১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪ কার্তিক ১৪৩৩

পর্যটন খাতে অব্যবস্থাপনা: কাঠামোগত অবহেলায় আর কত প্রাণহানি?

কক্সবাজারের ইনানীতে ইকো-রিসোর্টে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ১০ পর্যটকের মৃত্যু পর্যটন খাতের ভয়াবহ কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। টেকসই উন্নয়ন ও জীবন রক্ষায় দ্রুত কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

পর্যটন খাতে অব্যবস্থাপনা: কাঠামোগত অবহেলায় আর কত প্রাণহানি?

কক্সবাজারের পাটুয়ারটেক এলাকায় শনিবার সকালে ভয়াবহ আগুনে ভস্মীভূত হয় ‘টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্ট’। ভয়াবহ এ আগুনে অন্তত ১০ জন পর্যটক প্রাণ হারান। ছবি: সৌরভ দেব

মুস্তাফিজ মামুন মুস্তাফিজ মামুন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 19 Oct 2026, 06:31 PM

Updated : 19 Oct 2026, 06:48 PM

ভ্রমণ এখন আর নিছক কোনো বিলাসিতা নয়, রীতিমতো জীবনের অনুষঙ্গ। একটু অবসর মিললেই যান্ত্রিক শহরের ইট-কাঠের খাঁচা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ উন্মুখ হয়ে ওঠে। পাহাড়ে মেঘের ছোঁয়া, সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন এবং অরণ্যের শান্ত হরিৎ প্রান্তর—প্রকৃতির এই সান্নিধ্য মানুষকে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়।

দেশের অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির দৃঢ় অবস্থান এবং একই সঙ্গে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ভ্রমণকে অনুঘটক হিসেবে বিস্তৃত করেছে। পকেটে কিছুটা সামর্থ্য আর হাতে দুই-তিন দিনের ছুটি পেলেই তাই ভ্রমণের এই জোয়ারে গা ভাসাচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষ। মানুষের মধ্যে জেগে ওঠা এই উন্মাদনা এবং ভ্রমণের এই নতুন সংস্কৃতি দেশের পর্যটন শিল্পের জন্য যেমন অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতি চাঙ্গা করায় ভূমিকা রাখছে।

প্রতি বছর লাখ লাখ দেশীয় পর্যটক দেশের ভেতরেই ভ্রমণ করছেন। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় খাতের একটি অন্ধকার দিক ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে—আর তা হলো পর্যটন স্পটগুলোতে উদ্বেগজনক হারে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি। সঠিক তদারকি ও নিরাপত্তার অভাবে পর্যটকদের প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা এখন নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায়, বিশেষ করে সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা ও শ্রীমঙ্গলে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল ও রিসোর্ট। এসব জায়গায় পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ইকো-কটেজ বা ইকো-রিসোর্টের নামে এক ধরনের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন ব্যবসায়ীরা।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ইকো-ট্যুরিজম বলতে পরিবেশের ক্ষতি না করে, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকৃতিকে উপভোগ করা বোঝায়। কিন্তু আমাদের দেশে এর প্রয়োগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেবল সাইনবোর্ড আর নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায়, খাদের কিনারে, ঝরনার কাছাকাছি কিংবা বনাঞ্চলের গহীনে অপরিকল্পিতভাবে এসব কটেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। পাহাড় কেটে, গাছ উজাড় করে এবং নদীর গতিপথ আটকে গড়া এসব স্থাপনায় যেমন ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে, তেমনি পর্যটকদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক ও বর্জ্যে বিপন্ন হচ্ছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য।

অবকাঠামোগত ত্রুটি ও নিরাপত্তার অভাবে কীভাবে প্রাণহানি ঘটে, এর ভয়াবহ প্রমাণ আমরা সম্প্রতি দেখেছি। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের ইনানী এলাকার ‘টুপটুপ’ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ১০ জন পর্যটকের মর্মান্তিক প্রাণহানি তথাকথিত ইকো-রিসোর্টের অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রশাসনিক তদারকির মারাত্মক গাফিলতির বিষয়টি সামনে এনেছে।

কাঠের তৈরি তিন তলা বিশিষ্ট এই রিসোর্টে প্রবেশ ও বের হওয়ার একমাত্র পথটি ছিল রেস্তোরাঁর ভেতর দিয়ে। সেখানে ছিল না কোনো জরুরি বহির্গমন পথ বা ইমার্জেন্সি এক্সিট। ওই রিসোর্টে বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করা একাধিক পর্যটক এ তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। যেহেতু রেস্তোরাঁর রান্নাঘর থেকে আগুন লাগার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে, তাই এর ভেতর দিয়ে যাতায়াতের পথ রাখা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় প্রশাসনের তদারকির গাফিলতিতেই এমন মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ একটি রিসোর্ট বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার অনুমতি পেয়েছিল।

