০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

মৃত্যুর আগে নিজেই কফিন বানিয়ে রেখেছেন ৭৮ বছরের পূর্ণচন্দ্র ম্রো

বাবার তৈরি কফিন দেখে কখনো হাসি, কখনো ভাবনায় পড়ি, বলেন ছেলে মাংয়ং ম্রো।

মৃত্যুর আগে নিজেই কফিন বানিয়ে রেখেছেন ৭৮ বছরের পূর্ণচন্দ্র ম্রো
কদম কাঠ দিয়ে তৈরি করা কফিনাট রাখা আছে ঘরের এক পাশে।

বান্দরবান প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 Jul 2026, 09:06 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:25 PM

বান্দরবানের টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও টংকাবতী মৌজার হেডম্যান সাড়ে চার বছর আগেই নিজের শেষ যাত্রার প্রস্তুতি হিসেবে একটি কফিন তৈরি করে রেখেছেন।

কদম কাঠ দিয়ে তৈরি সেই কফিনটি এখন তার ঘরের এক পাশে যত্ন করে রাখা আছে।

পূর্ণচন্দ্র ম্রো ১৯৮৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ছয় মেয়াদে প্রায় ৩০ বছর টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। 

১৯৮৭ সালে তার বাবা রেংথম ম্রোর মৃত্যুর পর তিনি টংকাবতী মৌজার হেডম্যানের দায়িত্ব নেন। 

নিজের কফিন তৈরি করে রাখার বিষয়ে পূর্ণচন্দ্র ম্রো বলেন, “আর কতদিন? জীবনে যা পাওয়ার ছিল সবই পেয়েছি। এখন আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বুদ্ধের শিক্ষা অনুযায়ী কর্মফলে বিশ্বাস করি। মানুষ ভালো কাজ করলে ভালো ফল এবং খারাপ কাজ করলে খারাপ ফল ভোগ করবে। একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। তাই নিজের ইচ্ছায় সাড়ে চার বছর আগে কদম গাছের কাঠ দিয়ে নিজের কফিন তৈরি করে রেখেছি।”

টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও টংকাবতী মৌজার হেডম্যান ৭৮ বছর বয়সী পূর্ণচন্দ্র ম্রো।

টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও টংকাবতী মৌজার হেডম্যান ৭৮ বছর বয়সী পূর্ণচন্দ্র ম্রো।

তিনি বলেন, তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে এক ছোট বোন মারা গেছেন। তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।

জীবনে আর কোনো অপূর্ণ ইচ্ছা নেই বলেও জানান পূর্ণচন্দ্র ম্রো।

তার মেজো ছেলে মেনপুং ম্রো বলেন, “বাবা অনেক আগে থেকেই মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। নিজের ইচ্ছায় কদম কাঠ দিয়ে কফিন তৈরি করেছেন। আমরা তাকে বাধা দিইনি। বাধা দিলে হয়তো তিনি কষ্ট পেতেন।”

টংকাবতী ইউনিয়নের পূর্ণবাসন চাকমাপাড়ার কারবারি (গ্রামপ্রধান) আনন্দ মোহন চাকমা বলেন, “পূর্ণচন্দ্র ম্রো একজন সৎ, নীতিবান ও পরোপকারী মানুষ। দীর্ঘদিন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বর্তমানে হেডম্যান হিসেবেও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি সব সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং বিচার-সালিশে ন্যায়বিচার করার চেষ্টা করেন।”

বান্দরবান সদর উপজেলার টংকাবতি ইউনিয়নে এই পাড়ার নাম পূর্ণচন্দ্র ম্রো পাড়া। টিনের ছাউনি ঘরগুলো মাঝখানের বিল্ডিংটাই পূর্ণচন্দ্র ম্রোর বাড়ি।

বান্দরবান সদর উপজেলার টংকাবতি ইউনিয়নে এই পাড়ার নাম পূর্ণচন্দ্র ম্রো পাড়া। টিনের ছাউনি ঘরগুলো মাঝখানের বিল্ডিংটাই পূর্ণচন্দ্র ম্রোর বাড়ি।

পূর্ণচন্দ্র ম্রোর বড় ছেলে মাংয়ং ম্রো বর্তমানে টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। বাবার কফিন তৈরি করে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমার বাবা বাস্তববাদী মানুষ। তার কাছ থেকেই জীবনের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার শিক্ষা পেয়েছি। নিজের ইচ্ছায় তিনি কদম কাঠ দিয়ে কফিন তৈরি করে রেখেছেন। বাড়িতে কফিনটি দেখলে কখনো হাসি পায়, আবার কখনো ভাবনায় পড়ি। তবে আমরা বাবার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।”

ম্রো সোস্যাল কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি ও বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য খামলাই ম্রো বলেন, “এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। তবে ম্রো সমাজে এটি সামাজিকভাবে প্রচলিত কোনো রীতি নয়। এর আগেও কয়েকজন বয়স্ক ব্যক্তি নিজের মৃত্যুর আগে ঘরে কফিন তৈরি করে রেখেছেন।”