Published : 01 Sep 2025, 11:38 AM
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে কঠোর নজরদারিতেও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। কেউ প্রভাব খাটিয়ে, কেউ প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে, কেউ বাড়ি-ঘরের কাজের কথা বলে বালু উত্তোলন করে চলছেন, তা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন।
শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন ছড়া ও জমির মাটি কেটে তার নিচ থেকে দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বালু উত্তোলন করায় একদিকে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, পরিবেশের ক্ষতিসহ ছড়ার পাড়ে ভাঙন দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে সড়ক ও জনপদের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, উপজেলার ছড়াগুলোতে সিলিকা বালু উৎপন্ন হয়। প্রতিটি ছড়ার দৈর্ঘ্য ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার, কোনটা তারও বেশি।
এসব ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকায় নজরদারিতে রাখতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি মো. মহিবুল্লাহ আকন বলেন, উপজেলায় ৩১টি বালু মহাল রয়েছে। যেগুলো হলো- ভুরভুরিয়াছড়া, জৈনকাছড়া, খাইছড়া, জাগছড়া, সুমইছড়া, শাওনছড়া, নারায়ণছড়া, লংলিয়াছড়া, উদনাছড়া, বিলাসছড়া, ডিংডিংগাছগা, পুটিয়াছড়া, নলুয়াছড়া, হুগলিয়াছড়া, গান্ধিছড়া, আমরইলছড়া, আলীয়াছড়া, মাকড়ীছড়া, শুয়ারীছড়া, পাত্রীয়াছড়া, জৈতাছড়া, ইছামতিছড়া, বৌলাছড়া, বড় ছড়া, মুড়াছড়া, কালিছড়া, কলমছড়া, ফুলছড়া, গোপলাছড়া ও শিয়ালছড়া।
যার মধ্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে ছয়টি; সেগুলো হল- জৈনকাছড়া, জাগছড়া (পশ্চিম অংশ), সুমইছড়া, নারায়ণছড়া, বৌলাছড়া ও বড়ছড়া।
ইজারাবিহীন কোনো ঘাট থেকে বাণিজ্যিক কিংবা অবাণিজ্যিক কোনোভাবেই বালু উত্তোলন করা যাবে না বলে জানান তিনি।
এর মধ্যে শনিবার সন্ধ্যায় শ্রীমঙ্গল শহরের শান্তিবাগ এলাকায় ভুরভুরিয়া ছড়া থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ আসে শ্রীমঙ্গল পৌর বিএনপির আহ্বায়ক শামীম আহমদের বিরুদ্ধে।
দলীয় পদবির প্রভাব খাটিয়ে তিনি বালু উত্তোলন করছেন অভিযোগে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, খবর পেয়ে শান্তবাগ এলাকায় অভিযানে যায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেখানে শামীম আহমদ তার বাসার পাশে ছড়ার পাড় রক্ষার জন্য ছড়া থেকে বালু তুলে তা বস্তায় ভরছিলেন।
তবে এটিও করা যাবে না জানিয়ে স্থানীয় লোকজনদের ডেকে শামীম আহমদসহ সবাইকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করেছেন বলে জানান ইউএনও।
তিনি বলেন, “ইজারাবিহীন ঘাট থেকে কারোই বালু তোলার সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে প্রশাসনের কড়া নজরদারি রয়েছে। যারাই এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত হবেন তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।”
শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি মো. মহিবুল্লাহ আকন বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় শান্তিবাগ এলাকায় অভিযানে ১০০ ঘনফুট বালি জব্দ করা হয়। আর যিনি উঠাচ্ছিলেন তিনি ভবিষ্যতে আর কখনো বালু উত্তোলন করবেন না মর্মে মুচলেকা দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে শামীম আহমদের দাবি ব্যক্তিগত ব্যবহার বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তিনি বালু উত্তোলন করেননি।
তিনি বলেন, তার বাসা ছড়ার পাড়ে। পাহাড়ি ঢলে তার বাসা ও সংলগ্ন রাস্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই তিনি দুইজন শ্রমিক লাগিয়ে ছড়া থেকে বালু তুলে বস্তায় ভরে ছড়ার পাড়ে ও রাস্তায় দিয়েছিলেন।
বিএনপির এই নেতা বলেন, “আমি কখনো বালুর ব্যবসা করিনি, ভবিষ্যতেও এ ব্যবসা করার ইচ্ছা নাই।”
এভাবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রশাসনকে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হচ্ছে, এতে প্রশাসনিক অন্য কাজেও প্রভাব পড়ছে।
এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার মহিবুল্লাহ আকন বলেন, তিনি ভূমি অফিসে যোগদান করেছেন মাত্র এক সপ্তাহ, কিন্তু এর মধ্যে তিন দিনই বালুর অভিযানে বের হতে হয়েছে। শ্রীমঙ্গলের জন্য এটি একটি বড় সমস্যা।
তিনি বলেন, গত ২৭ অগাস্ট অভিযান চালিয়ে ইজারাকৃত গোপলা ছড়ায় ব্রিজের পাশ থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়। ২৬ অগাস্ট উপজেলার রঘুনাথপুর কালীবাড়ি এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযানে ৫০০ ঘনফুট বালি জব্দ করা হয়।
ওইদিন বিকালে উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের সিক্কা ও ডোবাগাও এলাকায় আরো দুটি অবৈধ ঘাটে অভিযান করেন তারা। এ সময় বালুসহ অবৈধ উত্তোলনকারীরা পালিয়ে যায়।
উভয় এলাকায় বাঁশের গড় দিয়ে অবৈধ ঘাটগুলো বন্ধ করে আসেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।
শ্রীমঙ্গলের ইউএনও ইসলাম উদ্দিন বলেন, ইজারা নিয়ে নিয়ম মেনে বালু উত্তোলন করার সরকারি নিয়ম রয়েছে। শ্রীমঙ্গলের সবগুলো ছড়া যদি বৈধ ইজারার আওতায় আসে তবে এ প্রক্রিয়া কমে যাবে।
তিনি বলেন, বিগত এক বছরে ১৬টি নিয়মিত মামলা, সাতটি মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে প্রচুর পরিমাণে বালু ও যানবাহন জব্দ করা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে। জব্দ করা বালু এর মধ্যে তিনবার নিলাম করা হয়েছে; যার পরিমাণ ৭১ হাজার ২৮৫ ফুট।
তিনি বলেন, জনগণের সচেতন হওয়া ছাড়া ছড়াগুলি রক্ষা করা কষ্টকর। তবে কষ্ট হলেও আমরা অভিযান অব্যাহত রাখবো। যারাই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।