Published : 03 Oct 2024, 11:28 AM
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাম সিং গড় তার এলাকায় ‘সবচেয়ে প্রবীণ’ মানুষ হিসেবেই পরিচিত। বয়সের ভারে ন্যুজ্ব হয়ে পড়লেও এখনও পরিবারের কাজ করেন। অতীতের কথাও বেশ ভালো মনে করতে পারেন। মানুষ আগ্রহ নিয়ে তার কাছে শতবর্ষ আগের কথা জানতে আসেন। তিনি স্মৃতি থেকে স্মরণ করে সেসব কথা তাদের শোনান।
রাম সিংয়ের বয়স নিয়ে মানুষের মধ্যে দারুণ কৌতূহল। কারণ, ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী, তার বয়স এখন ১১৯ বছর। রাম সিং অবশ্য দাবি করেন, তার আসল বয়স আরো বেশি; ১৩৫ বছর!
প্রতিবেশী ও স্থানীয় অনেকের ধারণা, রাম সিং বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে প্রবীণ পুরুষ। কারণ, গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষের বয়স ১১১ বছর। তারা মনে করেন, প্রশাসনের উচিত সবকিছু যাচাই-বাছাই করে রাম সিংয়ের নাম গিনেস রেকর্ডস কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু তালেব সম্প্রতি রাম সিং গড়ের বাড়িতে যান। তাদের মধ্যে দীর্ঘ আলাপচারিতা হয়। পরে ইউএনও সাংবাদিকদের বলেন, রাম সিং এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ মানুষ। আরো যাচাই-বাছাই করে তার নাম গিনেস কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর জন্য তিনি কাজ করবেন।
মেকানীছড়া গ্রামটি শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ত্রিপুরা সীমান্তে। পাহাড়ি একটি ছড়ার মাধ্যমে পৃথক করা গ্রামটি চিরসবুজ, শীতল ও শান্ত। এখানকার মানুষগুলোও প্রকৃতির মতো সরল।
এই আধুনিক যুগেও প্রত্যন্ত এ গ্রামের মানুষ ছড়ার পানি পান করেন। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের আঁধার দূর করতে গ্রামবাসীর ভরসা এখনো কুপি বাতির আলো। নেই মোবাইল নেটওয়ার্কও।
পাঁচ-সাত কিলোমিটারের মধ্যে নেই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়। অনেকটা ‘আগের দিনের’ মানুষ হিসেবেই আছেন এই গ্রামের বাসিন্দারা।
বছরখানেক আগে সংবাদ সংগ্রহের কাজে গিয়ে প্রথম রাম সিংয়ের খোঁজ পাওয়া যায়। শীতের সেই বিকালে প্রতিবেদকের সঙ্গী ছিলেন স্থানীয় নৃগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা তাজুল ইসলাম জাবেদ।
রাম সিং তখন অসুস্থ ছিলেন। তবে সাংবাদিক এসেছে শুনে হেঁটে হেঁটেই তিনি ঘরের বাইরে এসে একটি চেয়ারে বসেন।
কুশল বিনিময়ের পর বয়স জিজ্ঞাসা করলে রাম সিং কোনো দ্বিধা না করেই বলেন, “এখন ১৩৫ বছর।”
ভোটার আইডি কার্ড আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বললেন, “আছে।” পরে তিনি চেয়ার থেকে উঠে আস্তে আস্তে ঘরের ভিতরে যান। পুরানো আমলের একটি ট্রাঙ্ক (টিনের বাক্স) বের করে তালা খোলেন।
সেখানে রাখা একটি ধুতির ভাঁজ থেকে বের করে আনেন ভোটার আইডি কার্ড। সেখানে তার জন্ম তারিখ লেখা ৬ অগাস্ট, ১৯০৫ সাল। বাবার নাম বুগুরাম গড়, মায়ের নাম কুন্তী গড়।
