Published : 18 Sep 2025, 05:22 PM
নিয়ম না মেনে পদোন্নতি পাওয়া ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ৩৩ কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে তাদেরকে আগের দায়িত্বে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার এক মাসেরও বেশি সময় পর সম্প্রতি বিষয়টি সামনে আসলে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। তবে এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
এর আগে ১১ অগাস্ট এক প্রজ্ঞাপনে ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলতি দায়িত্ব পাওয়া ৩৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আগের পদে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোখতার আহমেদ।
তবে পদ ফিরে পেতে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার কথা বলেছেন নির্বাহী প্রকৌশলীর (যান্ত্রিক) দায়িত্ব পালন করা মো. শাফি কামাল।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে ময়মনসিংহ পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। এরপর কার্যক্রম চালাতে নিয়ম ভেঙে কর্মকর্তাদের দেওয়া হয় পদোন্নতি। সেই সময় বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক প্রভাবে চলতি পদে বহাল থাকেন কর্মকর্তারা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, কোনও কর্মকর্তাকে দুই মাসের বেশি চলতি দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। বিশেষ প্রয়োজনে মেয়াদ ছয় মাস পর্যন্ত বাড়ানো গেলেও তার জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু এর কিছুই মানেনি ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসন। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের সাংগঠনিক কাঠামোতে নেই এমন কিছু পদেও লোকবল পদায়ন করা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের সবকটি সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর বিষয়টি নজরে আসে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের।
১১ অগাস্ট এক বিজ্ঞপ্তিতে নিয়ম ভেঙে পদোন্নতি পাওয়া প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম মিয়াকে দুই ধাপ নিচে নামিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী আজহারুল হক, জীবন কৃষ্ণ সরকার, জসিম উদ্দিন, শফি কামাল, জিল্লুর রহমানকে একধাপ নিচে নামিয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী করা হয়।
এ ছাড়া প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এইচ কে দেবনাথ ও প্রধান হিসাব রক্ষক অসীম কুমারসহ ৩৩ কর্মকর্তাকে আগের পদে ফিরে যেতে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
এ ঘটনার পর আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন কর্মকর্তারা। প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষের সামনে থেকে নেমপ্লেট খুলে ফেলেন। এতে ভাটা পড়ে চলমান বিভিন্ন কাজে। তবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন কর্মকর্তারা।
নির্বাহী প্রকৌশলীর (যান্ত্রিক) দায়িত্ব পালন করা শাফি কামাল বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী তখন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) থেকে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আমাদের দায়িত্ব খর্ব করা হয়েছে। এতে আমরা মানসিক ও সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছি। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদ ফিরে পেতে চেষ্টা করা হচ্ছে।”
তবে সিটি করপোরেশনের সব কাজ করে যাচ্ছেন তারা; এতে কোনও স্থবিরতা হচ্ছে না বলে দাবি এই নির্বাহী প্রকৌশলীর।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অযোগ্য বিভিন্ন কর্মকর্তা পদ দখল করে রাখায় সিটি করপোরেশনে প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইয়াজদানী কোরায়শী কাজল।
তিনি বলেন, “উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী না হয়ে নিয়ম ভেঙে এক ধাপ এগিয়ে অনেককে নির্বাহী প্রকৌশলী করা হয়েছিল। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে অভিজ্ঞতারও ঘাটতি দেখা যায়; যার বড় প্রমাণ, হাতে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ। যা নিয়ে আমরা বারবার কথা বলেছি।”
গণসংহতি আন্দোলন ময়মনসিংহ জেলা শাখার আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান রাজীব বলেন, “বিগত সরকারের সময় সবক্ষেত্রেই দুর্নীতিতে ভরপুর ছিল। এতে যেমন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জড়িত ঠিক তেমনি আমলারাও।
“সিটি করপোরেশনে আজকে যাদেরকে চলতি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা দায়িত্ব পালনকালীন সময় ক্ষমতা এবং চেয়ারের অপব্যবহার করেছেন। এখন তাদেরকে চলতি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ায় উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।”
দ্রুত এসব পদে দক্ষ জনবল নিয়োগ দিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার দাবি জানিয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের এই নেতা।
অনিয়মতান্ত্রিকভাবে পদ দখল করে রাখায় ৩৩ কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মোখতার আহমেদ।
তিনি বলেন, “আগের মেয়র এসব কর্মকর্তাদের চলতি দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। আবার চলতি দায়িত্ব দিতে গিয়ে দেখা গেছে, একজন সহকারী প্রকৌশলী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হয়ে আছেন। সহকারী প্রকৌশলীকে চলতি দায়িত্ব দিলে নেক্সট পদ হচ্ছে নির্বাহী প্রকৌশলী কিন্তু এখানে নির্বাহী প্রকৌশলীকে কিছুদিন পর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করা হয়েছে।
“অর্থাৎ একই ব্যক্তিকে চলতি দায়িত্বে নির্বাহী প্রকৌশলী আবার কিছুদিন পর তাকেই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করা হয়েছে; যা নিয়মের ব্যত্যয়।”
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের বিবরণ তুলে ধরে মোখতার আহমেদ বলেন, “কাউকে যদি চলতি দায়িত্ব দিতে হয়, মেয়রের সভাপতিত্বে একটা সভা করে তারপর দায়িত্ব দিতে হবে; কিন্তু সেই দায়িত্ব ছয় মাসের বেশি নয়।
“তবে আবার তাকে দায়িত্ব দিলে আবারও সভা করতে হবে। কিন্তু এখানে যাদের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শুধু একবার সভা হয়েছে। এসব কারণে যে যে পদে ছিলেন তাকে সেই পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।”