পর্যটন দিবস: কক্সবাজারে ‘এত বিদেশির’ মধ্যে পর্যটক কয়জন?
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ‘খুবই নগণ্য’ বলে জানিয়েছেন।
কক্সবাজারে বছরে কতজন বিদেশি পর্যটক আসেন- এর কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই সংশ্লিষ্ট কারও কাছে। জেলা প্রশাসন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, হোটেল-মোটেল মালিক, এমনকি পর্যটন করপোরেশনও জানে না শুধু পর্যটনের জন্য বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে কতজন আসেন।
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজারের বিদেশি নাগরিকদের একটি বড় অংশই বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় কাজের সুবাদে আসেন।
স্থানীয়ভাবে বাসা ভাড়া করে কিংবা হোটেল-মোটেলে তারা অবস্থান করেন। কাজের ফাঁকে হয়ত তারা এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করলেও তারা এখানে পর্যটনের জন্য আসেননি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলছেন, “বিদেশি নাগরিকদের একটি বড় অংশ কক্সবাজারে আসেন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা রোহিঙ্গা শিবিরসংশ্লিষ্ট কাজে। ফলে পর্যটনের উদ্দেশ্যে আসা বিদেশিদের আলাদা করে শনাক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেই।
“আলাদাভাবে যদি বলি যে, অমুক প্রপারলি পর্যটনের উদ্দেশ্যে আসতেছে, এরকম কোনো ডেটা আমি জানি না কারো কাছে আছে কিনা; আমার কাছে নাই।”
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলও বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা বা তাদের আগমন-প্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি বলে জানান জেলা প্রশাসক।
বিদেশি পর্যটক, নাকি বিদেশি নাগরিক?
কক্সবাজারে বিদেশি নাগরিকের উপস্থিতি যে নেই, তা নয়। তবে তাদের সবাইকে পর্যটক হিসেবে গণনা করার সুযোগ নেই। কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও এ নিয়ে আলাদাভাবে কোনো তথ্য রাখা হয় না।
বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, বিদেশি পর্যটকের আলাদা কোনো হিসাব তাদের কাছে নেই। বিমানবন্দরে বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াত থাকলেও সেটিকে পর্যটক হিসেবে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয় না।
তবে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ‘উল্লেখ করার মতো বেশি নয়’ বলেও জানান তিনি।
কিছু বিদেশির তথ্য পুলিশের কাছে
বিদেশি নাগরিকদের একটি অংশের তথ্য অবশ্য পুলিশের কাছে আসে। তবে সেটিও কক্সবাজারে পর্যটনের উদ্দেশ্যে আসা বিদেশিদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. ফিরোজ কবির বলেন, নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পুলিশের কাছে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
“তাদেরটা থাকে আমাদের কাছে। এর বাইরে যারা থাকে তাদের হিসাব তো আমাদের কাছে থাকে না।”
বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা জানতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য থাকার সম্ভাবনার কথা জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
‘খুবই নগণ্য’ বিদেশি পর্যটক
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কক্সবাজারের হোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ‘খুবই নগণ্য’ বলে জানিয়েছেন।
তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত বিদেশি নাগরিক কিংবা বিভিন্ন কাজে কক্সবাজারে আসা বিদেশিদের উপস্থিতি থাকলেও প্রকৃত অর্থে পর্যটক হিসেবে আসা বিদেশির সংখ্যা উল্লেখ করার মতো নয়।
“শুধু জেনুইন টুরিস্ট বলতে যেটা বুঝায়, এইটা ওইরকম আমাদের এখানে খুবই কম আছে। উল্লেখ করার মত কোনো সংখ্যা আসলে বলার মতো নয়।”
কেন বিদেশি পর্যটক কম, তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “শুধু থাকার জন্য হোটেল থাকলেই আন্তর্জাতিক পর্যটন গড়ে ওঠে না। পর্যটকদের জন্য মানসম্মত সেবা, বিনোদন, নাইট লাইফ, পার্ক, সিনেমা হলসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন।”
তার মতে, নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসায়ীদের চোখে সমস্যা
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল শুক্কুরের ভাষায়, কক্সবাজারে দেশীয় পর্যটকের বিপুল সমাগম থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যটনের চিত্র ভিন্ন।
“কক্সবাজারে সারাবছর বিপুল পরিমাণ দেশীয় পর্যটকের সমাগম হলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো আন্তর্জাতিক বা ‘ডেডিকেটেড’ প্রমোদ পর্যটক আসছে না।”
