১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বুকিত বিনতাং: ১০১ বছরের কারাগার থেকে আধুনিক শহর

তারও আগে জায়গাটি ছিল চীনা কবরস্থান এবং গহিন বনজঙ্গল।

বুকিত বিনতাং: ১০১ বছরের কারাগার থেকে আধুনিক শহর
জাপানি কোম্পানির হাতে গড়ে উঠেছে অপরূপ সিটি— লালাপোর্ট বুকিত বিনতাং সিটি সেন্টার (বিবিসিসি), ছবি: লেখক।

রফিক আহমদ খান রফিক আহমদ খান

মালয়েশিয়া থেকে

Published : 12 Aug 2026, 01:52 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

কুয়ালালামপুরের ‘বুকিত বিনতাং’ এলাকাটি প্রায় সবারই চেনা; বিশেষ করে যারা অন্তত একবার মালয়েশিয়ার এই জাদুকরী নগরী ভ্রমণ করেছেন। বুকিত বিনতাং হলো আলোকোজ্জ্বল এক প্রাণবন্ত নগর-ভ্রমণস্পট, যেখানে বছরজুড়েই রাতদিন লোকারণ্য থাকে। সেই বুকিত বিনতাংয়ের কাছাকাছি জাপানি কোম্পানির গড়ে তোলা এক আধুনিক ও চোখধাঁধানো ছোট্ট সিটির নাম— বুকিত বিনতাং সিটি সেন্টার (বিবিসিসি)। 

তবে আজ যেখানে সেন্টার সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, একসময় ঠিক সেখানেই ছিল মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় কারাগার। পেছনের ইতিহাসে তাকালে জানা যায়, কারাগার নির্মাণের অনেক আগে জায়গাটি ছিল মূলত একটি চীনা কবরস্থান এবং গহিন বনজঙ্গল। সেই ঘন জঙ্গলে ছিল মালয় বাঘের অবাধ বিচরণ; মানুষ স্বচক্ষে সেখানে বাঘ দেখেছে। পরবর্তীতে কারাগার নির্মাণের জন্য কবরস্থানের দেহাবশেষ তুলে অন্যত্রে স্থানান্তরিত করা হয়। 

ওই সময়ে সেলাঙ্গর প্রদেশ তথা কুয়ালালামপুরের প্রধানতম বাণিজ্যিক এলাকা ছিল বাঙ্গুনান আবদুস সামাদ ও এর আশপাশের অঞ্চল। বাণিজ্যিক এলাকার কাছাকাছি হওয়ায় বাঘের সেই জঙ্গলেই ১৮৯৫ সালে কারাগারটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সাজাপ্রাপ্ত সব অপরাধীদের রাখা হতো এই জেলখানায়। এখানে ছিল ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রাখার কনডেম সেল। বেশ কয়েকজন ‘কুখ্যাত’ আসামির ফাঁসিও এখানেই কার্যকর হয়েছিল; এমনকি এক সময়ের সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসীর ফাঁসির মঞ্চও ছিল এই জেলখানা। এটি ছিল কুয়ালালামপুরের একমাত্র কারাগার, যা ‘পুডু জেল’ বা ‘পিনজারা পুডু’ নামে পরিচিতি পায়। মালয় শব্দ ‘পিনজারা’ অর্থ জেলখানা, আর ‘পুডু’ হলো ওই এলাকার নাম।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৮৯১ থেকে ১৮৯৫ সালের মধ্যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার পর্যায়ক্রমে এটি নির্মাণ করে। জালান শ (বর্তমানে জালান হাংতুয়া) বরাবর অবস্থিত এই কারাগারের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৮৯১ সালে, যেখানে দণ্ডিত কয়েদিরাই শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছিলেন। কাজ শেষ হওয়ার পর ১৮৯৫ সালের মে মাসে কুয়ালালামপুরের অন্যান্য ছোট কারাগার থেকে প্রায় ৫০০ বন্দিকে এখানে স্থানান্তরিত করা হয়। 

