২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

কানাডায় বাংলাদেশি নারীকে নিপীড়ন: দুই রেস্তোরাঁ মালিকের কারাদণ্ড

আইনসভার এক সদস্য ওই রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে গিয়ে নারীটির অবস্থা দেখে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

কানাডায় বাংলাদেশি নারীকে নিপীড়ন: দুই রেস্তোরাঁ মালিকের কারাদণ্ড

সোহেল হায়দার (বামে) ও মোহাম্মদ মাসুম, সাসকাটুন প্রভিন্সিয়াল কোর্টের সামনে পার্কিংয়ের ফি পরিশোধ করছেন। ছবি: সিবিসি নিউজ।

প্রবাস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Oct 2026, 12:59 PM

Updated : 26 Oct 2026, 12:59 PM

কানাডার সাসকাচোয়ান প্রদেশে বাংলাদেশি এক নারীকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধভাবে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের দায়ে বাংলাদেশি দুই রেস্তোরাঁ পরিচালককে কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত।

বৃহস্পতিবার স্যাসকাটুন প্রাদেশিক আদালতের বিচারক মিগুয়েল মার্টিনেজ এই রায় ঘোষণা করেন। দেশটির জাতীয় সংবাদসংস্থা ‘কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন’ (সিবিসি) ও বেসরকারি চ্যানেল ‘সিটিভি নিউজ’ এ সংবাদ প্রকাশ করেছে।

ভুক্তভোগী নারীর সুরক্ষায় তার পরিচয় প্রকাশে দেশটির আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর দণ্ডপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তি হলেন- মোহাম্মদ মাসুম (৪৫) ও সোহেল হায়দার (৫৬)।

আদালত মাসুমকে মানব পাচারের পাশাপাশি তিন দফায় নিপীড়নের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মোট ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেন। অন্য আসামি সোহেল হায়দারকে মানব পাচারের দায়ে কানাডার আইন অনুযায়ী সর্বনিম্ন ৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

একইসঙ্গে ভুক্তভোগী নারীর বকেয়া মজুরি বাবদ সোহেল হায়দারকে ৫ হাজার ৮৮৫ দশমিক ১৬ কানাডিয়ান ডলার এবং মাসুমকে ১২ হাজার ২৬৮ কানাডিয়ান ডলার ক্ষতিপূরণ বা ‘রেস্টিটিউশন’ হিসেবে পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।

মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৩ সালের মার্চ মাসের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী নারী প্রাথমিকভাবে ভ্রমণ ভিসায় কানাডার টরন্টোতে আসেন। পরবর্তীতে অস্থায়ী বিদেশি কর্মী হিসেবে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে কাজ খুঁজতে শুরু করেন।

একপর্যায়ে তিনি সোহেল হায়দারের মাধ্যমে গুল লেক এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় কাজে যোগ দেন। সেখানে তাকে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া এবং মাসে ১ হাজার ডলার দেওয়ার কথা থাকলেও সঠিক কাজের অনুমতিপত্র (ওয়ার্ক পারমিট) ছাড়াই সপ্তাহে ছয় দিন দীর্ঘ সময় কাজ করানো হয় এবং কোনো বেতন দেওয়া হয়নি।

পরবর্তীতে ২০২২ সালের নভেম্বরে সোহেল হায়দার ওই নারীকে টিসডেল এলাকায় তার বন্ধু মোহাম্মদ মাসুমের রেস্তোরাঁয় পাঠান। সেখানেও তিনি একই চুক্তিতে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করতে বাধ্য হন। কাজের একমাত্র ছুটির দিনেও তাকে মাসুমের সঙ্গে কেনাকাটার জন্য স্যাসকাটুনে যেতে হতো।

বিচারিক শুনানিতে জানা যায়, মাসুম ভুক্তভোগী নারীর পাসপোর্ট আটকে রেখেছিলেন এবং তা ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে তাকে মোট আটবার যৌন নিপীড়ন করেন।

সিবিসি ও সিটিভি নিউজের প্রতিবেদনা বলা হয়, এ অবস্থার মধ্যে সাইপ্রাস হিলস এলাকার আইনসভার সদস্য (এমএলএ) ডাগ স্টিল ওই রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে গিয়ে নারীটির অবস্থা দেখে সন্দেহ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি তৎকালীন স্থানীয় এমএলএ হিউ নার্লিয়েনকে বিষয়টি জানান।

নার্লিয়েন ছদ্মবেশে রেস্তোরাঁয় গিয়ে ওই নারীর হাতে একটি কাগজ প্যাঁচিয়ে সামাজিক সেবা কর্মকর্তার (সোশ্যাল ওয়ার্কার) যোগাযোগ নম্বর পৌঁছে দেন। তারপর ওই সোশ্যাল ওয়ার্কার ও জনপ্রতিনিধিদের পরিকল্পনায় ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ এলরোজ এলাকা থেকে ভুক্তভোগী নারীকে উদ্ধার করা হয়।

দীর্ঘ ১৮ মাস জুড়ে প্রায় সাত সপ্তাহের শুনানি শেষে আদালত অভিযুক্ত দুজনকেই দোষী সাব্যস্ত করেন। সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে বিচারক মিগুয়েল মার্টিনেজ জানান, আসামিরা ভুক্তভোগী নারীর অসহায়ত্ব ও কানাডায় থাকার আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। কাজ বাতিল বা দেশে ফেরত পাঠানোর ভয় দেখিয়ে তারা ওই নারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেন।

তবে আদালতে আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে জানান যে, “ওই নারী তাদের রেস্তোরাঁয় কখনো কাজ করেননি”। তবে বিচারক তাদের এই বক্তব্যকে ‘অবিশ্বাস্য ও এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে বাতিল করে দেন। আদালতে পেশ করা ভুক্তভোগী নারীর ইমপ্যাক্ট স্টেটমেন্টে (আদালতে জমা দেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জবানবন্দি) তিনি উল্লেখ করেন, “এই ঘটনা তার স্বপ্ন, সম্মান, ক্যারিয়ার এবং পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে”।