আলাপচারিতায় রাম সিং গড় বলেন, তার বাবার আদিভূমি ছিল ভারতে। চা চাষের জন্য তার দাদার সঙ্গে বাবা এ এলাকায় প্রথম আসেন। তার দাদা ও বাবার হাতে প্রথম পুটিয়াছড়া চা বাগানের সৃজন হয়। আর তার হাতে সৃজন হয় হরিণছড়া চা বাগান।
যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয় ১৯১৪-১৫ সালে; তখন তিনি বাগানের চৌকিদার। ইংরেজ সাহেবদের কাছে যুদ্ধের কথা শোনেন।
১৯৩৯-৪০ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয় ইংরেজ সাহেবদের কাছ থেকে সেই খবর শুনে বাগানের মানুষ ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়। তখন তিনিও আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন বলে জানান রাম সিং।
বাংলা ভাষা নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছিল ১৯৫২ সালে, যেখানে পুলিশের গুলিতে ঢাকায় ছাত্ররা মারা গেল, সেটাও বললেন তিনি। ১৯৬৫ সালে শ্রীমঙ্গল বিদ্যাবিল চা বাগানে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান দাঙ্গা হয়। গোলাগুলি হয়। তখন তিনি বিদ্যাবিল চা বাগানে ছিলেন। সেখান থেকে সরে আসেন পুটিয়ার দিকে।
১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়, তখন হরিণছড়া চা বাগানের সব ম্যানেজার-স্টাফ পালিয়ে যায়। কিন্তু পালাননি রাম সিং। তিনি ও নীরেন হাদিমা মিলে শ্রমিক সংগ্রহ করে বাগানের পাতা তুলে খেজুরি চা বাগানে পাঠান। পুরো নয় মাস তারা বাগানে থেকে হরিণছড়া চা বাগান রক্ষা করেন।
আলাপচারিতায় তিনি বলছিলেন, খেজুরি চা বাগানে ব্রিটিশ ম্যানেজার ছিলেন ‘হল সাহেব’ নামে একজন। হল সাহেব বাগানের মেয়ে মঙ্গলীকে বিয়ে করেন। মঙ্গলী তার বয়সে অনেক ছোট ছিল। কিন্তু সাহেব বিয়ে করেছেন তাই তাকে ‘মংলী ম্যাম’ বলে ডাকতে হত।
এই ব্রিটিশ নাগরিক হল সাহেব শ্রীমঙ্গল শহরতলীর বর্তমান পাদ্রী বাংলোর পাশে একটি বাংলো বাড়ি তৈরি করেন। এই বাংলো বাড়িও তার সময়ে করা হয়েছে বলে জানান রাম সিং। হল সাহেবের ছেলে রবার্ট হল এর নামে শ্রীমঙ্গলে একটি সড়কও আছে।
রাম সিং গড় বলেন, তিনি শ্রীমঙ্গলের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন।
তখন ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের একপাশে পাকা ঘর, লোহার পিলার ছিল, অন্যপাশে ছিল ছনের ঘর। এই ছনের ঘরে তিনি ক্লাস করতেন। তখন তিনি মৌলভীবাজার সড়কের কোনো এক আচার্য্য বাড়িতে থেকে পড়তেন।
সে সময় শ্রীমঙ্গলে পাকা সড়ক হয়নি। তার ভাষ্য, পাকা ঘর বলতে ছিল শ্রীমঙ্গল পুরাতন বাজারে ত্রিপুরা রাজ্য ব্যাংক, রামরতন বানিয়ার বাসা ও জগন্নাথ জিউর আখড়ার পশ্চিমে ত্রিপুরা রাজার বাংলো (রাজ কাছারি)।
মাঝেমধ্যে ত্রিপুরা রাজা হাতির পিঠে চড়ে ওই বাংলোয় এসে থাকতেন এবং এখান থেকে খাজনা আদায় করতেন বলে স্মরণ করেন প্রবীণ রাম সিং।
