Published : 21 Nov 2025, 04:59 PM
এক বছর পর আবারও সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে এলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া; প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের পাশের আসনে বসে তিনি উপভোগ করলেন সশস্ত্র বাহিনী দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।
শুক্রবার বিকাল ৪টায় গুলশানের বাসা থেকে তিনি সেনাকুঞ্জে পৌঁছালে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান।
গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে বসে অনুষ্ঠানস্থলে যান খালেদা জিয়া। এ সময় তার পরনে ছিল ল্যাভেন্ডার রঙের শিফন শাড়ি। হাত তুলে তাকে অভিভাদনের জবাব দিতে দেখা যায়।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস পৌঁছালে বিকাল ৪টার পর জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হয়। তারপর প্রধান উপদেষ্টা বক্তব্য দেন।

বক্তব্যের শুরুতে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অভিনন্দন জানান এবং মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
এর কিছুক্ষণ পর সেনাকুঞ্জে পৌঁছান খালেদা জিয়া। প্রধান উপদেষ্টা তখন ঘুরে ঘুরে অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিলেন। অনুষ্ঠানস্থলে খালেদা জিয়ার আগামনি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সবার নজর ঘুরে যায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর দিকে।
শুরুতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে একান্তে কয়েক মিনিট কথা বলেন খালেদা জিয়া। পরে তারা যান মূল অনুষ্ঠানস্থলে।
সেখানে পাশাপাশি আসনে বসে বর্তমান ও সাবেক সরকারপ্রধানকে হাসিমুখে কথা বলতে দেখা যায়। অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের সাইডলাইনে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া পারষ্পরিক সৌজন্য বিনিময় করেন। প্রধান উপদেষ্টা এসময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থার বিষয়ে খোঁজ নেন এবং তার সুস্থতা কামনা করেন।
“বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান। তিনি প্রধান উপদেষ্টার সহধর্মিনী আফরোজী ইউনূসের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং শুভকামনা জানান।”
খালেদা জিয়া বিকাল ৪টায় গুলশানের বাসা ফিরোজা থেকে সেনানিবাসের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তার সঙ্গে একই গাড়িতে ছিলেন তার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি, খালেদা জিয়ার প্রয়াত ভাই সাঈদ ইসকান্দারের স্ত্রী নাসরিন ইসকান্দার।
বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়িবহরের সঙ্গে ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার, এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সেনাকুঞ্চের এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রব, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান হাসনাত কাইয়ুমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দও সেনাকুঞ্চের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন।
ছয় বছর পর গতবছর এই সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানেই প্রকাশ্যে দেখা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।
নানা ধরনের অসুস্থতার কারণে এখন তিনি রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেন না। গত এক বছরের মধ্যে কেবল একবারই তাকে প্রকাম্যে দেখা গিয়েছিল। গত ৮ অক্টোবর রাতে তিনি তার স্বামী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করতে শেরেবাংলা নগরে গিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা সম্মিলিতভাবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণের সূচনা করে। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে প্রতিবছর দিনটি ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’ হিসেবে পালন করে বাংলাদেশ।
দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবেই সেনাকুঞ্জে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যাতে রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, কূটনীতিক ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

এক সময় সেনাকুঞ্জের এ অনুষ্ঠান আলোচনায় থাকত অন্য রাজনৈতিক কারণে। দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুজনেই এ অনুষ্ঠানে যেতেন। চির বৈরী এ দুই নেতার সারা বছর দেখা না হলেও সেনাকুঞ্জে তাদের সাক্ষৎ হওয়ার সম্ভাবনা থাকত।
সর্বশেষ ২০১২ সালে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যেও সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন দুই নেত্রী। তবে সেদিন তাদের কথা হয়নি।
খালেদা জিয়া তখন বিরোধী দলীয় নেতা। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আর কখনো তাকে সেনাকুঞ্জের এ আয়োজনে দেখা যায়নি।
গণ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট পালিয়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে এখন তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের আসামি।