পুডু কারাগারের প্রথম গভর্নর ছিলেন লেফটেন্যান্ট-কর্নেল জে.এ.বি. এলেন। সেসময় কুয়ালালামপুর স্বাধীন মালয়েশিয়ার রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি; ছিল সেলাঙ্গর প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত একটি এলাকা। পুডু কারাগার ছিল সেলাঙ্গরের একমাত্র কারাগার, যেখানে স্বল্পমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত পুরুষ ও মহিলা কয়েদিদের রাখা হতো। মজার ব্যাপার হলো, কারাগারটি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রাচীরের ভেতরেই বিশাল সবজি বাগান ছিল, যেখান থেকে প্রতি বছর কয়েদিদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করা হতো।

বুকিত বিনতাং সিটি সেন্টার অনন্য রূপে সেজে উঠেছে। কে বলবে, এই একই জায়গায় একসময় বন্দিদের আর্তনাদ শোনা যেত! ছবি: লেখক।

বুকিত বিনতাং সিটি সেন্টার অনন্য রূপে সেজে উঠেছে। কে বলবে, এই একই জায়গায় একসময় বন্দিদের আর্তনাদ শোনা যেত!

সময়ের পরিক্রমায় এই কারাগারে মাদক পাচারকারী এবং খুনিদের মতো অপরাধীদেরও রাখা শুরু হয়। ব্লক ডি-এর একটি বিশেষ কক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো। এছাড়া কারাগার চত্বরের একটি নির্দিষ্ট প্রাঙ্গণে বেত দিয়ে চাবুক মারার মাধ্যমে শারীরিক শাস্তিও কার্যকর করার নিয়ম ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জাপানিরা এই কারাগারটিকে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য যুদ্ধবন্দি (পিওডব্লিউ) শিবির হিসেবে ব্যবহার করে। ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি সময়ে এখানে এক হাজারের বেশি যুদ্ধবন্দিকে রাখা হয়। পরে বেশিরভাগ বন্দিকে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি কারাগারে স্থানান্তর করা হয় (তখন সিঙ্গাপুর আলাদা কোনো দেশ ছিল না)। 

কারাগারটির ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা ঘটে ১৯৮৬ সালে। জিমি চুয়া চাপ সেং নামের একজন বন্দির নেতৃত্বে একদল কয়েদি ছয় দিন ধরে কারাগারের দুজন কর্মীকে জিম্মি করে রাখে। শেষ পর্যন্ত মালয়েশীয় পুলিশ সফল অভিযান চালিয়ে কোনো হতাহত ছাড়াই জিম্মিদের উদ্ধার করে। পরবর্তীতে অন্য একটি অপরাধের জন্য চুয়াকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং বাকিদের অন্যায়ভাবে আটক ও অপহরণের জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর মালয়েশিয়া সরকার কুয়ালালামপুরকে দেশের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সুযোগ্য নেতৃত্বে মালয়েশিয়া দ্রুত উন্নতির পথে এগোতে থাকে। কুয়ালালামপুর রূপান্তরিত হতে থাকে গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক শহরে। ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটনসহ নানা কারণে পুডুর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কারাগারটির অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। বুকিত বিনতাং-এর মতো দ্রুত বর্ধনশীল বাণিজ্যিক এলাকার কাছাকাছি কারাগারটির অবস্থানের কারণে নিরাপত্তা বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। 

তাছাড়া, শতবর্ষী এই কারাগারের নকশা এবং সুযোগ-সুবিধাগুলোও একেবারেই সেকেলে হয়ে পড়েছিল। অবশেষে দীর্ঘ ১০১ বছর অপরাধীদের বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর, ১৯৯৬ সালে পুডু কারাগার আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বন্দিদের কুয়ালালামপুরের কাছেই সুঙ্গাই বুলোহ ও কাজাং কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। ২০০৯ সাল পর্যন্ত এটি আদালতের শুনানিতে অংশ নেওয়া বন্দিদের জন্য দিবা-আবাসন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মাঝে ১৯৯৭ সালে অল্প সময়ের জন্য একে কারা-জাদুঘর হিসেবেও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল।

