Published : 15 Sep 2026, 05:29 PM
শিবিরের হয়ে ছাত্রদলে প্রবেশের চেষ্টা করার সন্দেহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে হল ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
সোমবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আসিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
আসিফের অভিযোগ, হলে সিট দেওয়ার কথা বলে হল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তার মোবাইল ফোন নিয়ে শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য খোঁজেন। পরে তাকে ‘শিবিরের স্পাই’ আখ্যা দিয়ে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ, হেনস্তা ও মারধর করা হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে হল ছাত্রদলের নেতারা বলছেন, আসিফ প্রায় তিন মাস ধরে অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছিলেন। হল প্রাধ্যক্ষ তাকে হল ছাড়ার কথা জানালে তিনি আর্থিক অস্বচ্ছলতার কথা উল্লেখ করে হল ছাত্রদলের সভাপতির সঙ্গে দেখা করতে চান। এ সময় তাকে কোনো ধরনের হেনস্তা বা মারধর করা হয়নি বলে দাবি তাদের।
হল ছাত্রদল দাবি করে, ওই শিক্ষার্থী এর আগে শাখা শিবিরের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ওয়েলফেয়ার ভবনে’ প্রায় সাত মাস অবস্থান করেছিলেন।
তিনি শিবিরের সভাপতির সঙ্গে ‘গোপনে যোগাযোগ’ করে নিজে থেকেই ছাত্রদলে যুক্ত হওয়ার আগ্রহের কথা জানান। একই সঙ্গে ‘গোপনে ছাত্রদলের বিভিন্ন তথ্য শিবিরকে দেওয়া’র কথাও হোয়াটস অ্যাপ বার্তায় শিবিরের সভাপতিকে জানান।
এদিকে আক্রান্ত মোহাম্মদ আসিফের দাবি, “পরিবারের পরিস্থিতির কারণে হলে একটি সিটের জন্য কয়েকবার প্রভোস্ট স্যারের কাছে অনুরোধ করেছি। পরে গণরুমে ফাঁকা সিটের বিষয়ে জানতে গেলে আমাকে ছাত্রদলের হল সভাপতি ফুয়াদ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
“তার সঙ্গে কথা বললে তিনি ছাত্রদল করতে হবে এবং ছাত্রদল করলেই সিট দেওয়া হবে বলে জানান। পরিবারের পরিস্থিতির কারণে আমিও সিটের আশায় ছাত্রদলের সঙ্গে প্রোগ্রাম করার বিষয়ে রাজি হই।”
তার ভাষ্য, “পরে রাতে তার (ফুয়াদ) কক্ষে গেলে একটি গ্রুপে যুক্ত করে দেওয়ার কথা বলে তিনি আমার মোবাইল ফোনটি হাতে নেন।
এরপর তার ফোনের বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে আমাকে ‘শিবিরের স্পাই’ হিসেবে হলে আসার অভিযোগ তোলেন।
“আমি বিষয়টি অস্বীকার করে সিটের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ করি। একপর্যায়ে তিনি আমাকে ধমক দেন এবং পরে ছাত্রদলের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে আসেন। তারা আমাকে টেনে গণরুমে নিয়ে যান এবং সেখানে আমাকে মারধর করা হয়।”
যা বলছেন ছাত্রদল নেতারা
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শামসুজ্জোহা হল ছাত্রদল সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদ বলেন, “পাশাপাশি এলাকার হওয়ায় আসিফ আমাকে জানায় যে, সে প্রায় তিন মাস ধরে অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছে। সে যেই সিটে অবস্থান করছিল সেই সিটটি নতুন করে অন্য একজনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। থাকার জায়গা না থাকায় কী করবে জানতে চাইলে আমি তাকে প্রভোস্ট স্যারের সঙ্গে কথা বলতে বলি।"
“এ সময় সে আমাকে বলে তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড বিএনপির এবং তাকে ছাত্রদলে নেওয়া হলে সে ছাত্রদল করবে। এরপর তাকে আমাদের হল ছাত্রদলের গ্রুপে যুক্ত করার জন্য তার ফোন হাতে নিই। তখন তার ফোনে হল শিবিরের সভাপতি রাফসানের সঙ্গে কথোপকথন দেখতে পাই। ওই কথোপকথনে দেখা যায়, তাদের দীর্ঘদিনের পরিচয় রয়েছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে।”
এ ছাত্রদল নেতার দাবি, “ওই হোয়াটস অ্যাপ বার্তায় রাফসান তাকে আমার সঙ্গে কথা বলার সময় রেকর্ড চালু রাখতে এবং প্রভোস্টের রুমে যাওয়ার আগে ও ভেতরে কথাবার্তা রেকর্ড করে তাদের দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এমন তথ্যও আমি দেখতে পাই। হলের সেকশন অফিসারের রুমে গিয়েও নজরদারি করার বিষয়ে তার ফোনে তথ্য পাওয়া যায়।”
মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে ফুয়াদ বলেন, “তাকে (আসিফ) কোনো ধরনের মারধর করা হয়নি। আমি মনে করি, আসিফকে ব্যবহার করে ছাত্রদলকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিবির তাকে একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শামসুজ্জোহা হলের মাধ্যমে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।”
শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “ওই ছেলে যখন হল সভাপতির রুমে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে, তখন হল ছাত্রদলের সভাপতি আমাকে ফোন করে জানতে চান, এখন কী করা উচিত। আমি তাকে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিই, কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন না ঘটে।
“পরবর্তীতে কোনো ধরনের হয়রানি বা অপ্রীতিকর আচরণ ছাড়াই তাকে হল প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।”
শিবিরের অবস্থান
এদিকে এ ঘটনায় মঙ্গলবার সকালে শিক্ষার্থীকে হয়রানি, হেনস্তা ও মারধরের প্রতিবাদ জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে দেখা করে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির।
এ সময় শিবিরের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হল- হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ, জড়িত ছাত্রদল নেতাদের শাস্তি নিশ্চিত, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিরাপত্তা প্রদান এবং সিট বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
ওই শিক্ষার্থীর শিবির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসান বলেন, “ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই। ওই ছেলে মূলত ছাত্রদলের সভাপতির সঙ্গে যেভাবে দেখা করেছে, ঠিক একইভাবে হল সংসদের ভিপি এবং হল শিবির সভাপতির সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে।”
শিবিরের ওয়েলফেয়ার ভবনে ওই শিক্ষার্থীর অবস্থানের বিষয়ে মেহেদী হাসান বলেন, “আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল প্রথম বর্ষের প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী আমাদের এখানে থাকে। তাদের সবাই শিবিরের রাজনীতি করেনা। আর ওই শিক্ষার্থী আমাদের এখানে ছিল বলে আমার জানা নেই।”
যা বলছে প্রশাসন
শহীদ শামসুজ্জোহা হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আল আমিন সরকার বলেন, “রাতে আমি বিষয়টি জানতে পেরে হলে উপস্থিত হই। এ সময় আমি বাইরে তাদের সঙ্গে কথা না বলে আমার অফিসে তাদের সবাইকে নিয়ে বসি। এ সময় ওই শিক্ষার্থী মারধর করা হয়েছে, এমন কিছু আমাকে জানায়নি। আমি জিজ্ঞেস করলে সে জানিয়েছে তার সঙ্গে এমন কিছু করা হয়নি।”
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ফোন বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে প্রাধ্যক্ষ বলেন, “ফোনে যেহেতু ওই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য আছে এবং অন্যরা ওর ফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করছিল তাই আমি ফোনটি আমার অফিসে রেখে দিয়েছি। এর বাইরে কিছু নয়।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, “আমরা শিক্ষার্থী ও প্রভোস্টের বক্তব্য শুনেছি। বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তবে এখনো সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর বক্তব্য শুনতে পারিনি। প্রকৃত ঘটনা জানতে তার বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
“ঘটনাটি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা হবে। যেহেতু ঘটনাটি অনেক রাতে ঘটেছে, তাই আসলে কী ঘটেছে, কী ঘটেনি-তা নিশ্চিতভাবে জানতে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা জরুরি। এরপর তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
আসিফ আরও বলেন, “পরে আমার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও ধারণ করা হয়। আমার কাছ দিয়ে বিভিন্ন কথা বলিয়ে ভিডিও করা হয়। এমনকি আমাকে দিয়ে লিখিয়েও নেওয়া হয় যে, আমি নাকি নেতা হতে চাই। এভাবে আমার কাছ থেকে একটি স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছে।”
“এ ঘটনার পর আমি এখন খুবই আতঙ্কের মধ্যে আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, আমার বিভাগ ও শিক্ষকদের কাছে সহযোগিতা চাই। আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং আমি যেন নিরাপদে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারি।”