Published : 01 Sep 2026, 04:26 PM
মাঝরাত। সিউলের গাংনাম ডিস্ট্রিক্টের ব্যস্ত মোড়ে সিগন্যাল বাতিটা টকটকে লাল হয়ে আছে। ডানে-বামে মাইলের পর মাইল কোনো গাড়ি নেই, নেই কোনো সিসিটিভি ক্যামেরার অতন্দ্র প্রহরী কিংবা ট্র্যাফিক পুলিশের বাঁশির শব্দ।
কিন্তু একটি রুপালি রঙের হুন্দাই গাড়ি ঠিক দাগের পেছনে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। চালক এক তরুণ কোরিয়ান, চোখমুখে কোনো তাড়াহুড়োর ছায়া নেই, ফাঁকা রাতের সুযোগ নিয়ে নিয়মকে ফাঁকি দেওয়ার কোনো চাতুরি নেই। লাল আলোর সম্মানে গাড়িটি স্থির হয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ; তারপর সংকেত সবুজ হতেই শান্ত গতিতে রাতের রাস্তায় মিলিয়ে গেল।
দূর আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়, কাচ আর স্টিলের সুবিশাল স্কাইস্ক্রেপারগুলো সিউলের মাথার ওপর যেন অনন্তকালের প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই আধুনিকতার মেকানিক্যাল যান্ত্রিকতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক অলিখিত সামাজিক সত্য। কোরিয়ানদের এই নিয়মানুবর্তিতা কেবল কোনো জরিমানা বা পুলিশি ভয়ের ফল নয়; এটি তাদের মজ্জাগত কৃষ্টি, বংশপরম্পরায় বয়ে চলা আত্মসংযমের সংস্কৃতি।
আর এই অটল কাঠিন্যের মাঝেই এপ্রিলের হাওয়ায় যখন কোরিয়ান বসন্তের পদধ্বনি শোনা যায়, তখন পুরো শহরটাই যেন ক্যানভাস হয়ে ওঠে কোনো পরাবাস্তব চিত্রকরের হাতে। ধূসর ও ব্যস্ত শহরের ইট-পাথরের রাজপথে হঠাৎ করেই ঝরে পড়ে চেরি ব্লসমের বসন্ত-বার্তা। ইয়োইদো পার্ক কিংবা নামসান পাহাড়ের ঢালে রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ চেরি গাছগুলোতে ফুটতে শুরু করে হাজার হাজার গোলাপি ও দুগ্ধ-শুভ্র চেরি ফুল। সামান্য হাওয়া দিলেই তুলোর মতো হালকা পাপড়িগুলো বাতাসে ভেসে রাজপথে ঝরে পড়ে—ঠিক যেন কোনো গোলাপি বরফের বৃষ্টি।
একদিকে সিগন্যাল বাতির সেই নিস্তব্ধ শাসন; অন্যদিকে বাতাসে ভেসে চলা চেরি পাপড়ির কোমলতা। এই দুটি বৈপরীত্যই যেন আজকের দক্ষিণ কোরিয়ার মূল মেরুদণ্ড। কাজের প্রতি নিষ্ঠা, সময়কে ‘ঈশ্বরের মতো’ মূল্য দেওয়া এবং নিজের স্বাধীনতার সীমা অন্যের স্বাচ্ছন্দ্য পর্যন্ত টেনে নেওয়া—এই তিন দর্শনের ওপর ভর করেই এককালের যুদ্ধবিধ্বস্ত কোরীয় উপদ্বীপ আজ বৈশ্বিক প্রযুক্তির শিখরে পৌঁছেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সড়ক পরিবহনের এ চমৎকার শৃঙ্খলা কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী ১৯৫০-এর দশকে কোরিয় যুদ্ধের পর এই দেশ একপ্রকার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ‘হানের অলৌকিক বিকাশ’ বা ‘মিরাকেল অন দ্য হান রিভার’ নামে পরিচিত যে অর্থনৈতিক বিপ্লব তারা ঘটিয়েছে, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। আজকে যে ট্র্যাফিক অবকাঠামো আমরা দেখি, তা বিশ্বমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নাগরিক সচেতনতার মেলবন্ধন।
কোরিয়ার ট্র্যাফিক ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হলো তাদের ‘ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম’ (আইটিএস)। এ ব্যবস্থার আওতায় পুরো কোরিয়ার রাজপথ এক জালের মতো সিগন্যাল, সেন্সর ও ক্যামেরা দিয়ে ঘেরা। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, এখানকার আধুনিক সিস্টেম প্রযুক্তি দিয়ে যতটা না তৈরি, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের মানসিকতায় গাঁথা।
রাস্তায় হাঁটার সময় খেয়াল করলে দেখা যায়, জেব্রা ক্রসিংয়ের সামনে কোনো পথচারী দাঁড়ানো মাত্রই দূর থেকে আসা গাড়ি তার গতি কমিয়ে দেয়। পথচারীর অধিকারকে এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কোনো চালক পথচারীকে পার হওয়ার সুযোগ না দিয়ে আগে যাওয়ার চেষ্টা করলে, তা কোরিয়ান সমাজে ‘অমার্জিত কাজ’ বলে বিবেচিত হয়।
