সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা: আরেক প্রবাসীর যাবজ্জীবন
আলোচিত এ ঘটনার সূত্রপাত গত ৭ জুন।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসে পূর্ববিরোধের জেরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শাহরুয়ার আহমেদ ইমনকে (২২) হত্যার দায়ে একই বয়সি আরেক বাংলাদেশি প্রবাসী শাহিন বাবুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন লারনাকা জেলা আদালত।
দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শেষে লারনাকা জেলা আদালতের বিচারক প্যানেল মঙ্গলবার এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের আদেশে আসামির বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যা, ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে অপহরণ, অপহৃত ব্যক্তির পরিবারকে হুমকি দিয়ে মুক্তিপণ দাবি, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং সাইপ্রাসে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অবস্থানের মতো একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে এ সাজা দেওয়া হয়।
দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসের ইংরেজি দৈনিক ‘সাইপ্রাসমেইল’ ও লারনাকা জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত শাহরুয়ার আহমেদ ইমন বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়নের লোচনপুর গ্রামের গ্রিসপ্রবাসী নাসির উদ্দিনের সন্তান। তিন ভাইয়ের মধ্যে ইমন সবার বড় ছিলেন।
ঘটনার মাত্র চার মাস আগে উচ্চশিক্ষার স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে তিনি সাইপ্রাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন এবং লারনাকা জেলার ওরেক্লিনি এলাকায় একটি বাসায় থেকে স্থানীয় এক কারখানায় খণ্ডকালীন কাজ করছিলেন। অপরদিকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি শাহিন বাবু তুরস্ক-নিয়ন্ত্রিত উত্তর সাইপ্রাস থেকে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে গ্রিক-সাইপ্রাস অংশে প্রবেশ করে বসবাস করে আসছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ৭ জুন। স্থানীয় এক বাসে ভ্রমণের সময় ইমনের সঙ্গে শাহিনের প্রথম পরিচয় ও কথাবার্তা হয়। ভ্রমণকালে শাহিন তার মোবাইলের ওয়াই-ফাই হটস্পট ব্যবহারের জন্য ইমনের কাছে এক্সেস চান। কিন্তু ইমন তা শেয়ার করতে অস্বীকৃতি জানান এবং এতে দুজনের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়।
বাসের যাত্রীদের সামনে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইমনের ওপর ক্ষোভ জন্মায় শাহিনের। পরবর্তীতে তিনি ইমনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। প্রতিশোধের অংশ হিসেবে ৯ জুন স্থানীয় এক সুপারমার্কেট থেকে একটি ধারালো ছুরি কেনেন শাহিন।
তারপর ১১ জুন কৌশলে ইমনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে প্রতিদিন ৫০ ইউরো মজুরিতে কোফিনু এলাকার একটি কারখানায় খণ্ডকালীন চাকরির প্রলোভন দেখান। কাজের আশায় ১২ জুন ওরেক্লিনির বাসা থেকে বাসে চড়ে কোফিনু এলাকায় গিয়ে শাহিনের সঙ্গে দেখা করেন ইমন।
সাইপ্রাস পুলিশের আদালতে পেশ করা তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শাহিন সরল বিশ্বাসে আসা ইমনকে কোফিনুর একটি কসাইখানার পাশের এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে নির্জনতার সুযোগ নিয়ে শাহিন তার কাছে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে ইমনের ওপর হামলা চালান এবং শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাত করেন।
আহত অবস্থায় ইমন মাটিতে পড়ে গেলে শাহিন তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পর আলামত গোপনের উদ্দেশ্যে লাশের ওপর খড় ও মাটিচাপা দিয়ে ঢেকে রেখে ইমনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিমকার্ড ও ব্যক্তিগত সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন শাহিন।
হত্যার অপরাধ ঢাকতে ও অর্থ হাতিয়ে নিতে আসামি শাহিন বাবু অপহরণের নাটক সাজান। নিহত ইমনের মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড ব্যবহার করে তার গ্রিসপ্রবাসী বাবা নাসির উদ্দিনের মোবাইল নম্বরে বার্তা পাঠানো শুরু হয়। বার্তায় দাবি করা হয় যে ইমনকে অজ্ঞাত স্থানে অপহরণ করে রাখা হয়েছে এবং তাকে জীবিত ফিরে পেতে হলে ৩৫ হাজার ইউরো (প্রায় ৪৫ লাখ টাকা) মুক্তিপণ দিতে হবে।
একই সঙ্গে হুমকি দেওয়া হয় যে, নির্ধারিত রোববারের মধ্যে এ অর্থ পরিশোধ না করা হলে অপহৃত ইমনের কিডনি কেটে বিক্রি করে দেওয়া হবে এবং তাকে হত্যা করা হবে। ছেলের প্রাণ বাঁচাতে আতঙ্কিত বাবা নাসির উদ্দিন অপহৃত ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বা তাকে সরাসরি দেখার আকুতি জানালে ঘাতক শাহিন মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে দেন।
ছেলের আর কোনো সন্ধান না পেয়ে এবং বারবার মোবাইল বন্ধ পেয়ে ইমনের পরিবার সাইপ্রাস আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গ্রিস কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়। ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্তে নামে লারনাকা জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ। ইলেকট্রনিক মনিটরিং ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তারা ইমনের মোবাইল সিগন্যাল ট্র্যাক করে দেখতে পান যে তার শেষ অবস্থান ছিল কোফিনু এলাকায়।
পুলিশ এরপর স্থানীয় সিসিটিভি ফুটেজ, বাস রুট ও পরিবহন ট্র্যাকিং বিশ্লেষণ করে সন্দেহের ভিত্তিতে শাহিন বাবুকে গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়। এসময় তল্লাশিতে দুটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়, যার একটি ছিল নিহত ইমনের এবং তাতে ইমনের ব্যবহৃত সিমকার্ডটি সক্রিয় অবস্থায় ছিল।
পুলিশি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে আসামি শাহিন বাবু নিজের অপরাধ স্বীকার করেন এবং হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ দেন। তার সরাসরি স্বীকারোক্তি ও নির্দেশনায় কোফিনুর জঙ্গলঘেরা এলাকা থেকে লারনাকা পুলিশের ফরেনসিক দল ইমনের পচনধরা লাশ উদ্ধার করে।
একই সঙ্গে ঘটনাস্থলের কাছের স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরি এবং নিহত শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে আদালতে রিমান্ড ও শুনানিকালে আসামি নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিলে লারনাকা জেলা আদালত সমস্ত ডিজিটাল প্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার করা আলামত ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের মতো সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে শাহিন বাবুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
পুরনো খবর
সাইপ্রাসে ৬ দিন ধরে ‘নিখোঁজ’ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ
