Published : 27 May 2026, 12:06 AM
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ থাকার বিষয়ে যে আলোচনা সামনে এসেছে, সেটির সদস্য ছিলেন না বলে দাবি করেছেন ওই সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ মঙ্গলবার দলটির ডাকা জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে একটি ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ছিল, এটা নিয়ে সাবেক উপদেষ্টারা কথা বলছেন। এ বিষয়ে আসিফ মাহমুদের অনুভূতি কী এবং তিনি এই ‘কিচেন ক্যাবিনেটে’ ছিলেন কিনা?
জবাবে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারে জায়গা পাওয়া আসিফ মাহমুদ বলেন, “না, এটা আপনি বলেছেন যে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ছিল, কিন্তু আমি তার সদস্য ছিলাম না। আর এখন তো আবার শুনছি যে কিচেন ক্যাবিনেটেও সব সিদ্ধান্ত হত না।”
এর আগে ইউনূস সরকারে থাকা আরও দুই উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন ও তৌহিদ হোসেন সেই সময় ‘কিচেন কেবিনেট’ থাকার দাবি করেন।
সংসদ নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পর গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথমে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, সেসময় সরকারের ‘বেশিরভাগ বড় সিদ্ধান্ত’ হত উপদেষ্টা পরিষদের বাইরে।
চ্যানেল ওয়ানে প্রচারিত ওই সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের নানা প্রসঙ্গে কথা বলেন।
নির্বাচন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েই সাবেক প্রধান উপদেষ্টার ‘কিচেন কেবিনেট’ নিয়ে কথা বলেন সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেন, “আমি প্রথম কৃতিত্ব দেব আন্তর্বর্তী সরকারকে যে এরকম একেটা ‘ভোলেটাইল’ জায়গা থেকে মোটামুটি একটা অবস্থায় নিয়ে আসছে। আমার চোখে খুব বড় ধরনের গাফিলতি চোখে পড়েনি।
“কিছু কিছু বিষয়ে দ্বিমত করেছি, ওটা ছোটখাট। আমরা সেখানে ২৭ জন। কিন্তু আনফরচুনেটলি এই ধরনের বড় সিদ্ধান্তগুলো কেবিনেটেও আলোচনা হত না। মোটামুটি কেবিনেটের বাইরে আলোচনা হত।”
এরপর গত সোমবার সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন একটি টিভি স্টেশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারে ‘কিচেন কেবিনেট’ থাকার বিষয়টি আবার সামনে আনেন। তিনি বলেন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বে ছিল সাত সদস্যের একটি ‘কিচেন ক্যাবিনেট’।
তার দাবি, ওই গ্রুপ প্রতি মঙ্গলবার বৈঠকে বসত। এমনকি তার নিজের মন্ত্রণালয়ের বিষয়েও একাধিক উপদেষ্টা প্রভাব খাটাতেন।
তৌহিদ বলেন, তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কিন্তু তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি।
এ নিয়ে আবার আলোচনার মধ্যে মঙ্গলবার এনসিপির সংবাদ সম্মেলনে চব্বিশের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক থেকে পরে উপদেষ্টার দায়িত্ব পাওয়া আসিফের কাছে জানতে চাওয়া হয় ‘কিচেন কেবিনেট’ নিয়ে।
সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ ধরে আসিফ মাহমুদ বলেন, “খলিল সাহেব একাই নাকি ওই চুক্তি করে ফেলতেন, কালকে আমি একটা নিউজে দেখলাম যে ফাওজুল কবির খান (সাবেক উপদেষ্টা) তিনি বলছেন চুক্তি বিষয় তিনি জানেন না, আসিফ নজরুল স্যারও বলছেন তিনিও জানেন না। শুধু বাণিজ্যমন্ত্রী আর বর্তমান বিএনপির পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তারা জানতেন, তারা করেছেন। তো আসলে স্পষ্টতা নাই আর কি।”
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘটনাবহুল দেড় বছর পেরিয়ে গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।
অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খলিলুর রহমান বিএনপির নতুন সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।
নির্বাচনের তিন দিন আগে ইউনূস সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে, যা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলে সমালোচনা চলছে।
খলিলুর রহমান দাবি করেছেন, এই চুক্তিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্মতি ছিল। তবে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর দাবি, এই চুক্তি নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেনি অন্তর্বর্তী সরকার।
এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলার প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, “অনেকে বলছেন, আমার মনে হয় যে জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে আগেও পরিষ্কার করা হয়েছে, এবারও এখনও আমরা পরিষ্কার করছি। প্রথমত, যখন আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তিটা হয়, তখন জাতীয় নাগরিক পার্টিতে এখন যারা আছে, আমি তো সরকার থেকে পদত্যাগ করে এসেছি, তখন আমি জাতীয় নাগরিক পার্টির মেম্বার ছিলাম, মানে মুখপাত্র ছিলাম।
“৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তিন দিন আগে চুক্তিটা হয়েছিল, ফলে চুক্তি সম্পর্কে আমার কোনো কিছু ‘অফিশিয়ালি জানা ‘পসিবল’ না। এবং দ্বিতীয়ত, জাতীয় নাগরিক পার্টিকে অনেকেই বলেন যে সকল পার্টিকে জানানো হয়েছে, সকল পার্টিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টিকে, আমি আমার আহবায়ক থেকেও ‘কনফার্ম’ হয়েছি, সবার সাথে কথা বলেছি, এই চুক্তি হওয়ার বিষয়ে কেউ জাতীয় নাগরিক পার্টির ‘কনসার্ন’ নেয় নাই, এটা আমি ‘ক্লিয়ারলি’ আজকে আপনাদের জানিয়ে দিচ্ছি।”
চুক্তিটি করার জন্য ৯০ দিনের সময় ছিল, কিন্তু সরকার এক মাসের মধ্যে তা করেছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “তো অনেক সময় আমরা শুনি যে এখন যিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন, তিনি তো বিএনপির সাথে সমঝোতায় থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারে আসলে কাজ করেছেন। তো তিনি বিএনপির সাথে সমঝোতা করে এই চুক্তি করার দায়টা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপরে দেওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের তিন দিন আগে চুক্তিটা করেছে।
“এই প্রশ্নটা কিন্তু জনমনে এবং যারা নীতি নির্ধারক বিভিন্নভাবে উপদেষ্টা ছিলেন, প্রধান উপদেষ্টা একটা বক্তব্য দিয়েছেন। তো আমরা মনে করি এই চুক্তিটা বিএনপিই করেছে, কিন্তু সে ‘জাস্ট’ নির্বাচনের তিন দিন আগে তাদেরই বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিয়ে এটা অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে এবং সে এখন বলতেছে যে এই চুক্তি নিয়ে তো আমাদের কিছু করার নাই, আগের সরকার করেছে।”
বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক দোষারোপের খেলা চলছে দাবি করে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, “আগের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যখন জানেন না এই চুক্তি সম্পর্কে তাহলে তো আমরা এটাই বলতে পারি যে, যদি খলিল সাহেব একাই করে থাকেন, তাহলে তো উনি এখন বিএনপির পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তার মানে বিএনপির পররাষ্ট্রমন্ত্রীই চুক্তিটা আসলে করেছে, তারা গোপনে এই চুক্তিটা করছে। আর যদি এর অন্যথা কিছু হয়, তাহলে ওই চুক্তি আপনারা পর্যালোচনা করেন, বাতিল করেন।”
মালয়েশিয়াসহ দুটি দেশ চুক্তি বাতিল করেছে তুলে ধরে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, “তো আপনারা বারবার অন্তর্বর্তী সরকার, এনসিপি, জামায়াত এদের ওপরে দায় দিয়ে দিতে চান, কিন্তু চুক্তি করেছে আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তো এই যে একটা ‘ব্লেম গেমের পলিটিক্স’ এবং একটা মানুষকে ভুল বোঝার মধ্যে রাখার চেষ্টা করা, এটা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।”
সাবেক এই উপদেষ্টা এবারের কোরবানির হাটের ইজারায় অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, “অনেক জায়গায় আমরা দেখেছি যে হাট বরাদ্দ দেয়া হয় নাই, কিন্তু পাড়ায় পাড়ায়, এটা গতবারও হয় নাই, এবার বিভিন্ন জায়গায়, যে আপনি বনশ্রীতে দেখেন, মোহাম্মদপুরে দেখেন, বিভিন্ন জায়গায় পাড়ায় পাড়ায় লোকাল নেতারা, যারা হয়তো হাট পায় নাই, হাট পেতে চেয়েছিল, যারা থাকে না-ওয়ার্ডের নেতা, তারা নিজেরা হাট বসাচ্ছে এবং ওইখান থেকে হাসিল আদায় করছে।”
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-বিসিবির নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন সাবেক এই যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা।
তার সময়ের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, “কালকে রিপোর্ট দেখলাম যে কোনো ব্যক্তির নিজের পরিচয় নাই, সবার বাপের পরিচয়, শালীর পরিচয়, তারপরে দেখলাম যে যিনি এখন এডহক কমিটির প্রেসিডেন্ট আছেন, তার ফুফাতো ভাই কাউন্সিলর, তার ভাইও কাউন্সিলর, তার কোনো ভাগিনাও কাউন্সিলর, চাচাতো ভাইও কাউন্সিলর। মানে একেবারে পরিবার-পরিজন নিয়ে, মনে হচ্ছে আমরা এক রাজতন্ত্রে বসবাস করতেছি।”
বিসিবিকে পরিবারকরণ করেছে বলে অভিযোগ করেন আসিফ মাহমুদ।