১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

পদ্মায় তিন দিনব্যাপী নৌকা বাইচে মানুষের ঢল

হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার সংস্কৃতি যেন আবার প্রাণ ফিরে পেল রাজবাড়ীর নৌকা বাইচে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 15 Sep 2026, 12:02 AM

Updated : 17 Sep 2026, 03:00 AM

পদ্মার বুকে কাসার ঘণ্টা আর কাঁসার থালার গমগমে শব্দ। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে একঝাঁক মাঝির সুঠাম বাহুর ছন্দে আছড়ে পড়ছে দাঁড়। পদ্মার শান্ত জল মুহূর্তে উত্তাল হয়ে উঠছে বৈঠার সশব্দ আঘাতে। 

আর নদীর দুই পাড়ে সমবেত হাজার হাজার মানুষের গগনবিদারি করতালি আর চিৎকার- এমন এক আবহ সৃষ্টি করেছে; যা বহু বছর ধরে গ্রামীণ জীবন থেকে যেন হারিয়েই গিয়েছিল।

রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মহেন্দ্রপুর খেয়াঘাট এলাকায় সোমবার থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। একে কেন্দ্র করে পদ্মার পাড়ে যেন বসেছে গ্রামবাংলার রূপময় এক প্রাণের উৎসব। 

পাবনা থেকে আসা বয়োজ্যেষ্ঠ সোলেমান বিশ্বাস ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে তাকিয়ে ছিলেন নদীর বুকে। তিনি বলছিলেন, “এখন আর আগের মতো নৌকা বাইচ চোখে পড়ে না। শেষবার দেখেছিলাম প্রায় ১০ বছর আগে। রোববার রাতে খবর পেলাম কালুখালীতে নদীজুড়ে বাইচ হবে; শুনে আর ঘরে মন টিকল না। সকালেই রওনা দিয়ে চলে এসেছি। এ যেন শৈশবে ফিরে যাওয়া।”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাংশা উপজেলার কসবামাঝাইল গ্রামের বাসিন্দা হামিদ মোল্লা আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, “প্রায় ২০ বছর পর চোখের সামনে এমন নৌকা বাইচ দেখছি। ছোটবেলায় বর্ষা এলেই বিলে-নদীতে এ খেলা দেখতে যেতাম। এখন তো সব হারিয়ে গেছে। এ আয়োজনে এসে কত পুরোনো স্মৃতির পাতা খুলে গেল!”

হযরত আলী নামে এক দর্শনার্থী বলেন, “আমার বাড়ি এখান থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে। বাইচের খবর শুনে ছুটে এসেছি। আজ খুব মনে পড়ছে বাবার কথা। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে বাইচ দেখতে যেতাম, খেলা শেষে বাবা মিষ্টি আর খাজা কিনে দিতেন। বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাকেও সঙ্গে করে নিয়ে আসতাম।”

প্রথমবারের মতো সরাসরি নৌকা বাইচ দেখার আনন্দ প্রকাশ করেন নতুন প্রজন্মের অনেকে। 

গৃহবধূ পাপিয়া আক্তার বলেন, “নৌকা বাইচ আগে শুধু ফেইসবুকে, টিভিতে দেখেছি। সামনাসামনি দেখার সুযোগ হয়নি কখনও। মহেন্দ্রপুরে খেলা হবে শুনে স্বামীকে বলে চলে এসেছি। এত মানুষ আর এত আনন্দ- আজ নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না।”

আরেক দর্শনার্থী রোকসানা খাতুন বলেন, “ছোট থাকতে একবার ভেলা বাইচ দেখেছিলাম। কিন্তু বিশাল পদ্মায় নৌকা বাইচ দেখার অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। নতুন প্রজন্ম যাতে আমাদের এসব নিজস্ব সংস্কৃতির কথা ভুলে না যায়, সেজন্য প্রতি বছরই এমন আয়োজন হওয়া দরকার।”

আয়োজক কালুখালী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান তোতা বলেন, হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে মানুষের মাঝে ফিরিয়ে আনতেই তাদের এই উদ্যোগ।

তিনি বলেন, তিন দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১০টি শক্তিশালী দল অংশ নিয়েছে। নদীর তীরের হাজারো মানুষের উল্লাস আর মাঝিদের প্রাণপণ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বুধবার চূড়ান্ত খেলার পর শেষ হবে ঐতিহ্যবাহী এই নৌকা বাইচ।