০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

ময়মনসিংহে সড়কে ৭ মৃত্যু: রাজিব পরিবহনের ‘গায়েবানা জানাজা’, চালকের নামে মামলা

জানাজায় প্রতীকী লাশের গায়ে লেখা ছিল ‘আমি রাজীব পরিবহন, আমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করুন।’

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 03 Oct 2026, 05:03 PM

Updated : 03 Oct 2026, 05:21 PM

ময়মনসিংহ নগরে যাত্রীবাহী বাসের চাপায় অটোরিকশার সাত যাত্রী নিহতের ঘটনায় চালকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

ঘটনার বিচার দাবিতে জামালপুর শহরের ফৌজদারি এলাকায় রাজীব পরিবহনের ‘গায়েবানা জানাজা’ এবং প্রতীকী লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

নিহতদের এক স্বজন শুক্রবার রাতে বাদী হয়ে বাস চালককে আসামি করে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন বলে জানান ওই থানার ওসি মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম।

বাদী মো. মোবারক আলী জামালপুর সদর উপজেলার দড়িহামিদপুর গ্রামের বাসিন্দা। দুর্ঘটনায় তিনি মা, ভাই, ভাতিজি ও নাতিকে হারিয়েছেন।

এর আগে ওই দিন দুপুরে ময়মনসিংহ নগরের আকুয়া গন্দ্রপা বাইপাস মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

ঢাকা থেকে জামালপুরের দিকে যাওয়া রাজীব পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশায় থাকা সাতজনই ঘটনাস্থলে মারা যান।

নিহত সাতজনই জামালপুর জেলার বাসিন্দা। এর মধ্যে একই পরিবারের চারজন হলেন জামালপুর সদর উপজেলার দড়িহামিদপুর গ্রামের রাশিদা বেগম (৮৫), তার ছেলে মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫৫), মোফাজ্জলের মেয়ে মর্জিনা আক্তার (২৫) ও মর্জিনার ছেলে মিনাল (৫)।

নিহত অন্য তিনজন হলেন- একই উপজেলার বীর গোবিন্দপুর গ্রামের অটোরিকশা চালক মো. সুজন আলী (৩৪) এবং বাদেচান্দি গ্রামের আকরাম আলী (৪৮) ও তার স্ত্রী মমতা বেগম (৩৯)।

ঘটনার পর রাত ১০টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সাতজনের মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানান কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই রিপন সরকার। শনিবার সকালে জানাজা শেষে তাদের দাফন করা হয়।

রাজিব পরিবহনের গায়েবানা জানাজা

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঢাকা-জামালপুর পথে চলাচলকারী রাজীব পরিবহনের বাসগুলো অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চলাচলের জন্য প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয় মানুষ।

বাসচাপায় সাতজনের মৃত্যুর প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে রাত ১০টার দিকে জামালপুর শহরের ফৌজদারি এলাকায় রাজীব পরিবহনের ‘গায়েবানা জানাজা’ এবং প্রতীকী লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রতীকী লাশের গায়ে লেখা ছিল ‘আমি রাজীব পরিবহন, আমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করুন।’

এর আগে সড়কে ধারাবাহিক দুর্ঘটনার প্রতিবাদে সেপ্টেম্বরে শুরুতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজীব বাস বন্ধের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছিলেন।

মা-ভাই-ভাতিজি-নাতিকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ মোবারক

শুক্রবার সন্ধ্যায় দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামে মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে চলে মাতম। স্বজন হারানোর খবর পেয়ে আশপাশের গ্রামের মানুষও সেখানে আসেন।

পেশায় রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন লেবু স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের হোতাপাড়া এলাকায় থাকতেন। মা রাশিদা বেগম ও বিবাহিত মেয়ে মর্জিনাকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য আগের দিন বাড়িতে এসেছিলেন মোফাজ্জল।

শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মা রাশিদা বেগম, দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মর্জিনা ও নাতি মিনালকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন মোফাজ্জল। নান্দিনা থেকে অটোরিকশায় ময়মনসিংহ যাওয়ার কথা ছিল তাদের। সেখান থেকে বাসে করে গাজীপুরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ময়মনসিংহে বাসের চাপায় তারা প্রাণ হারাণ।

স্বজনদের হারিয়ে বিলাপ করতে করতে মোবারক আলী বলেন, “আল্লাহ, আমার পুড়ি (মেয়ে) কী করে খাব, আমি কী করে খাওয়াব? আমার জামাই মইরা গেছে। আমার নাতিন আর পুতিও মইরা গেছে। সব হারাইছি। আমার সব শেষ গো, আল্লাহ গো।”

ওসি শিবিরুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই বাস ও অটোরিকশাটি জব্দ করে থানায় নেওয়া হয়। তবে বাস চালক ও সহযোগীরা পালিয়ে গেছে। চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

আরও পড়ুন:

ময়মনসিংহে নিহত ৭ জন শায়িত হলেন জামালপুরের দুই ইউনিয়নে

ময়মনসিংহে সড়কে মৃত্যু ৭: একই পরিবারের চারজনসহ ৬ জনকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ রানাগাছা

ময়মনসিংহে বাসচাপায় অটোরিকশার ৭ আরোহী নিহত