঁছায় নৌকাটি।

নৌকাটির পরিচালক মজিবুর রহমান বলেন, ভারতের শাল কাঠ দিয়ে তৈরি ‘মায়ের দোয়া’ নৌকাটি বানাতে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। নৌকাটি তৈরির পর এই প্রথম কোনো নৌকা বাইচে অংশ নেয় তারা।

নির্ধারিত দূরত্বে নৌকাগুলো ছুটে চলার সময় বৈঠার ছন্দ আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে কালীগঙ্গার দুই পাড়। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে উপভোগ করেন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন।

আয়োজকরা বলেন, বাইচে অংশ নেওয়া প্রতিটি নৌকার জন্য ছিল বিশেষ পুরস্কার। চারটি ক্যাটাগরিতে বিজয়ীদের জন্য মোটরসাইকেল, ইলেকট্রিক বাইক ও বিভিন্ন আকারের ফ্রিজসহ আকর্ষণীয় পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি নৌকার জন্য ছিল পিতলের কাপও।

এ ছাড়া ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকা ও ব্যক্তিদের জন্যও ছিল টেলিভিশন, প্রেসার কুকার ও রাইস কুকারসহ বিভিন্ন পুরস্কার।

নৌকাবাইচ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আ তা ম জহীর আলম খান লোদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নৌকাবাইচ কমিটির সদস্যসচিব মাসুদ পারভেজ, মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর, জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম, জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খান।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে নৌকা বাইচের সংস্কৃতি তুলে ধরতেই এ আয়োজন করা হয়েছে।

প্রতিযোগিতায় ছান্দি নৌকা ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয় হরিরামপুর উপজেলার কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের কুশিয়ারচর এলাকার ‘গায়ান বাড়ি’। বিজয়ী দল পুরস্কার হিসেবে পেয়েছে একটি ইলেকট্রিক মোটরবাইক।

এ বিভাগে দ্বিতীয় হয়েছে ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’, তৃতীয় হয়েছে কাঞ্চনপুরের ‘গায়ান তরী’ এবং চতুর্থ ‘সোনার চান’।

দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ স্থান অর্জনকারী প্রতিটি বাইচের নৌকা একটি করে ফ্রিজ পেয়েছে।

ঘাসি নৌকার ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সিংগাইর উপজেলার ‘বাইমাইল এক্সপ্রেস’। পুরস্কার হিসেবে দলটি পেয়েছে একটি মোটরসাইকেল। দ্বিতীয় হওয়া ‘কালাম শিকদার এক্সপ্রেস’কে দেওয়া হয় একটি ফ্রিজ।

খেল্লা ক্যাটাগরিতে দর্শকদের নজর কেড়ে কুড়িগ্রামের রৌমারি থেকে আসা ‘মায়ের দোয়া’ নৌকা চ্যাম্পিয়ন হয়ে একটি মোটরসাইকেল পেয়েছে ।

দ্বিতীয় হয় ‘মা-বাবার দোয়া’; তাদের দেওয়া হয় একটি ফ্রিজ।

পানসি নৌকা ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ‘জনতা এক্সপ্রেস’ একটি মোটরসাইকেল পেয়েছে ।

এ বিভাগে দ্বিতীয় হয় ‘আজম ব্রাদার্স’, তৃতীয় ‘বাগচী চ্যালেঞ্জার’ এবং চতুর্থ ‘নকিব বাড়ি একতা এক্সপ্রেস’। তিনটি নৌকাকেই একটি করে ফ্রিজ দেওয়া হয়।

নৌকা বাইচ দেখতে ঢাকা থেকে এসেছেন গোপালগঞ্জের শুভ। তিনি বলেন, জীবনে প্রথমবার নৌকা বাইচ দেখতে কালিগঙ্গা নদীর বেউথায় এসেছেন। অনেক নৌকা আর লাখো মানুষ দেখে অভিভূত তিনি।

সাভার থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আশিক তার বাবার সঙ্গে এসেছেন। আশিক জানায়, জীবনে প্রথম নৌকা বাইচ দেখলো সে। সে খুবই আনন্দিত।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া হরিরামপুরের বকচর এলাকার মুন্না ঢাকা থেকে বাইচ দেখতে এসেছেন। তিনি বলেন, তার বাবাসহ আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে বাইচ দেখে তিনি অভিভূত।