Published : 25 May 2026, 06:59 PM
কোরবানির ঈদ উপলক্ষে পশুর চামড়া সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য সাভারের চামড়া শিল্প নগরীর প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এবার সারাদেশে কোরবানি করা পশুর ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সাভারে আসবে এমনটাই ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারখানাগুলোতে মজুত রাখা হয়েছে লবণসহ নানা রাসায়নিক দ্রব্য। এ ছাড়া প্রস্তুত রয়েছেন অতিরিক্ত কর্মী।
পরিবেশ দূষণ রোধ এবং শতভাগ কাঁচা চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে এবার ট্যানারি মালিক ও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন-বিসিক যৌথভাবে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিসিক ও ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার আগেভাগেই সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা সিইটিপির সংস্কার কাজ শেষ করা হয়েছে।
সোমবার সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা এলাকার চামড়া শিল্প নগরী ঘুরে দেখা গেছে, বিসিক এলাকায় জমে থাকা বিভিন্ন আবর্জনা সরিয়ে ফেলা হচ্ছে, পরিষ্কার করা হচ্ছে পানি নিষ্কাশনের নর্দমা।
এ ছাড়া অতিরিক্ত বর্জ্য ধারণের জন্য রাখা হয়েছে নির্দিষ্ট স্থান। বৈদ্যুতিক ত্রুটি আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
বিসিক চামড়া শিল্প নগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ান বলেন, “আমরা চামড়া সংগ্রহের জন্য ট্যানারিকে শতভাগ প্রস্তুত করেছি। চামড়া প্রক্রিয়াজাতের সময় ঈদের পর থেকে টানা তিন মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
“ঈদের দিন এবং এর পরবর্তী কয়েকদিন এখানে চামড়াবাহী ট্রাক যানজটে পড়ে যাতে চামড়া নষ্ট না হয় সেজন্য ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্সের মাধ্যমে চামড়া শিল্প নগরী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “সারাদেশে এক কোটি দুই লাখ কোরবানিযোগ্য পশু নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ ভাগ কম ধরে ৯০ লাখের কম-বেশি পশু কোরবানি হবে। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হিসাবে ৫৫ থেকে ৬৫ লাখ চামড়া ট্যানারিতে প্রবেশ করবে বলে আমরা আশা প্রকাশ করছি। গত বছর ৪৫ থেকে ৫০ লাখ পিস চামড়া ট্যানারিতে প্রবেশ করেছিল।”
সাভার চামড়া শিল্প নগরীর ২০৫টি প্লটের মধ্যে ১৬২টি ট্যানারি রয়েছে। এরমধ্যে ১৫৫ থেকে ১৫৬টি কারখানা চামড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
এ বি এস ট্যানারির মালিক ইমাম হোসেন বলেন, “বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ট্যানারি মালিকরা চামড়া ক্রয় করবেন। তবে বিদ্যুৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। এবার অত্যধিক গরম, চামড়া সংরক্ষণেও নিতে হবে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
তাই পশু কোরবানির পরপরই চামড়ায় নিজ উদ্যোগে লবণ ছিটাতে সবাইকে অনুরোধ করেন তিনি। তা নাহলে চামড়ার গুণগত মান ঠিক থাকা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থাকবে।
আইয়ুব ব্রাদার্স ট্যানারির দেখভালের দায়িত্বে থাকা মো. আইয়ুব বলেন, “চামড়া সংরক্ষণের জন্য আমরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। পর্যাপ্ত লবণ, কেমিকেল সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের সংশয় রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না পেলে বেশিরভাগ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শাখাওয়াত উল্ল্যাহ বলেন, “এবার চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক কোটি পিস। বারবার সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে, দেশের সম্পদ বিবেচনা করে চামড়া কেনার পরপরই যেন লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয় এবং যত দ্রুত সম্ভব সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চামড়াগুলো ট্যানারিতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা।”
ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, “এখানের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপির সক্ষমতা বাড়াতে আমরা গত কয়েক মাস ধরে ব্যাপক সংস্কার কাজ করেছি। বিগত বছরের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে এবার আগেভাগেই এয়ার ব্লোয়ার এবং ইকুলাইজেশন ট্যাংকগুলো সচল করা হয়েছে। তরল বর্জ্যের পাশাপাশি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা বিশেষ জোর দিয়েছি। ক্রোম শেভিং ডাস্ট এবং র ট্রিমিংসের মত কঠিন বর্জ্যগুলো এখন আর পরিবেশে মিশছে না। এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে বাই-প্রোডাক্ট বা উপজাত তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা সিইটিপির জন্য প্রয়োজনীয় কেমিকেল মজুদ করেছি।”
সলিড ওয়েস্টেজের জন্য দুটি পুকুর খনন করা হয়েছে বলেও জানান গোলাম শাহনেওয়াজ।
চামড়া সংগ্রহকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, চামড়ার গুণগত মান ঠিক রাখতে পশু কোরবানির ছয় থেকে সাত ঘণ্টার মধ্যেই চামড়ার রক্ত মাংস পরিষ্কার করে লবণ প্রয়োগ করতে হবে। এভাবে করলে তিন মাস পর্যন্ত চামড়া সংগ্রহে রাখা সম্ভব।
রাজধানীর হাজারীবাগের স্বাস্থ্যঝুঁকি, বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধ ও চামড়া শিল্পের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৩ সালে ‘বিসিক চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকা’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার।
সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে প্রায় ২০০ একর জমিতে এই ট্যানারি গড়ে তোলা হয়। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করে সাভারে আনা হয়।