১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

শাকিলার স্মৃতি আগলে ২৫ বছর, গ্রাউন্ড জিরোতে স্বজনদের শোকের সকাল

৯/১১ হামলায় নিহত বাংলাদেশি দম্পতি শাকিলা ইয়াসমিন ও নূরুল হক মিয়ার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে নিউ ইয়র্কের একটি সড়ক ও বাংলাদেশে গড়ে ওঠা দুটি উদ্যোগ।

শাকিলার স্মৃতি আগলে ২৫ বছর, গ্রাউন্ড জিরোতে স্বজনদের শোকের সকাল
গ্রাউন্ড জিরোর স্মৃতিসৌধে নিহতদের তালিকায় শাকিলা ইয়াসমিন।

বিডিনিউজ২৪

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 12 Sep 2026, 02:02 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:58 AM

নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার সেই সকাল বদলে দিয়েছিল অসংখ্য পরিবারের জীবন। এক প্রজন্ম পেরিয়ে আরেক প্রজন্ম এসেছে, কিন্তু প্রিয়জন হারানোর ক্ষত রয়ে গেছে আগের মতই।

২৫ বছর পর শুক্রবার সেই গ্রাউন্ড জিরোতেই জড়ো হয়েছিলেন স্বজনেরা। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি দম্পতি শাকিলা ইয়াসমিন ও নূরুল হক মিয়ার পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন।

শাকিলার বাবা শরীফ চৌধুরী মেয়ের নাম খোদাই করা স্মৃতিফলকের সামনে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করেন। সঙ্গে ছিলেন শাকিলার মা। 

সিকি শতাব্দী পরও মেয়েকে হারানোর স্মৃতি তার কাছে কতটা জীবন্ত, তা বোঝা যায় তার কথায়।

শাকিলা ইয়াসমিন ও নূরুল হক মিয়া দম্পতি। 

শাকিলা ইয়াসমিন ও নূরুল হক মিয়া দম্পতি।

“দীর্ঘ ২৫ বছরের একটি মুহূর্তও ভুলে থাকতে পারিনি শাকিলাকে,” বলেন শরীফ চৌধুরী।

২০০১ সালে শাকিলার বয়স ছিল ২৬ বছর। তিনি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে মার্শ অ্যান্ড ম্যাকলেনান কোম্পানিতে কাজ করতেন। 

তার স্বামী নূরুল হক মিয়া ছিলেন ওই কোম্পানির অডিওভিজ্যুয়াল বিভাগের পরিচালক। তারা দুজনই সেদিনের হামলায় নিহত হন।

তাদের স্মৃতি শুধু পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের বে রিজ এলাকার যে জায়গায় এই দম্পতি থাকতেন, তাদের স্মরণে ২০০৫ সালে ওই এলাকার একটি সড়কের নামকরণ করা হয় ‘শাকিলা ইয়াসমিন অ্যান্ড নূরল হক মিয়া ৯/১১ মেমরিয়্যাল ওয়ে’। 

শরীফ চৌধুরী বলেন, শাকিলা ও নূরুলের আত্মার মাগফেরাত কামনায় তাদের গ্রামের বাড়িতেও নিয়মিত দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।

ব্রুকলিনে শাকিলা-নূরুল হক মিয়া ওয়ে। 

ব্রুকলিনে শাকিলা-নূরুল হক মিয়া ওয়ে।

শাকিলার নামে ১৯ পরিবারের নতুন ঠিকানা

মেয়ের স্মৃতিকে মানুষের কাজে বাঁচিয়ে রাখতে কয়েক বছর আগে মৌলভীবাজারে গ্রামের বাড়িতে ‘শাকিলা স্মৃতি আবাসন’ গড়ে তোলেন শরীফ চৌধুরী। 

সেই আবাসন এখন ১৯টি দরিদ্র পরিবারের ঠিকানা। তাদের হাতেই জমির মালিকানা বুঝিয়ে দিতে চান শাকিলার বাবা। 

