১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মামলা ও ‘মব’ সরকারের সবচাইতে বেশি ‘ড্যামেজ’ করেছে: সালাহউদ্দিন

“কিন্তু এই মামলাটা রেকর্ড করে কে? পুলিশ। আগে তো আমাদের মামলা নিতে পারে নাই,” বলেন তিনি।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 20 Sep 2025, 09:28 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:20 PM

ঢালাও মামলা ও ‘মব’ সহিংসতার কারণে অন্তর্বর্তী সরকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।

শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার আয়োজিত এক রাউন্ড টেবিল আলোচনায় তিনি বলেন, “এই যে ৫ অগাস্টের পরে ২০২৪ সালের পর যত মামলা হয়েছে এবং এরপরে যত ‘মব ক্রাইসিস’ হয়েছে-এ দুইটা জিনিস এই সরকারের সবচাইতে বেশি ‘ড্যামেজ’ করেছে। জনগণকে ‘ড্যামেজ’ করেছে।

“তার মধ্যে একটা মামলায় ২ হাজার, ৫ হাজার জনের নামে মামলা দিয়ে দিছে, যার সাথে মামলার কোনো সম্পর্ক নাই। কিন্তু এই মামলাটা রেকর্ড করে কে? পুলিশ। আগে তো আমাদের মামলা নিতে পারে নাই। আমি যেমন, আমাকে গুম করা হল, আমার স্ত্রী জিডিও করতে পারে নাই। পুলিশ বলেছে যে আমার পক্ষে নেওয়া সম্ভব না।” 

গত বছর ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির নেতাকর্মী ও সাবেক মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে মামলা হতে শুরু করলে সমালোচনা তৈরি হয়। বলা হয়, ঢালাও মামলা হচ্ছে। 

এছাড়া ‘মব’ তৈরি করে বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, মাজারে হামলা, পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা এখনো আছে। 

অভ্যুত্থান দমনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে। সরকারি হিসেবে জুলাই অভ্যুত্থানে আট শতাধিক শহীদ হয়েছে। সে সময় থানা হামলা ও পুলিশ হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত সংস্কারে যে প্রক্রিয়া চালাচ্ছে সেখানে পুলিশ সংস্কারও রয়েছে। 

পুলিশ সংস্কার বিষয়ে আয়োজিত এ আলোচনায় পুলিশের চলমান সমস্যা নিয়ে সাবেক আমলা সালাহউদ্দিন নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “এই (মামলা নেওয়ার) এখতিয়ারটা যেহেতু আইনে পুলিশের কাছে দেওয়া আছে, সেটার অপব্যবহার করার সুযোগও তাদের কাছে আছে।”

“এফআইআর না নিলে আপনি যাইতে পারেন থানায়? আদালতে আপনি মামলা করতে পারেন। সেটা তো তদন্তের জন্য আবার এই থানাতেই তো পাঠাবে। তো যেই থানায় বলল যে আমি এখানে মামলা নেব না, সে কি তদন্ত করবে? এই স্বাধীনতা আছে?”

তিনি বলেন, “আমি কিছু জুডিশিয়াল কাজ করেছিলাম ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে, সেজন্য আমার অভিজ্ঞতা বলছি। …শেষ পর্যন্ত ‘পুলিশকে সবাই ডরায়’-এটা হচ্ছে কথা।

“আমার কর্মজীবনে আমি দেখেছি যে অনেক ওসিরা টিএনওর (আগের থানা নির্বাহী কর্মকর্তা) বাসায় ডাকাতি করাইতো পরিকল্পিতভাবে। সম্পর্ক ভালো না তাই-এটা আমার জীবনে আমি দেখেছি। এই মানসিকতাকে পরিবর্তন করতে হবে। কারণ আমরা যদি নিজেরা সংশোধন না হই। মানসিক সংস্কার যদি আমাদের না হয়, আইন দিয়ে কখনোই এ সংস্কার হবে না।”

