১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘ফিরোজা’ সুনসান, শূন্যতা পাশের বাড়িতেও

“তিনি চলে গেছেন ঠিকই, তবে তিনি আমাদের মনের ভেতরে থাকবেন চিরঞ্জীব হয়ে—সবসময়, প্রতিক্ষণে।”

বিশেষ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Jan 2026, 08:43 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:29 PM

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শেষ জীবনের ১৩ বছর যেখানে কেটেছে, গুলশানের সেই ‘ফিরোজা’য় এখন চলছে কেবলই নীরবতা।

মাস দেড়েক আগে বিএনপি চেয়ারপারসনকে এ বাড়ি থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল চিকিৎসার জন্য। এরপর সেখানেই গত হয়েছেন গেল মঙ্গলবার ভোরে।

নিরাপত্তা কর্মীরা এখনো পাহারা দিচ্ছেন বাড়িটি। প্রহরী ছাউনি রয়েছে ঠিক আগের মতই। বৃহস্পতিবার বিকালে গিয়ে দেখা যায়, নিরাপত্তার কর্মীরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেছেন। তাদের চোখে-মুখে শোকের ছায়া ফুটে উঠেছে।

বিএনপির চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্সের (সিএসএফ) একজন বললেন, “ম্যাডামের ডিউটি করতাম। আজকে ম্যাডাম নেই, পুরো বাড়িটাই খালি। বাড়ির ভেতরে ঢুকলে কেমন জানি একটা শূন্যতা, কেমন জানি একটা নিস্তব্ধতা কানে আসে।

“ভাই এই কষ্ট ও বেদনার কথার বলার ভাষা নেই। দোয়া করি, আল্লাহ যেন ম্যাডামকে ভালো রাখেন পরপারে।”

আগের দিন জাতীয় সংসদের সামনে জনসমুদ্রের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাকে জিয়া উদ্যানে স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। 

সিএসএফের আরেক নিরাপত্তা কর্মী বললেন, “ম্যাডাম সবসময় আমাদের খোঁজ-খবর রাখতেন। বিকাল অথবা দুপুরে খবর নিতেন—আমরা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছি কি না। উনি ছিলেন আমাদের প্রাণের মা।”

আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে গুলশানের এ বাড়িতেই ওঠেন খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে কারাগারে পাঠানোর আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন।

কোভিড মহামারীর সময় ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়া সাময়িক মুক্ত হলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে তখন কারাগার থেকে গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’তেই ফেরেন তিনি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরোপুরি কারামুক্ত হয়েও শেষ পর্যন্ত ওই বাড়িতেই ছিলেন তিনি।

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিএনপি চেয়ারপারসনের অনেক স্মৃতি এই বাড়িতে লেগে আছে; যারা বাড়ির সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত, তাদের আবেগ-অনুভূতিও রয়েছে উনাকে ঘিরে।

“তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছে, যারা দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময়ে বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্যারের ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবনে ভালোবাসার পরশ নিয়ে এখনো আছেন ফিরোজার চারপাশে।”

শায়রুল কবির বলেন, “চেয়ারপারসনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমিও সেই অনুভূতিটা উপলব্ধি করছি, যা ভাষায় প্রকাশ করার মানসিকতা এই মুহূর্তে আমার নেই। সত্যিই এই বাড়ি যেন ম্যাডামকে এখন দেখি জীবন্ত ম্যাডাম হিসেবে।”

বাড়ি নম্বর ১৯৬

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান যুক্তরাজ্যের দেড় দশকের নির্বাসন কাটিয়ে গত বৃহস্পতিবার দেশে ফিরে ওঠেন ‘ফিরোজা’র পাশে, ১৯৬ নম্বর বাড়িতে।

এই বাড়িটি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পরে তার সহধর্মিণী খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। মাস কয়েক আগে এ বাড়ির দলিলপত্র বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকার।

এ বাড়ির সামনে যারা নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের মধ্যেও শোকের ছায়া দেখা গেছে। গুলশান অ্যাভেনিউ ডিপ্লোম্যাটিক জোনের মধ্য পড়ায় সেখানে সেভাবে নেতাকর্মীর ভিড় নেই।

