১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কপোতাক্ষ-ইছামতি ও বেতনা নদী দখলে ৩০২ জন, উচ্ছেদে যে চ্যালেঞ্জ

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল ইসলাম মইন বলেন, “আজ থেকেই আমরা নেটপাটার বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযান শুরু করছি।”

কপোতাক্ষ-ইছামতি ও বেতনা নদী দখলে ৩০২ জন, উচ্ছেদে যে চ্যালেঞ্জ
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিনেরপোতা এলাকায় বেতনা নদী দখল করে গড়ে উঠা বাণিজ্যিক স্থাপনা।

বিডিনিউজ২৪

শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 20 Jul 2026, 03:52 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:42 PM

সাতক্ষীরার নদ-নদীগুলোর মধ্যে কপোতাক্ষ, ইছামতি ও বেতনা নদীর ৩০২ দখলদারের নাম প্রকাশ করেছে জেলা প্রশাসন। 

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরজমিন তদন্ত করে এই দখলদারদের চিহ্নিত করেছেন। এবং এসব নদী কীভাবে দখলমুক্ত করা যায় তার পরিকল্পনাও প্রতিবেদন আকারে জমা দেওয়া হয়েছে। 

তবে প্রতিবেদনে নদী দখলদারদের উচ্ছেদে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েব পোর্টালে সেই প্রতিবেদন ও দখলদারদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কপোতাক্ষ, ইছামতি, বেতনা এবং বিভিন্ন সংযোগ খাল দীর্ঘকাল ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভূমিখেকোদের অবৈধ দখলে রয়েছে। নদী অববাহিকার সরকারি জমি গ্রাস করে দখলদাররা গড়ে তুলেছেন স্থায়ী ও অস্থায়ী টিনের ঘর, বিশাল সীমানা প্রাচীর, মাছের ঘের, পুকুর, আমবাগান ও ফসলি জমি। 

এমনকি কিছু কিছু মৌজায় নদীর বুক চিরে গড়ে তোলা হয়েছে পরিবেশ বিধ্বংসী ইটভাটা এবং বিভিন্ন শিল্প-কারখানার শেড বা ছাউনি। 

প্রতিবেদনে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রাধানগর মৌজায় ইছামতি নদীর তীরবর্তী প্রায় ১০ বড় দখলদারকে চিহ্নিত করা হয়েছে; যারা নদীর বিপুল জায়গা দখল করে স্থাপনা তৈরি করেছেন। 

এ বিষয়ে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল ইসলাম মইন বলেন, “উচ্ছেদ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমরা এরই মধ্যে পুরোদমে কাজ শুরু করেছি। প্রথমত, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় বাজেট বা বরাদ্দ চাওয়া হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলেই ক্রমান্বয়ে সব দখলদারদের উচ্ছেদে মূল অভিযান শুরু হবে।”

কোথায় কতটুকু দখল

সরকারি এই প্রতিবেদনে সবচেয়ে ভয়াবহ দখলদারিত্বের চিত্র উঠে এসেছে কপোতাক্ষ নদ ঘিরে। তালা উপজেলার মাগুরা, জগদানন্দকাটি, পুটিয়াখালী, রাজেন্দ্রপুর ও জালালপুর মৌজায় শতাধিক ব্যক্তি কপোতাক্ষ নদের জায়গা দখল করে স্থায়ী ও অস্থায়ী টিনের ঘর তুলে বসবাস করছেন। 

অন্যদিকে, বিনেরপোতা মৌজায় বেতনা নদী দখল করে অবৈধ সীমানা প্রাচীর এবং ফ্যাক্টরির বিশাল ছাউনি নির্মাণের তথ্য মিলেছে। 

বিশেষ করে বাবুলিয়া মৌজায় ‘কামরুল এসবিবি’ ও ‘মনির এসবিএল’ নামের দুটি বাণিজ্যিক ইটভাটা নদীর সীমানার ভেতরে গড়ে তোলার প্রমাণ মিলেছে। 

এ ছাড়া সদর উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় খাল দখল করে অবাধে ধান ও মাছ চাষ করার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। 

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বেতনা নদীর এই দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য এরই মধ্যে সর্বশেষ নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিনেরপোতা এলাকায় বেতনা নদী দখল করে গড়ে উঠা বাড়িঘর।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিনেরপোতা এলাকায় বেতনা নদী দখল করে গড়ে উঠা বাড়িঘর।

উচ্ছেদ অভিযানের চ্যালেঞ্জ 

কপোতাক্ষ নদের দখলদারদের সরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। 

এক্ষেত্রে বড় দুটি অন্তরায় বা চ্যালেঞ্জ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। 

প্রথমত. মাঠ পর্যায়ে উচ্ছেদ অভিযান জোরালো ও একযোগে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে তীব্র ‘জনবলের অভাব’ ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সংকট রয়েছে। 

দ্বিতীয়ত. এই নদী অববাহিকা দখল করে যারা বসবাস করছেন, তাদের একটি বড় অংশই প্রকৃত ‘ভূমিহীন পরিবার’। ফলে মানবিক দিক বিবেচনা এবং তাদের পুনর্বাসনের জটিল বিষয়টি উচ্ছেদ অভিযানের অন্যতম মূল সামাজিক বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে। 

‘উচ্ছেদে বাধা এলে কঠোর হতে হবে’

উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় বাধা এলে সেটি কঠোরভাবে মোকাবিলা করা উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার জেলা সম্পাদক এবং নদী সুরক্ষা বিষয়ক জাতীয় কমিটির সদস্য মাধব চন্দ্র দত্ত।

তিনি বলেন, “নদী জীবন্ত সত্তা; নদী না বাঁচলে সাতক্ষীরা বাঁচবে না, নদী না বাঁচলে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচবে না। ফলে নদীকে কখনো ব্যক্তিগত সম্পদ বা সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করলে হবে না; এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা বিধিবদ্ধ। যারা দখল ও দূষণ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ করলেই নদী সুরক্ষিত হবে।

“আমি মনে করি, যেহেতু দখলদাররা চিহ্নিত, তাই প্রশাসনকে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় আইনের প্রয়োগ করে তাদের দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে। আর এই রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে যদি কোনো বাধা-বিঘ্ন আসে, তবে প্রশাসনকে অত্যন্ত কঠোর হাতে সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে আমরা প্রশাসনের কাছে এটাই জোর দাবি জানাচ্ছি।”

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল ইসলাম মইন বলেন, “আজ থেকেই আমরা নেটপাটার বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযান শুরু করছি। এর পরই বড় দখলদারদের হাত থেকে নদীর জায়গা উদ্ধার করা হবে। 

“পুরো প্রক্রিয়াটি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন থেকে সরাসরি তদারকি করা হচ্ছে, তাই উচ্ছেদের ক্ষেত্রে ছোট-বড় বা প্রভাবশালী কেউ কোনো ছাড় পাবেন না। এ ছাড়া নদী রক্ষা ও পুনঃদখল ঠেকাতে উদ্ধারকৃত জায়গাগুলোতে বনায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।”