Published : 24 May 2025, 10:41 PM
ফ্রান্সে ২০২৪ সালে করা অভিবাসন আইনের আওতায় অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য নিয়মিত হওয়ার নতুন এক প্রক্রিয়া চালু করেছে দেশটির সরকার। শ্রমিক সংকটে থাকা পেশাগুলোতে কর্মরত অভিবাসীরা নির্ধারিত কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এখন থেকে এক বছরের জন্য রেসিডেন্স পারমিটের আবেদন করতে পারবেন।
ফরাসি শ্রম, স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে ‘মেতিয়ের অঁ তনসিওঁ’ অর্থাৎ সংকটাপন্ন পেশার হালনাগাদ তালিকা বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় গেজেট ‘জুরনাল অফিসিয়েল দ্য লা রেপুবলিক ফঁসেজ’-এ প্রকাশিত হয়।
নতুন তালিকায় ৪১টি পেশাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁ, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও লজিস্টিক খাতের মতো পেশা।
বিশেষত প্যারিস ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে এই পেশাগুলোতে অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তালিকায় অন্তর্ভুক্ত পেশাগুলোর মধ্যে রয়েছে: রাঁধুনি, নার্স, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কারিগর, রেস্তোরাঁ কর্মী, সুপারভাইজার, ওয়েল্ডার, কাঠমিস্ত্রি, গাড়ি ও যন্ত্রপাতি মেরামতকারী, কৃষিশ্রমিক, লজিস্টিক ম্যানেজার ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রকৌশলী ইত্যাদি।
তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পেশা এই তালিকা থেকে বাদ পড়ায় সমালোচনা দেখা দিয়েছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের সংগঠন ‘গ্রুপমঁ দে জোতেলরি এ রেস্তোরাসিওঁ দে ফঁস’ (জিএইচআর) হতাশা জানিয়ে বলছে, রান্নার সহকারী ও ওয়েটারদের অন্তর্ভুক্ত না করাটা দুঃখজনক।
নিয়মিত হওয়ার জন্য শর্ত
১. আবেদনকারীকে অন্তত ৩ বছর ধরে ফ্রান্সে বসবাস করতে হবে।
২. সর্বশেষ দুই বছরে তালিকাভুক্ত কোনো পেশায় অন্তত এক বছর কাজ করার প্রমাণ (যেমন বেতন কাগজ/পে স্লিপ) দিতে হবে।
৩. আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড থাকা যাবে না এবং পুলিশের ক্লিয়ারেন্স থাকতে হবে।
৪. ফরাসি সমাজে একীভূত হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে এবং ফরাসি মূল্যবোধের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।
এই প্রক্রিয়ায় অভিবাসীরা সরাসরি প্রেফেকচুর (প্রশাসনিক জেলা কার্যালয়) বরাবর আবেদন করতে পারবেন; নিয়োগকর্তার সুপারিশের আর প্রয়োজন নেই। আইনটি আপাতত ২০২৬ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
এদিকে অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এ উদ্যোগকে আংশিক ইতিবাচক বললেও তালিকার সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
‘কোঅর্দিনাসিওঁ দে সঁ-পাপিয়ে দ্য পারি’ (সিএসপি ৭৫) প্ল্যাটফর্মের মুখপাত্র কমোকো সো স্থানীয় গণমাধ্যমে বলেন, “সব শ্রমিকই পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, অথচ কিছু পেশাকে স্বীকৃতি দিয়ে বাকিদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঠিক প্রতিফলন এই তালিকায় নেই।”
অর্থনীতির প্রয়োজনেই অভিবাসী নির্ভরতা
ফ্রান্সের সরকারি কর্মসংস্থান সংক্রান্ত সংগঠন ‘ফ্রঁন্স ত্রাবাই’-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে কেবল হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতেই প্রয়োজন হবে ৩ লাখ ৩৬ হাজার কর্মী, যার অর্ধেকের বেশি পদ পূরণ করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে অভিবাসীদের শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্তি এখন অর্থনৈতিক অপরিহার্যতা।
শ্রমমন্ত্রী আস্ত্রিদ পানোসিঅঁ-বুভে স্থানীয় গণমাধ্যমে বলেন, “এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে শ্রমবাজারের বাস্তবতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় স্বার্থের সমন্বয়ে।”
অন্যদিকে নতুন অভিবাসনমন্ত্রী ব্রুনো রোতাইয়ো অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, প্রথমে নিয়মিত অবস্থানে থাকা বেকার বিদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া উচিত। যেসব পেশা নতুন তালিকায় নেই, তাদের ক্ষেত্রে পুরনো ‘সার্কুলার ভালস’ এখনো প্রযোজ্য।
তবে নতুন সার্কুলারে প্রেফেকচুরদের বিবেচনাধিকার বৃদ্ধি করা হয়েছে, যার ফলে প্রক্রিয়াটি আরও জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
অভিবাসন বিষেশজ্ঞদের মতে, দেশটির নতুন এই আইন কিছু অনিয়মিত অভিবাসীর জন্য ‘সম্ভাবনার দরজা’ খুলে দিয়েছে। তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, পেশার সীমাবদ্ধ তালিকা এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে এখনও বিস্তর বিতর্ক রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বাস্তবভিত্তিক নীতির প্রয়োজন রয়েছে যাতে ফ্রান্সে বসবাসরত সব অভিবাসী ন্যায্য সুযোগ ও নিরাপত্তা পান।