জানাজার আগে বুধবার সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ নেওয়া হয় ১৯৬ নম্বর বাড়িতে

জানাজার আগে বুধবার সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ নেওয়া হয় ১৯৬ নম্বর বাড়িতে

গুলশানের বাসিন্দা হাসানুজ্জামান খান বলেন, “এই কাছাকাছি থাকি। বিকালে হেঁটে একটু আসলাম এই বাড়ির সামনে। কঠোর নিরাপত্তা দেখতেই পারছেন।

“ম্যাডাম নেই, এখন ভরসার জায়গাটা তারেক রহমান। সেজন্য এখানে এসে কিছু শোকের সঙ্গী হচ্ছি। জানি লিডারের এই শোক শুধু তার একার শোক নয়, এটা আমাদের সকলে শোক; এটা আমাদের গণতন্ত্র প্রিয় বাংলাদেশিদের শোক।”

‘দোয়া-দরুদে তারেক রহমান’

মায়ের চলে যাওয়ার শোকে আচ্ছন্ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার দিনভর তার সময় কেটেছে দোয়া-দরুদ আর নামাজে।

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন বিকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গতকাল রাতে এবং আজকে বিকাল পর্যন্ত বাসায় ম্যাডামের আত্মার মাগফেরাত কামনায় ইবাদত বন্দেগিতে ছিলেন। দোয়া-দরুদ, কোরআন তেলোয়াত করেছেন।

“আত্মীয়-স্বজনরা অনেকে বাসায় এসেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সান্ত্বনা জানাতে। সেই সময়ে পারিবারিক পরিমণ্ডলে ম্যাডামের স্মৃতির কথা তাদেরকে বলেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান; আবেগ তাড়িত হয়েছেন, শোকাচ্ছন্ন হয়েছেন সেই সময়ে স্বজনরাও তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বাসা থেকে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আসেন। এখান তিনি অফিস করছেন নিজের চেম্বারে।”

শোকাচ্ছন্ন চেয়ারপারসনের কার্যালয়

গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে কালো পতাকা উড়ছে। দলীয় পতাকা ও জাতীয় পতাকা রাখা হয়েছে অর্ধনমিত। সেখানে খোলা শোক বইয়ে সই করতে আসছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও দেশের রাজনীতিকরা।

বৃহস্পতিবার আসেন সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, ছারছীনা দরবার শরীফের পীর শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, সড়কের দুই পাশেই নেতাকর্মীদের জটলা; রয়েছে গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড়। যারা শোক বইতে সই করবেন, তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে।

বনানী যুবদলের কর্মী আলতাফ হোসেন বলেন, “নেত্রী নাই, মনটা ভালো নেই। কতদিন এই নেত্রীর দূর থেকে দেখে নিজে শক্তি সঞ্চয় করেছি, শত নিপীড়ন- নির্যাতনের মধ্যে আশা দেখেছি; সেই নেত্রী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন—এই শোক কীভাবে কাটাব জানি না।”

কৃষক দলের সহসভাপতি ভিপি ইব্রাহিম বলেন, “ম্যাডামের চলে যাওয়াটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই, আল্লাহর হুকুম। তবে এটা ঠিক, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ম্যাডামের জনপ্রিয়তার রেকর্ড কেউ ভঙ্গ করতে পারবে না।

“তিনি চলে গেছেন ঠিকই, তবে তিনি আমাদের মনের ভেতরে থাকবেন চিরঞ্জীব হয়ে—সবসময়, প্রতিক্ষণে।”

১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দলের হাল ধরেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া, তখন তিনি নিতান্তই একজন গৃহবধূ। তিনি ১৯৮৪ সালের অগাস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন, আমৃত্যু তিনি সে দায়িত্বে ছিলেন।

১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনে এরশাদ সরকারের সঙ্গে কখনো আপস করেননি খালেদা।

অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতা করলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি কোনো সমঝোতায় যায়নি। তাই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার নাম হয় ‘আপসহীন নেত্রী’।