শরীফ চৌধুরী বলেন, বয়সের কারণে নানা অসুস্থতায় তিনি ভুগছেন। তাই ওই পরিবারগুলোর দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছেন কাছের মানুষদের ওপর। কিন্তু তাতেও পুরোপুরি স্বস্তি হচ্ছে না।

“ওদের যদি মনোকষ্ট বাড়ে, তাহলে আমার মেয়েটির আত্মা শান্তি পাবে না,” বলেন তিনি।

তাই শিগগির দেশে ফিরে ওই পরিবারগুলোকে জমির দলিল করে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শাকিলার বাবা।

গ্রামের বাড়িতে শাকিলা স্মৃতি আবাসন। 

গ্রামের বাড়িতে শাকিলা স্মৃতি আবাসন।

নূরুলের স্মৃতিতেও উদ্যোগ

শাকিলার মতই নূরুল হক মিয়ার স্মৃতি ধরে রেখেছে তার পরিবার। 

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় নূরুলের স্মরণে একটি এতিমখানা-কাম-মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানান শরীফ চৌধুরী।

২৫ বছর পরও তাদের পরিবার মনে করে, এই স্মৃতিগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

শাকিলা স্মৃতি আবাসনের বাসিন্দারা। 

শাকিলা স্মৃতি আবাসনের বাসিন্দারা।

ছয় বাংলাদেশির স্মৃতি

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলায় নিউ ইয়র্ক, পেন্টাগন ও পেনসিলভানিয়ায় মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। শুক্রবার ২৫ বছর পূর্তির স্মরণ অনুষ্ঠানে নিহতদের স্বজনেরা তাদের নাম পাঠ করেন। 

গ্রাউন্ড জিরোর অনুষ্ঠানে এ বছর ৯/১১-পরবর্তী অসুস্থতায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদেরও বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।

নিহতদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন বাংলাদেশি। শাকিলা ইয়াসমিন ও নূরুল হক মিয়া ছাড়া অন্য চারজন হলেন মোহাম্মদ শাহজাহান, আবুল কে চৌধুরী, সাব্বির আহমেদ ও মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন।

শুক্রবার তাদের স্বজনদেরও গ্রাউন্ড জিরোর ৯/১১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়ামে আয়োজিত স্মরণ ও শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে দেখা যায়।

৯/১১ হামলার নিহত ৬ বাংলাদেশি। 

৯/১১ হামলার নিহত ৬ বাংলাদেশি।

চার সাবেক প্রেসিডেন্ট, ভ্যান্স-মামদানিও ছিলেন

২৫ বছর পূর্তির এবারের স্মরণ অনুষ্ঠান ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রাউন্ড জিরোতে একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা ও জো বাইডেন। 

ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন পর্যায়ের বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধিরা।

নিউ ইয়র্কের বর্তমান মেয়র জোহরান মামদানিও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তাকে সাবেক মেয়র রুডি জুলিয়ানির সঙ্গে করমর্দন করতে দেখা যায়।

মামদানির অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নিয়ে আগেই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। জুলিয়ানি তাকে অনুষ্ঠানে না আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু মামদানি সেই আহ্বান উপেক্ষা করে স্মরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

গ্রাউন্ড জিরোর সেই আয়োজনে রাজনীতির বিভাজনের চেয়ে সামনে ছিল ২৫ বছর আগের সেই দিনের স্মৃতি, যে দিনে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং যাদের স্বজনেরা আজও সেই শোক বয়ে চলেছেন।

গ্রাউন্ড জিরোতে স্মরণ সমাবেশ।

গ্রাউন্ড জিরোতে স্মরণ সমাবেশ।

শরীফ চৌধুরী বলেন, ওই সন্ত্রাসী হামলায় যারা সত্যিকার অর্থে জড়িত ছিল, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে চান তিনি।

আর শাকিলার স্মৃতি যেন কেবল একটি নাম হয়ে না থাকে, সে জন্যই তার নামে পুনর্বাসিত ১৯ পরিবারের ভবিষ্যৎও নিশ্চিত করতে চান তিনি।