১৮৬১ সালের পুলিশ আইন পরিবর্তন নিয়ে সুপারিশে তার দলের সমর্থন থাকলেও রাজনৈতিক দল, আমলা ও পুলিশ-এ তিন পর্যায়েই ‘মানসিক সংস্কার’ প্রয়োজন বলে মনে করেন বিএনপির এই নেতা।

গত দেড়বছরে পুলিশের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা আগামী ৫০ বছরেও পুনরুদ্ধার করা যাবে কিনা সেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা।

পুলিশ সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা তো নিশ্চয় দরকার। খুব জোরেশোরে দরকার। তবে আমার সন্দেহ আছে বিগত দেড় বছরে বাংলাদেশ পুলিশের যে ড্যামেজ হয়েছে, এই ড্যামেজ আগামী ৫০ বছরেও, এগুলা, এটা রিকভার করা যাবে কিনা। সন্দেহ আছে।”

সংস্কারের ক্ষেত্রে পুলিশ সংস্কারে যে কমিশন করা হয়েছিল তারও সমালোচনা করেন সাবেক এ কর্মকর্তা।

তার ভাষ্য, “এবারকার পুলিশ কমিশন অন্যতম ‘হোপলেস কমিশন’। হোপলেস। এবং তারা পুলিশের ‘কোর’ সমস্যা শুনতেই চায় না। তারা এগুলো জানতেই চায় না।”

সাবেক এই আইজিপি বলেন, একজন ব্যক্তি এক আমলে ১৮টা মামলার আসামি এবং ২০ বছর কারাগারে আছেন, তারপরে সরকার পরিবর্তন হয়ে গেল, দেখায় সব অভিযোগ থেকে খালাস। 

“তো তাহলে পুলিশ অফিসাররা তো আঙ্গুল চোষার জন্য বসে নাই। তারা জানে যে পাগড়িটা কোন দিকে? 

“আমরা চাকরিতে পাকিস্তান আমলে ঢুকেছি। তো একটা কথা ছিল যে ‘পাগড়ি জিস তারফ, সালাম উস তারাফ’। তো তারা পুলিশ অফিসাররা এত চালাক, তারা বোঝে কার পিছনে যেতে হবে, কোথায় কী করতে হবে।”

২০০৬ সাল থেকেই বর্তমান আইনের পরিবর্তন ও পুলিশের সংস্কার চেয়ে আসছেন তুলে ধরে আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, “আমরা যেটা চাচ্ছিলাম ২০০৬-০৭ থেকে, পুলিশের তরফ থেকে আমরা বলছিলাম যে আমাদের সংস্কার হোক। আমরা ভালো হতে

চাই। আপনারা এই জিনিসগুলো করেন। আমরা ২০০৬ সাল থেকে এই ১৮৬১ সালের যে পুলিশ আইন, যেটা ব্রিটিশ শাসকরা করে গেছেন, যেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ অসীম। 

“আমরা বলেছিলাম যে এটাকে পরিবর্তন করতে হবে। এবং আমরা এটাকে পরিবর্তন করে একটা প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম, নতুন একটা পুলিশ আইন করে এবং সেটা ২০০৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই ১৮ বছরে এখনো হয়নি।”

আসলেই যদি জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে চায় তাহলে একধরনের ‘স্বায়ত্বশাসন বা স্বাধীনতা’ দেওয়ার দরকার আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

এর ব্যাখ্যায় পুলিশ প্রধান বলেন, “কর্মকাণ্ডের স্বাধীতা যেন আমার থাকে। আমি মামলায় কাকে গ্রেপ্তার করবো, কাকে আমি কারাগারে পাঠাবো, কার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেব-এটা যেন আমি নিজে করতে পারি। এটা যেন আমাকে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্দেশ না না করে। এই জায়গাটা আমরা চাচ্ছি আপনাদের কাছ থেকে।”

তার মতে, তাহলেই শুধু পুলিশ জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন মানতে পারবে।

রাউন্ড টেবিল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। 

সেখানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন-সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ফরিদ আহমেদ, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।