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশন ও কনস্যুলেটের মাধ্যমে কক্সবাজারকে পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রচারের ঘাটতিও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিদেশি পর্যটক বাড়াতে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে ‘আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা, বিদেশি এয়ারলাইনকে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচারের পরামর্শ দেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
‘পর্যটন-পরিবেশ দরকার’
কক্সবাজারের রয়েছে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন, দ্বীপ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও রোহিঙ্গা সংকট ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ। দেশীয় পর্যটকদের কাছে এটি দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় গন্তব্য।
কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটনের বাজারে সেই আকর্ষণকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করা যায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব উর রহমান মনে করেন, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের আগে কক্সবাজারের অবকাঠামো ও পর্যটন-পরিবেশ প্রস্তুত করা দরকার।
“বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে মূল বাধা হলো আমরা বিশ্বমঞ্চে সেভাবে কক্সবাজারকে তুলে ধরতে বা প্রমোশন করতে পারিনি। আর প্রমোশন করার আগেই যে অবকাঠামোগত সুবিধা ও পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার ছিল, সেই জায়গাটিতেও বড় ঘাটতি রয়েছে।”
তার মতে, কক্সবাজার সম্পর্কে জেনে যারা আসছেন, তারাও যাতায়াতসহ বিভিন্ন ছোটখাটো ভোগান্তির কারণে কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরতে পারছেন না।
আন্তর্জাতিক পর্যটন দিবসের প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কক্সবাজারের বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ের পরামর্শও দেন তিনি।
বিদেশিদের জন্য আলাদা এলাকা?
বিদেশি পর্যটকদের জন্য আলাদা ‘এক্সক্লুসিভ জোন’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন পর্যটন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুসরাত জাহানও বিদেশি পর্যটকদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন।
তবে তার মতে, বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতিকেও পর্যটন পণ্যে পরিণত করা সম্ভব।
বাউল সংগীতের আসর, জামদানি ও মসলিনের প্রদর্শনী, চিত্রকর্ম এবং স্থানীয় খাবারকে কেন্দ্র করে পর্যটন আয়োজনের কথা বলেন তিনি।
তার মতে, আন্তর্জাতিক মানের বিনোদনকেন্দ্র বা থিম পার্ক, একটি পরিকল্পিত নাইট মার্কেট এবং সৈকতকেন্দ্রিক ডাইনিংও বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে।
তবে কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটক একেবারেই নেই, এমন চিত্রের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন বেসরকারি ইকো-রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা।
মারমেইড ইকো রিসোর্টের ব্যবস্থাপক রানা কর্মকার বলেন, বিদেশি পর্যটকরা দেশীয় পর্যটকদের তুলনায় আগে থেকেই তাদের রিসোর্ট সম্পর্কে জানেন এবং কক্সবাজারে এসে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তার মতে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সাময়িকীতে বাংলাদেশের টেকসই ইকোটুরিজম নিয়ে প্রচার তাদের বিদেশি পর্যটক পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
বিদেশি পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা, আধুনিক পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক মানের সন্ধ্যাকালীন বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকলে বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলেও পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো কঠিন হবে না বলে মনে করেন পর্যটক ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের অনেকে।
ব্যবসায়ী আবেদ হাসান সাগর বলেন, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার নানা পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, নতুন হোটেল ও অবকাঠামো উন্নয়নের আলোচনা চলছে। কিন্তু তার আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত, কক্সবাজারে আসলে বছরে কতজন বিদেশি পর্যটক আসেন?
এই মুহূর্তে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের কাছেই সেই সংখ্যাটি অজানা।