Image

বান্দরবানের নীলাচল পর্যটন কেন্দ্র লাগোয়া পাহাড়ের ঢালে নীলাম্বরী রিসোর্ট নির্মাণ করেছে জেলা পরিষদ। পাহাড়ি এ পর্যটনকেন্দ্র ধরা পড়েছে পাখির চোখে। ছবি: মুস্তাফিজ মামুন

দুর্ঘটনা কেবল রিসোর্টের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। পর্যটকরা যখন পাহাড়ি নদী, দুর্গম ঝরনা (যেমন: খৈয়াছড়া, নাফাখুম বা অমিয়াখুম) বা সমুদ্রে নামছেন, তখন সেখানে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক নির্দেশিকা থাকছে না। সিলেটের জাফলং বা বিছনাকান্দি, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের চোরাবালি ও অদৃশ্য গর্তে ডুবে প্রতি বছরই পর্যটকের মৃত্যু হচ্ছে।

কক্সবাজার সমুদ্রে ভাটার সময় লাল পতাকা (বিপৎসংকেত) থাকার পরও অনেক পর্যটক তা মানছেন না, আর সেখানে লাইফগার্ডের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। অন্যদিকে সাজেক বা থানচির মতো পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ও ঢালু রাস্তায় বেপরোয়া, অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন ‘চাঁদের গাড়ি’ (অনেক পুরনো এসইউভি) উল্টে প্রায়শই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাবে পর্যটন স্পটগুলোর ধারণক্ষমতা বিবেচনা না করেই অতিরিক্ত পর্যটক প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে, যা ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।

পর্যটন শিল্প কেবল অবকাঠামো নির্মাণ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখিয়ে অর্থ উপার্জনের খাত হতে পারে না; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। এই খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য অবিলম্বে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

কঠোর নীতিমালা ও অনুমোদন: যত্রতত্র রিসোর্ট বা কটেজ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। পর্যটন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, ফায়ার সার্ভিস এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত ছাড়পত্র ছাড়া কাঠামোগত নিরাপত্তার সনদবিহীন কোনো রিসোর্ট যেন চলতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

ধারণক্ষমতা নির্ধারণ: সেন্টমার্টিন, সাজেক বা সুন্দরবনের মতো পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে প্রতিদিন কতজন পর্যটক প্রবেশ করতে পারবেন, তার একটি নির্দিষ্ট সীমা (কোটা) নির্ধারণ করে দিতে হবে।

নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা: স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে। শর্ত ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স বাতিল বা সিলগালা করার পাশাপাশি ট্যুর অপারেটরদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার: প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ পর্যটন স্পটে লাইফগার্ড, সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের দৃশ্যমান ও কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। চালকদের প্রশিক্ষণ ও পাহাড়ি রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে।

ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন ও বিমা: দুর্গম এলাকার রিসোর্টগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা এবং দ্রুত উদ্ধারের জন্য বিশেষ হেল্পলাইন ও লোকাল ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করতে হবে। পর্যটকদের জন্য 'ট্যুরিস্ট ইন্স্যুরেন্স' বা পর্যটন বিমা চালু করা যেতে পারে।

Image

রাঙামাটির সাজেক পর্যটন কেন্দ্রের অদূরে কংলাক পাহাড়ের পাদদেশে কাঠের তৈরি একটি রিসোর্ট। ছবি: মুস্তাফিজ মামুন

পর্যটকদেরও ভ্রমণের সময় ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হতে হবে এবং ভ্রমণকালীন অতি-উত্তেজনাবশত ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে বাংলাদেশের পর্যটন স্থানে এত এত অব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনায় এত এত প্রাণহানিতে রাষ্ট্র বা প্রশাসন কোনোভাবেই তাদের তদারকির দায় এড়াতে পারে না। মানুষের বিনোদনের স্থানগুলো যেন কোনোভাবেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত না হয়, সেদিকে কঠোর নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। সঠিক তদারকি, জবাবদিহিতা এবং পর্যটকবান্ধব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের সম্ভাবনাময় এই পর্যটন শিল্প অচিরেই মানুষের আস্থা হারাবে।

মুস্তাফিজ মামুন: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান আলোকচিত্রী