Published : 06 Feb 2026, 02:06 AM
কোনো কোনো ভোটারের জিজ্ঞাসা, সংসদ নির্বাচনে পুরুষ প্রার্থীর পাশাপাশি নারী প্রার্থীকে আলাদা করে ভোট দিতে হবে কিনা।
নারীকে কেন প্রার্থী হতে হবে, সেই প্রশ্নও তোলা হচ্ছে। ফেইসবুক হ্যাক হওয়া, প্রচারে বাধা পাওয়া কিংবা ব্যানার-ফেস্টুন ছেঁড়ার মতো অভিযোগও শুনিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনের নারা প্রার্থীরা।
তবে আশা জাগানিয়া প্রতিক্রিয়া পাওয়ার কথাও বলেছেন তারা। বিশেষ করে নারী ভোটাররা তাদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছেন। ভোটের আশ্বাসও দিচ্ছেন কেউ কেউ।
চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি সংসদীয় আসনে এবার নারী প্রার্থী চারজন। এরমধ্যে দুজন আবার লড়ছেন একই আসনে। সেই হিসাবে, ১৩টি আসনে কেবল পুরুষরাই সংসদে বসার জন্য লড়ছেন।
জেলায় ভোটার আছেন ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন। এর মধ্যে নারী ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৬০; পুরুষের সংখ্যা ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৮৭। হিজড়া ভোটার আছেন ৭০ জন।
দুজন নারী প্রার্থী থাকা আসনটি হলো ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, হালিশহর ও খুলশী নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১০। এখানে বাসদ (মার্কসবাদী) আসমা আক্তারকে এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ প্রার্থী করেছে সাবিনা খাতুনকে।
একজন নারী প্রার্থী আছেন বন্দর ও পতেঙ্গা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১১ আসনে। এখানে প্রার্থী হয়েছের বাসদের (মার্কসবাদী) দীপা মজুমদার।
আরেক নারী প্রার্থীর নাম জিন্নাত আকতার। চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন এ আইনজীবী।
ভোট চাইতে নেমে নানা অভিজ্ঞতা মুখে পড়ার কথা শুনিয়েছেন তারা। এর মধ্যে বিড়ম্বনার ঘটনা যেমন আছে, তেমনি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সংখ্যাও কম না। তবে নারীরাই নারী প্রার্থীদের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন বেশি।
‘নারীদের কাছে যান’
চট্টগ্রাম-১০ আসনে বাসদ (মার্কসবাদী) দলের প্রার্থী আসমা আক্তার নিজের সংসদীয় আসনের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন জনসংযোগ করছেন।
মঙ্গলবার আসমা আক্তার পাহাড়তলি এলাকার পাঞ্জাবি লেইন, শহীদ লেইন, মাস্টার লেইন এলাকায় প্রচারণা করেন। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, লিফলেট দিয়ে তিনি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলছিলেন। ভোটাররা বেশ মনযোগ দিয়ে তার কথা শুনছেন।
ভোটাররা যে আন্তরিকতায় তাকে গ্রহণ করছেন তাতে খুশি আসমা। কিন্তু পাশাপাশি আছে তিক্ত অভিজ্ঞতাও। সে কথা জানিয়ে আসমা আক্তার বলেন, “বহু বছর ধরে এই শহরে রাজনীতি করি। মানুষ সাদরে গ্রহণ করছে। মন দিয়ে আমার কথা শুনছেন।
“কিন্তু কিছু পুরুষের কথা হচ্ছে, ‘আপনি নারীদের কাছে যান। আপনি নারী প্রার্থী, নারী ভোটাররা আপনাকে ভোট দেবে।’ এরকম কথা শুনছি। সেটা যদিও সংখ্যায় খুব কম।”
সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ থাকলেও ভোটারদের উপর ‘চাপ’ বাড়ছে জানিয়ে আসমা আক্তার বলেন, “মানুষের ভোট দেওয়ার ইচ্ছা আছে। কিন্তু নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ভোটারদের উপর নানা রকম চাপ আসছে। পাশাপাশি মার্কা দেখে ভোট দেয়ারও একটা মানসিকতা আছে। আবার অনেকে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি কাকে ভোট দিবেন।
“আমার আসনে ৯টি দলের প্রার্থী থাকলেও এক-দুটি দলের প্রচারই বেশি দেখছি। রাষ্ট্রীয়ভাবে, প্রশাসনিক দিক থেকে ও মিডিয়ায় প্রচারের ক্ষেত্রে দুয়েকটি দলের তথাকথিত হেভিওয়েট প্রার্থীরা বেশি সুযোগ পাচ্ছেন।”
নিজের নির্বাচনি জনসভার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “৩০ জানুয়ারি আমরা জনসভা করি। আমাদের দলের প্রধান সেই সভায় যোগ দেন। কিন্তু দুয়েকটি সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোথাও সেই সংবাদ প্রচার হয়নি। অথচ কয়েক দিন আগে অন্য দলের প্রধানের সমাবেশের সময় মুহূর্তে মুহূর্তে আপডেট দিয়ে সংবাদ প্রচার করা হয়েছে।
“সেসব সমাবেশে যেভাবে প্রচারণা হয়েছে, যত মাইক লাগানো হয়েছে, তাতে কি আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়নি? অথচ আমরা তিনটা থেকে চারটা মাইক লাগালেই বাধা আসে। এভাবে সমান সুযোগ নিশ্চিত হয় না।”
‘মেয়েরা কেন প্রার্থী হবে?’
মঙ্গলবার নগরীর ওয়ারলেস এলাকায় এবং বুধবার চৌধুরীপাড়ায় প্রচার চালান ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী সাবিনা খাতুন নিজ দলের ‘মানবতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার’ লক্ষ্যের কথা বলেন।
মঙ্গলবার ওয়ারলেস এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারী ও পুরুষদের সঙ্গে কথা বলছেন সাবিনা। সেখানে ইনসানিয়াত বিপ্লব সম্পর্কে ভোটাররা জানতে চাইছেন। এই দলের লক্ষ্য কী, এমন প্রশ্নও ভোটাররা করছেন আগ্রহের সঙ্গে।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ সাবিনার।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের দলের লক্ষ্য মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। সব মানুষ ভাই ভাই, মানবতার রাষ্ট্র চাই। দেশ পরিচালিত হবে মানবতার পথে। সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। প্রচারণা শুনে সবাই উৎসাহিত করছে আমাকে।
“আজ পর্যন্ত প্রচারণায় সরাসরি কেউ নেতিবাচক কিছু বলেনি। কিন্তু সোশাল মিডিয়ায় নানা নেতিবাচক কমেন্টস করছে। কেউ বলছে, মেয়েরা কেন প্রার্থী হবে?”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এসব নেতিবাচকতার পাশাপাশি বাস্তবে ঘটে যাওয়া নির্বাচনি সহিংসতাও শঙ্কিত করছে সাবিনা আক্তারকে।
জঙ্গল সলিমপুরে সম্প্রতি র্যাব কর্মকর্তা খুন হওয়া এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর প্রচারে হামলার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ভোটাররা শঙ্কিত যে, সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন হবে কিনা। কারণ যা ঘটছে, ভোটের দিন কী হয়, তা নিয়ে আমার মধ্যেও শঙ্কা আছে।”
চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং–পাহাড়তলী–হালিশহর–খুলশী) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯২ হাজার ৪৪৪ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৪২ হাজার ৬৩২ জন।
‘পুরুষ প্রার্থীর পর আপনাকেও ভোট দিতে হবে?’