তিনি বলেন, চা বাগানে নিজস্ব ট্রলি দিয়ে পাতা আনা-নেওয়া করা হত। সেই ট্রলির লাইন স্থাপনও তিনি দেখেছেন এবং সেই লাইনে ট্রলি ঠেলে পাতা পাঠিয়েছেন।
সেদিন সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় এবং রাম সিংয়ের অসুস্থতার কারণে আলাপচারিতা আর এগোয়নি। তাছাড়া তিনি যে তথ্যগুলো দিয়েছেন তা নিয়ে এলাকার প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন ছিল।
চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর তাজুল ইসলাম জাবেদ ও সবুজ তজু নামের একজনকে নিয়ে রাম সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আবার তার বাড়িতে যাওয়া হয়।
বাড়ির সামনের দিক বন্ধ থাকায় পেছনের দিকে গিয়ে দেখা যায়, বারান্দায় একটি বেঞ্চে বসে পুরনো একটি পাখা মেরামত করছেন রাম সিং। জানালেন, আগের বারের চেয়ে এবার তিনি বেশ সুস্থ। পুরোনো-নতুন মিলিয়ে অনেক কথাই হল।
রাম সিং জানান, প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর প্রায় ৬৫-৬৬ বছর বয়সে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এই সংসারে তার পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে জন্ম নেয়। আগের সংসারে শুধু একটি মেয়ে ছিল।
আগের সংসারের মেয়ে ও পরের সংসারের বড় ছেলে এরমধ্যেই মারা গেছেন। ছেলে-মেয়ের ঘরের একাধিক নাতি-নাতনী বিয়ে দিয়েছেন। তাদের সন্তানও ১৫-১৬ বছর বয়সী।
তবে এখন সবাই আলাদা আলাদা থাকেন। আর রাম সিং থাকেন তার চতুর্থ ছেলে জগদীশ সিং গড়ের সঙ্গে।
জগদীশ সিং গড় জানান, তার বাবার ছেলে-মেয়ে, মেয়ের জামাই, পুত্রবধূ, নাতি-পুতি, নাতিন জামাই মিলিয়ে পরিবারে জীবিত সদস্য সংখ্যা ৭০ এর উপরে।
নাতনি মামণি গড় জানান, তার দাদা এখনও বেতের সামগ্রী তৈরি করতে পারেন। ঘরের টুকটাক কাজও করেন।
বাঁশ-বেতের তৈরি নতুন একটি পাখা দেখিয়ে মামণি বলেন, প্রচণ্ড গরম পড়েছে, তাদের বিদ্যুৎ নেই। তাই দাদা কয়েকদিন আগে এই পাখা তৈরি করেছেন।
দেখা গেল রাম সিং ধারালো দা দিয়ে পুরাতন একটি পাখা মেরামতের জন্য বাঁশের কাঠি মসৃণ করছেন। সুঁইয়ে মধ্যে সুতাও প্রবেশ করালেন এবং নিজেই পাখাটি সেলাই করতে লাগলেন।
পরিবারের সদস্যরা জানালেন, রাম সিং এখনও লিখতে ও পড়তে পারেন।
ছেলে জগদীশ বললেন, “টাকা পয়সার অভাবে বাবাকে ফলমূল, হরলিক্স খেতে দিতে পারি না। ডাক্তার বলেছে হরলিক্স খাওয়ালে শরীরে শক্তি আসবে।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলতে গেলে শ্রীমঙ্গলের প্রবীণ শিক্ষক দ্বীপেন্দ্র ভট্টাচার্য্য বলেন, “রাম সিং শ্রীমঙ্গলের যে সব বর্ণনা দিয়েছেন তাতে নিঃসন্দেহে অনুমান করা যায় তিনি একজন অতি প্রবীণ মানুষ।”
তিনি বলেন, “আমার বয়স ৮০ বছর। ছোটবেলায় আমি পুরানবাজারে ত্রিপুরা রাজ্য ব্যাংকের ভগ্নাংশ দেখেছি। আর শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ১৯২৪ সালে স্থাপিত হলেও প্রাথমিক শাখা স্থাপিত হয়েছে তারও অনেক আগে।”