সিটি সেন্টারে লেখক।

সিটি সেন্টারে লেখক।

২০০৯ সালের জুনে মালয়েশীয় সরকার পর্যায়ক্রমে কারাগার কমপ্লেক্সটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন বুকিত বিনতাং-এর সংসদ সদস্য ফং কুই লুন প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন ভবনটিকে মালয়েশিয়ার ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না? উত্তরে তৎকালীন উপ-অর্থমন্ত্রী আওয়াং আদেক হুসেন সাফ জানিয়েছিলেন, “আমাদের মতে, এটি গর্ব করার মতো কিছু নয়।” সেই বছরের অক্টোবরে কারাগারের হাসপাতাল ও ফাঁসির কক্ষটি প্রথম ভেঙে ফেলা হয়। ২০১০ সালের জুনে রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্পের জন্য পূর্ব দিকের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয় এবং ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ভেতরের সমস্ত ভবন সম্পূর্ণরূপে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে সংরক্ষণবিদ এবং সাধারণ জনগণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বাইরের দেয়ালের একটি অংশ ও প্রধান ফটকটি টিকিয়ে রাখতে সম্মত হয়। বুকিত বিনতাং সিটি সেন্টারে এখন পুডু জেলখানার একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সেই প্রধান ফটকটিই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

অবশেষে ২০২২ সালে সেই ঐতিহাসিক স্থানেই চালু হয় ‘বুকিত বিনতাং সিটি সেন্টার’। চাকচিক্যময় কুয়ালালামপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে যেন জন্ম নিয়েছে আরেকটি মিনি শহর। একসময়ের বাঘে ভরা জঙ্গল আর ফাঁসির মঞ্চের অন্ধকার তাড়িয়ে জায়গাটি আজ পরিণত হয়েছে আলোর এক নতুন জগতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে কারাগার জাপানিরা ব্যবহার করেছিল যুদ্ধবন্দিদের শিবির হিসেবে, সেখানেই আজ জাপানি কোম্পানির হাতে গড়ে উঠেছে অপরূপ সিটি— লালাপোর্ট বুকিত বিনতাং সিটি সেন্টার (বিবিসিসি)। 

আজ নাগরিক জীবনের এমন কোনো অনুষঙ্গ নেই, যা লালাপোর্টে নেই। স্তরে স্তরে সাজানো এই সিটি সেন্টারে রয়েছে বিলাসবহুল আবাসিক হোটেল, সাধারণ ও সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্ট, সুউচ্চ অফিস ভবন এবং বিশাল শপিংমল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছোঁয়া দিতে রয়েছে মনোরম পার্ক, রুফটপ পার্ক, সবুজ টিলা ও দৃষ্টিনন্দন পানির ফোয়ারা। দর্শনার্থীদের হাঁটার জন্য রয়েছে আরামদায়ক ওয়াকওয়ে। 

উইকএন্ডে নানা উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি এখানে ফুটসাল কোর্টসহ খেলাধুলার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও ভোজনরসিকদের জন্য রয়েছে সুপারমার্কেট এবং নানা দেশের বৈচিত্র্যময় স্বাদের রেস্তোরাঁ ও ফুডকোর্ট। সবুজ গাছপালা, ফুল-পাখির সমারোহ, পানশালার রঙিন সড়ক, লাইব্রেরি এবং জাপানি সংস্কৃতির নানা আনন্দ-উৎসবের কেন্দ্র হিসেবে বুকিত বিনতাং সিটি সেন্টার অনন্য রূপে সেজে উঠেছে। কে বলবে, এই একই জায়গায় একসময় বন্দিদের আর্তনাদ শোনা যেত!