Published : 09 Feb 2025, 09:30 PM
ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে হামলা-সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
রোববার দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ রোডে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন দাগনভূঞা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আলী।
আহতদের মধ্যে আছেন উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আশ্রাফুল ইসলাম জাবেদ, সদস্যসচিব তৌহিদুল ইসলাম মানিক, ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম।
এ ছাড়া আহতদের মধ্যে সারওয়ার পারভেজ, মিরাজ, সোহেল, রাজিব, হৃদয়, সাদ্দাম, মামুন, জিতু, জনির নাম জানা গেছে। তারা সবাই স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
দলীয় সূত্র জানায়, দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দেড় মাস ধরে স্থানীয় বিএনপি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
একটি পক্ষে আছেন দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেন ও তার অনুসারীরা। আকবর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ভাই। অপর পক্ষের অনুসারী জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি কাজী জামশেদুর রহমান ফটিক।
এর জেরে তারা পৃথক কর্মসূচিও পালন করছেন।
এরই জেরে রোববার দুপুরে আকবর হোসেনের অনুসারী আশ্রাফুল ইসলাম জাবেদ ও মাসুমের নেতৃত্বে একটি মিছিল উপজেলার গজারিয়া রোডের দিকে আসার পথে প্রতিপক্ষ ফটিকের অনুসারী লোকজন ওই মিছিলে বাধা দেয়।
এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। স্থানীয় পাকিস্তান বাজার থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ দাগনভূঞা বাজার ও ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ রোডে ছড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে কাজী জামশেদুর রহমান ফটিক ঘটনাস্থলে এলে দুই পক্ষ ফের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে সংঘর্ষ।
দাগনভূঞা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আলী বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এ এস এম সোহরাব আল সোহাইন তানভীর বলেন, দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত হাসপাতালে নয়জন চিকিৎসা সেবা নিয়েছে। এদের মধ্যে একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফেনী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রাজিব হক বলেন, “আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে উপজেলা ছাত্রদলের আয়োজনে বিক্ষোভ মিছিলটি গজারিয়া রোড থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল।
“বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে নেতাকর্মীরা সেখানে এসে জড়ো হচ্ছিল, ঠিক ওই মুহূর্তে ফটিকের নির্দেশনায় কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ফেনী জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি কাজী জামশেদুর রহমান ফটিক জানান, ফেনী জেলা থেকে দাগনভূঞায় কোনো সভা, সমাবেশ বা মিছিল না করার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপরও বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য ওই পক্ষ বারবার মিছিলের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করছে।
“আর আজকে যে ঘটনা ঘটেছে তার শুরু থেকে আমি ছিলাম না, আমাদের নেতাকর্মীদের উপর হামলার খবর পেয়ে আমি ছুটে আসি। তারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের উপর হামলা করেছে।”
তিনি বলেন, “তাদের হামলায় আমাদের মিরাজ, সোহেল, সাদ্দাম, চৌধুরি হৃদয় ও জিতুসহ অনেক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।”
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেন বলেন, “আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও গাজীপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা একটি মিছিল বের করেছিলেন। এতে কাজী জামশেদুর রহমান ফটিকের নেতৃত্বে তার লোকজন অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। পরে তারা জাবেদের বাড়িতে হামলা করেছে। হামলায় ছাত্রদল নেতা রাজিব, মানিক, জাবেদসহ অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।”
ফেনী জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদ আলম বলেন, “দাগনভূঞাতে ছাত্রদল মিছিলের বিষয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই। বিএনপির কমিটি সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে তাই বিএনপির একটি সমাবেশ বন্ধ করেছে জেলা বিএনপি। তবে ছাত্রদলের মিছিল, সভা-সমাবেশ করতে পারবে না এমন কোনো নির্দেশনা আমরা জেলা ছাত্রদল দেইনি।”
তিনি বলেন, “আজকে ছাত্রদলের মিছিলে বাধার ঘটনায় যারা সম্পৃক্ত রয়েছে তাদের বিষয়ে তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দাগনভূঞা-সোনাগাজী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার তসলিম হোসাইন বলেন, “আমরা মনে করি, রাজনৈতিক দলগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে এবং জনগণের ভোগান্তি না করে শান্তিপূর্ণভাবে দলীয় কর্মসূচি করবে। তাদের দলীয় কোনো কোন্দল থাকলে তা দলের জেলা বা কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে সমাধান করবেন।
“কিন্তু তা না করে তারা বাজারে বা যে কোনো স্থানে একপক্ষের মিছিলে অন্যপক্ষ হামলা করে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটালে এবং জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি করলে আগামীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা কঠোরভাবে দমন করবে।”
গত বছরের ২২ ডিসেম্বর ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলালের একক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে সোনাগাজী এবং দাগনভূঞা উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
তারপর থেকেই এ কমিটি বাতিলের দাবিতে দুই উপজেলায় দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একাংশের নেতাকর্মীরা।
এর মধ্যে গত শুক্রবার জেলা যুবদলের নতুন আহ্বায়ক কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে দাগনভূঞায় একটি পক্ষ মিছিল করতে চেষ্টা করলে অপর পক্ষ মিছিলে বাধা দেয়। এতে কয়েকজন আহত হয়।
এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি দাগনভূঞা উপজেলার সদর ইউনিয়নের করিমপুর এলাকায় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
তারও আগে ১৮ জানুয়ারি ফেনী প্রেস ক্লাবের সামনের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন দাগনভূঞা সোনাগাজী উপজেলা থেকে আসা নেতা-কর্মীরা।