নির্বাচনে নারী সংসদ সদস্য প্রার্থীকে পুরুষের পাশাপাশি আলাদা করে ভোট দিতে হবে কিনা, সেই প্রশ্নের মুখে একাধিকবার পড়ার কথা বলেন চট্টগ্রাম-১১ আসনে বাসদের (মার্কসবাদী) প্রার্থী দীপা মজুমদার।
ভোটের প্রচারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, নারী ভোটারদের মধ্যে অনেকে তার প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। কেউ কেউ তাকে সংরক্ষিত আসনের প্রার্থী মনে করছেন।
“তারা জানতে চাচ্ছেন, পুরুষ প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি আমাকেও একটি ভোট দিতে হবে কিনা? তাদের বুঝিয়ে বলতে হচ্ছে যে, বিষয়টা সেরকম না।”
দীপা বলেন, “আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে উনারা সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর পদে ভোট দিয়েছেন। অনেকে বিষয়টি সেরকম মনে করছেন। নারীরা সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হয়, এই প্র্যাকটিস কম থাকার কারণে এই সমস্যা হচ্ছে।”
দীপা মজুমদার বলেন, “উঠান বৈঠক করে তিনটি ওয়ার্ডের ভোটারদের বুঝিয়ে বলতে পেরেছি। কিন্তু সব ওয়ার্ডে এভাবে বোঝানোর মতো সময় হয়ত পাব না। দীর্ঘ দিনের সাংগঠনিক পরিচিতির কারণে মানুষ ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে।
“তবে খুব অল্প হলেও কিছু মানুষ পাচ্ছি, যাদের প্রচারের সময় লিফলেট দিলেও সেটি আমার কাছ থেকে নিতে চাইছেন না আমি নারী বলে। এই সংখ্যা হয়ত এক শতাংশ।”
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে মেসেঞ্জারে এবং ফেইসবুকে হুমকি পাচ্ছেন জানিয়ে দীপা মজুমদার বলেন, “এরা আওয়ামী লীগ ঘরানার। তারা বলছে, ভোটে অংশ নিয়ে আমরা নির্বাচনকে জায়েজ করছি।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত তার প্রচারের খোঁজ নিচ্ছে দাবি করে তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন ভোটে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ রাখতে পারছে না এবং ‘ক্ষমতাবানদের’ বেশি তোষামোদ করছে বলেও অভিযোগ দীপার।
বুধবার ইপিজেড ও গোসাইলডাঙ্গা এলাকায় প্রচার চালান দীপা। এর মধ্যে মঙ্গলবার সিজিএস কলোনি এবং সোমবার সল্টগোলা এলাকায় ভোট চান তিনি। বেশির ভাগ সময় শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে গিয়ে ভোট চান তিনি।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর–পতেঙ্গা) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩৬১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৪২ হাজার ৯৪২ জন।
‘ব্যানার লাগালেই নিয়ে যাচ্ছে’
প্রচারের মাঠ কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- দুই ক্ষেত্রেই সংকটে থাকার কথা বলেন চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আকতার।
তিনি বলেন, “ফটিকছড়িতে একমাত্র নারী প্রার্থী আমি। কিন্তু ভোটের মাঠে যতটা সহযোগিতা পাব আশা করেছিলাম, সেটা পাচ্ছি না। কোনো এলাকায় ব্যানার লাগিয়ে গেলে কিছুক্ষণ পরই তা নিয়ে যাচ্ছে। এলাকার ছেলেদের দিয়ে নাকি ব্যানার লাগাতে হবে।
“আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী। সব এলাকায় লোক দিয়ে ব্যানার লাগাতে পারব? আমার অত টাকা কোথায়? আমার ফেইসবুক আইডি হ্যাক হয়ে গেছে। কোনো পোস্টও করতে পারছি না।”
প্রচারণায় গিয়ে ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ততা দেখতে পাচ্ছেন না তুলে ধরে জিন্নাত আকতার বলেন, “বেশির ভাগ ভোটার ভয়ভীতির মধ্যে আছে। জেলা প্রশাসককেও বলেছি, নির্বাচনের উৎসবমুখর পরিবেশ আমাদের এলাকায় নেই। ১৪০টি কেন্দ্রের মধ্যে প্রশাসনের হিসেবেই ৯৮টি ঝুঁকিপূর্ণ।
“তাই মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সভায় বলেছি, সেনাবাহিনীকে যেন ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারসহ স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়। কাউকে যেন অহেতুক হয়রানি করা না হয়।”
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ২৬৭ জন।