Published : 04 Apr 2026, 04:40 PM
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার চারটি গ্রামের সশস্ত্র লোকজন আইন উপেক্ষা করে ডাকুয়ার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ কেটে দিয়েছে। এতে ডাকুয়ার হাওরে পানি ঢুকে সেখানকার বোরো ধান ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে।
শনিবার সকালে মোহনপুর ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সভা চলাকালেই ছনুয়ার হাওর পাড়ের লোকজন ডাকুয়ার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধটি কেটে দেয়। বাধা দিতে গেলে দুপক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়।

এতে অন্তত ২০ জন আহত হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ওই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন।
বিকালে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাব-স্টেশন (এসও) খায়রুল আলম বলেন, তিনি ডাকুয়ার হাওরের এলাকা পরিদর্শন করে এসেছেন।
“ডাকুয়ার হাওর সাদা (পানি ভর্তি) হয়ে যাচ্ছে। এখন যদি দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও বাঁধ রক্ষা করা না হয় তাহলে এই হাওর ডুবে যাবে। ফসল তলিয়ে যাবে।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘ডাকুয়া’ ও ‘ছনুয়া’ পাশাপাশি দুই হাওর। ছনুয়ার হাওরের পাড়ে রয়েছে নোয়াগাঁও, গোলেরগাঁও, কান্দাগাঁও ও উলুতুলু গ্রাম। আর ডাকুয়ার হাওরের পারে রয়েছে মোহনপুর, শান্তিপুর, সরদারপুর, শাখাইতি ও হোসেননগর। তবে শাখাইতি ও হোসেননগর তুলনামূলক উজানে। হাওরে পানি ঢুকলে সবশেষে যাবে এ দুটি গ্রামের লোকজনের বোরো ধান।
ছানুয়া হাওর তুলনামূলক উপরে। সেখানকার পানি ডাকুয়ার হাওরের ভেতর দিয়ে যায়। তবে ডাকুয়ার হাওরে জমি বেশি; ৪১০ হেক্টরের মত। আর ছনুয়ার হাওরে ধানি জমির পরিমাণ ৩২০ একর। দুই হাওরের ধান সব ‘ছড়া’ ছাড়তে শুরু করেছে। কয়েকদিন আগে শিলাবৃষ্টি হলেও ফসলের খুব ক্ষতি হয়নি। কিন্তু টানা ও ভারি বৃষ্টির পানি জমছে হাওরে-হাওরে।
এর মধ্যেই শুক্রবার রাতে ছনুয়ার হাওরের পাড়ের চার গ্রামের লোকজন পানি সরিয়ে নিজেদের ফসল বাঁচাতে ডাকুয়ার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ কেটে ফেলার উদ্যোগ নেয়। বিষয়টি জানতে পেরে ডাকুয়ার হাওর পাড়ের লোকজন জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও পাউবোর শরণাপন্ন হয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার সকালে মোহনপুর, নোয়াগাঁও, গোলেরগাঁও, কান্দাগাঁও ও উলুতুল গ্রামের লোকজনকে নিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জিত কুমার চন্দ বাঁধ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে জরুরি সভা করেন। তিনি বিষয়টি সমাধানের জন্য একটি কমিটি গঠন করে দেন।

মোহনপুর গ্রামের লোকজনের অভিযোগ, সভা চলাকালেই নোওয়াগাঁও এলাকার মছব্বির মেম্বারের নির্দেশে ছনুয়ার হাওর পাড়ের পাঁচ শতাধিক সশস্ত্র লোকজন জোরপূর্বক বাঁধ কেটে দেন। তারা আগে থেকেই রামদা, সুলফি, গুলতি মার্বেল, পাথরসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাঁধে জড়ো হয়েছিল।
বাঁধ কাটতে মোহনপুর গ্রামের লোকজন বাধা দিলে তাদের উপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে মোহনপুর গ্রামের আলী, আফিজ, সুকুর আলী, আজিজুল, জাহাঙ্গীরসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। আহতরা সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বৈঠকে উপস্থিত মোহনপুর গ্রামের ইউপি সদস্য নূরুল আমিন বলেন, “আমাদের গ্রামের লোকজন বাঁধ কাটতে বাধা দেওয়ায় তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে। আমাদের ১০-১২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
“আমরা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। কিন্তু চার গ্রামের লোকজন সন্ত্রাসী স্টাইলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসে বাঁধ কেটে দিয়েছে।”
বৈঠকে উপস্থিত ছনুয়ার হাওর পাড়ের চার গ্রামের পক্ষের আব্দুল মুছাব্বির মেম্বার বলেন, “বাঁধ কারা কেটেছে আমি জানি না। প্রশাসন একটি কমিটি করে দিয়েছে।”
পাউবোর এসও খায়রুল আলম বলেন, “ছনুয়ার হাওরের কৃষকরা জোর করে ডাকুয়ার হাওরের বাঁধ কেটে দিতে চাইলে ডাকুয়ার হাওরের কৃষকরা প্রশাসনের শরণাপন্ন হন।
“সকালে দুই এলাকার কৃষকদের নিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জরুরি সভা করে একটি কমিটি করে দেন। কমিটি রোববার ঘটনাস্থলে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।
তিনি বলেন, “এর আগেই বৈঠক চলাকালে নোয়াগাঁও, গোলেরগাঁও, কান্দাগাঁও ও উলুতুল গ্রামের সশস্ত্র কৃষকরা আইন অমান্য করে বাঁধ কেটে দিয়েছেন। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্চিত কুমার চন্দ বলেন, “এক পক্ষ প্রশাসনের সিদ্ধান্ত না মেনে জোরপূর্বক বাঁধ কেটে দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।”