কোরিয়ার প্রতিটি গণপরিবহন এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে ‘ব্ল্যাক বক্স’ বা ‘ড্যাশ ক্যাম’ লাগানো থাকে। রাস্তায় কোনো ট্র্যাফিক পুলিশ চোখে না পড়লেও এই প্রযুক্তি এবং সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালায়। কিন্তু চালকদের মানসিকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা জরিমানার ভয়ে নয়, বরং নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই লেন পরিবর্তন করার সময় সিগন্যাল ব্যবহার করেন এবং গতিসীমা মেনে চলেন।
মাঝরাতে যখন রাস্তা একদম ফাঁকা থাকে, তখনও লাল বাতিতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য কোরিয়ায় খুব সাধারণ। তাদের এই মানসিকতার পেছনে কাজ করে ছোটবেলা থেকে পরিবার ও বিদ্যালয়ে পাওয়া শিক্ষা। কোরিয়ান শিশুরা একদম প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শেখে কীভাবে ট্র্যাফিক সংকেত মেনে চলতে হয়, রাস্তার কোন পাশ দিয়ে হাঁটতে হয় এবং কেন নিয়ম ভাঙা মানে পুরো সমাজকে বিপদে ফেলা।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাস ও মেট্রো রেলের সমন্বয় দেখলে সত্যি অবাক হতে হয়। তাদের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চালকদের জন্য রয়েছে কঠোর প্রশিক্ষণ এবং নির্ধারিত সময়সূচি। সিউলের সিটি বাসগুলো নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত স্টপেজে এসে দাঁড়াবেই—এতে এক সেকেন্ডের হেরফের হওয়াটাও বিরল। কোরিয়ানরা তাদের সময়কে মূল্য দেয়। কোরিয়ান সংস্কৃতিতে একটি জনপ্রিয় শব্দবন্ধ রয়েছে—‘পালি পালি’, যার অর্থ ‘তাড়াতাড়ি করা’। তারা কাজেকর্মে, প্রযুক্তিতে এবং জীবনের গতিতে দ্রুত।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এসে তাদের এই ‘পালি পালি’ বা তাড়াহুড়ো সংস্কৃতি একদম থেমে যায়। তারা জানে, দ্রুত পৌঁছানোর চেয়ে নিরাপদে পৌঁছানো এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আরও একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো কোরিয়ানদের হর্ন না বাজানোর সংস্কৃতি। আপনি হয়তো সিউলের ব্যস্ততম কোনো মোড়ে বা ট্র্যাফিক জ্যামে ঘণ্টাখানেক আটকে থাকবেন, কিন্তু কোনো গাড়ির অনাবশ্যক হর্নের শব্দ শুনতে পাবেন না। হর্ন বাজানোকে এখানে ‘অসভ্যতা’ হিসেবে ধরা হয়। ড্রাইভারদের এই ধৈর্য এবং নীরবতা পুরো শহরের শব্দদূষণকে একরকম শূন্যের কোঠায় নিয়ে এসেছে।
মদ্যপান করে গাড়ি চালানো বা ড্রিঙ্ক ড্রাইভের ক্ষেত্রে কোরিয়ান সরকারের আইন কঠোর এবং এর প্রয়োগও কড়া। রাতে বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র বা রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়া চালকদের নিয়মিত ব্রেথলাইজার টেস্ট করা হয়। কোরিয়ায় একটি চমৎকার সেবা আছে, যাকে বলা হয় ‘দেইরি উনজন’ বা বিকল্প ড্রাইভার সেবা। কেউ মদ্যপান করলে তিনি একটি অ্যাপ বা ফোন কলের মাধ্যমে একজন বিকল্প চালক ডেকে নেন। সেই চালক এসে মদ্যপ ব্যক্তির গাড়িতে করেই তাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যান।
এপ্রিলের হালকা রোদে যখন বাতাসে ভেসে আসা চেরি ব্লসমের সুবাস শহরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই ব্যস্ত আধুনিক শহরটির অন্য রূপ ফুটে ওঠে। সিউলের রাজপথে দাঁড়িয়ে একদিকে আধুনিক দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন কিংবা স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি দেখা যায়, অন্যদিকে চোখের সামনে ঝরে পড়ে গোলাপি চেরি পাপড়ি। প্রযুক্তি আর প্রকৃতির, কাঠিন্য আর কোমলতার এমন সখ্য পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখতে পাওয়া যায়।