“আর যেহেতু ভোটার আইডি কার্ডে তার জন্মসাল লেখা রয়েছে ১৯০৫, সে হিসেবেও তিনি ১১৯ বছর বয়সী।”
দ্বীপেন্দ্র বলেন, যারা শতবছর অতিক্রম করবেন এমন মানুষদের চিকিৎসাসহ অনান্য সেবাযত্ন ও সুযোগ-সুবিধা সরকারের দেওয়া উচিত। গিনেস বুকেও তার নাম পাঠানো উচিত।
এ জন্য সরকারের পাশাপাশি চা বাগান কর্তৃপক্ষও এগিয়ে আসতে পারে বলে মত দেন তিনি।
হরিণছড়া চা বাগানের ৮০ বছর বয়সী নীরেন হাদিমা জানান, ১৯৬১ সালে তিনি হরিণছড়া চা বাগানে স্টাফ হিসেবে যোগ দেন। তখনই তিনি রাম সিং গোঁড়কে দেখেছেন বৃদ্ধ। ১৯৭১ সালে হরিণছড়া চা বাগান রক্ষায় রাম সিং গোঁড়ের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
তিনি বলেন, “স্টাফ বলতে আমি একা এবং শ্রমিক বলতে তিনি ছিলেন। রাম সিং অনুরোধ করে অন্যান্য বাগান থেকে শ্রমিক এনে পাতা তুলে বাগান রক্ষা করেন। যাতে গাছসহ অনান্য মালামাল চুরি না হয় রাম সিং নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহারা দেন।”
সুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘায়ু ধরে রাখতে রাম সিং গড়ের প্রয়োজন চিকিৎসা ও ভালো খাবার। তবে রাম সিং মৃত্যুর আগে তার গ্রামে বিদ্যুৎ সুবিধা দেখে যেতে চান। আর বিদ্যুৎ এলে একটি গভীর নলকূপ আছে সেটিও চালু হবে।
রাজঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিজয় বুনার্জী বলেন, রাম সিং গড় তার ইউনিয়নের একজন প্রবীণ ভোটার। আইডি কার্ড অনুযায়ী তার বয়স ১১৯ বছর।
আর ইউপি সদস্য অজয় ভৌমিক বলেন, জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী রাম সিংয়ের বয়স ১১৯ বছর। ভোটার আইডি কার্ডেও তাই আছে।
মঙ্গলবার বিশ্ব প্রবীণ দিবস উপলক্ষে রাম সিংয়ের সঙ্গে দেখা করে তাকে শুভেচ্ছা জানান শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
সকালে মেকানীছড়া গ্রামে গিয়ে রাম সিং গোঁড়কে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু তালেব। পাশাপাশি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে তিন হাজার করে টাকা, হরলিক্স ও ফলমূলসহ খাদ্যসামগ্রী উপহার দেওয়া হয়।
পরে ইউএনও মো. আবু তালেব বলেন, তিনি চাকরি জীবনের সুন্দর একটি দিন কাটিয়েছেন। তিনি শতবর্ষী মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের কাছ থেকে শতবর্ষ আগের গল্প শুনেছেন। রাম সিংয়ের সঙ্গেও তার দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছে। অন্য প্রবীণরাও জানিয়েছেন, রাম সিং তাদের সবার অনেক বড়।
ইউএনও বলেন, আরো যাচাই-বাছাই করে রাম সিংয়ের নাম গিনেস বুকে পাঠানোর জন্য তিনি কাজ করবেন।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জেলার সীমান্তবর্তী হরিণছড়া, মেকানীছড়া, বড় বিদ্যাবিল, ছোট বিদ্যাবিলসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০ জন শতবর্ষী প্রবীণ রয়েছেন।