Published : 02 Sep 2026, 08:19 PM
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক-এগারোর সময়ের ‘নির্যাতনের স্মৃতিচিহ্ন’ এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন তার অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
তিনি বলেছেন, তাদের দলের চেয়ারম্যান প্রতিশোধ নিতে চাননি, তার বদলে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন দেশের উন্নয়নে।
বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে তারেক রহমানের ‘১৯তম কারামুক্তি দিবস’ উপলক্ষে উত্তরাঞ্চল ছাত্রফোরাম আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন রুমন।
তিনি বলেন, “কাল ৩ সেপ্টেম্বর আমাদের প্রিয় নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কারামুক্তি দিবস। তাকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছিল। সেই নির্যাতনের স্মৃতিচিহ্ন এখনও তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন।
“কিন্তু আমাদের প্রিয় নেতা নিজেই বলেছেন, তিনি সেই দিনগুলো মনে রাখতে চান না। আমরা যদি সেই দিনগুলোর কথা মনে রাখি, প্রতিশোধ নিতে যাই, তাহলে পাঁচ বছরেও শেষ হবে না।”
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব বলেন, “পাঁচ বছরে যদি আমরা সেই প্রতিশোধগুলোই নিতে যাই, তাহলে বাংলাদেশের জনগণ আমাদের প্রিয় নেতাকে ভোটের মাধ্যমে তাদের যে আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রধানমন্ত্রী করেছেন, সেই কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য সফল হবে না।
“আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমান চান দুঃসহ স্মৃতিগুলো পেছনে ঠেলে দেশের উন্নয়ন করে সামনে এগিয়ে যেতে।”
২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মত তার ছেলে তারেক রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে অকথ্য নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
মুক্তি পাওয়ার পর তিনি স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে চলে যান। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন ভেঙে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। তার নেতৃত্বেই গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান।
গত ১৬ জুন ঢাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় জরুরি অবস্থার সময়ের সেই নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে প্রথমবারের মত প্রকাশ্যে কথা বলেন তারেক রহমান।
সেদিন তিনি বলেন, “আমি জেলের মধ্যে থেকে এসেছি, আমি শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়েছি, মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়েছি। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের চিন্তাটা হল–হ্যাঁ হয়েছে। আমি অনেক কিছু বলতে পারি যে, আমি এই হারিয়েছি, ওই হারিয়েছি; এ এটার জন্য দায়ী, সে সেটার জন্য দায়ী।
“এখনো এক্সরে করলে হয়ত দেখা যাবে আমার পিঠের হাড্ডিটা বাঁকাভাবে একটু লেগে আছে। যেহেতু প্রায় অনেকদিন এটা করে ফেলে রাখা হয়েছিল… প্রপার টাইমে চিকিৎসা করা হয়নি, সেজন্য হয়ত একটু বাঁকাভাবে রয়ে গিয়েছে। চার সপ্তাহর মধ্যে হাড্ডি জোড়া লেগে যায়।”
তারেক রহমান সেদিন বলেন, “এখন যারা এটার জন্য দায়ী, আমি যদি… হয়ত সেটা করা আমার জন্য পসিবল, কিন্তু আমার হাড্ডি তো জোড়া লাগবে না, আমি এখনো যে পেইনটা মাঝে মাঝে অনুভব করি, আমার সেই পেইনটা কি চলে যাবে? বন্ধ হয়ে যাবে? তা তো হবে না।
“আমার মনে হয় সেজন্যই আমাদের এই মাইন্ডসেট থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। আপনি এখনো বেঁচে আছেন, আপনি এখনো চলছেন, আপনি এখনো ফিরছেন, এখনো আপনার পরিবার আপনার সাথে আছেন। আমাদের চিন্তা করা উচিত এভাবে যে, আমরা এখন কি কন্ট্রিবিউট করতে পারি ফর দি নেশন, ফর দি কান্ট্রি।
“হ্যাঁ, আমার এই ক্ষতি হয়ে গেছে, এর রিটার্ন আমার আসবে না। এটা থেকে আমাদের অবস্থান একটু পরিবর্তন করা উচিত… এই কথাটা আপনাদেরকে বলছি। আমাকে দয়া করে সাহায্য করবেন এই কথাটা আমার নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।”
২০০৭ সালের ৭ মার্চ গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন তারেক রহমান। এর পর থেকে বিএনপি দিনটি তার ‘কারামুক্তি দিবস’ হিসেবে পালন করে।
উত্তরাঞ্চল ছাত্র ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত এ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
‘দুঃসময়ের স্মৃতি’
আতিকুর রহমান রুমন বলেন, “প্রিয় নেতার ১৯তম কারামুক্তি দিবসে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই দুঃসময়ের করুণ স্মৃতিগুলো। বিগত ১৯ বছরে এই দিবসটি যথাসময়ে আমরা পালন করেছি, আজও পালন করছি। কিন্তু আজকের চিত্র আর ওই দুঃসময়ের চিত্র এক ছিল না।
“আমরা কীভাবে সে সময়ে অনুষ্ঠান সফল করেছিলাম আপনারাই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। সে সময় এই দিবস পালন করতে গিয়ে স্বৈরাচারের চোখ রাঙানি, কারাবরণসহ বিভিন্নভাবে আপনারা নির্যাতিত হয়েছেন। তবুও চুপ থাকেননি। আমাদের অনুষ্ঠান হবে, আমরা সাংবাদিকদের জানিয়েছি, আর জানিয়েছি বিশ্বস্ত নেতাদের। আমরা অনেকটা গোপনে ডেকেছি, প্রশাসনকে জানতে দিইনি কোথায়, কখন অনুষ্ঠান হবে।”
রুমন বলেন, “ওই সময় অনেক সাংবাদিকের কথা মনে পড়ে, যারা আমাদের ভীষণভাবে সহযোগিতা করেছেন, যা অতুলনীয়। যাদের সহযোগিতায় আমরা প্রচার পেয়েছি, আমরা উদ্দীপনা পেয়েছি এবং আমরা অনুষ্ঠানগুলো সফল করতে পেরেছি।“
‘ষড়যন্ত্র হচ্ছে, সর্তক থাকতে হবে’
নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে রুমন বলেন, “বিগত সময় বিএনপি যখন দেশ পরিচালনা করেছে, ঠিক ওই সময় আমাদের প্রিয় নেতাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল। এই ষড়যন্ত্র থেকে আমাদের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে যেন আমাদের প্রিয় নেতার ভালো কাজগুলো ভূলুণ্ঠিত না হয়।”
ছাত্রদল, যুবদলসহ বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমানের ভালো কাজগুলো যেন আমরা হাতে হাত মিলিয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সফল করতে পারি। আমাদের বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, এদেশের জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস।
“এদেশের জনগণ সেই প্রমাণ রেখেছে একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। স্বৈরাচার এরশাদ ও ওয়ান-ইলেভেন সরকারকে হটিয়েছেন তারা। সর্বশেষ ছাত্র-জনতা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জুলাইয়ে যুদ্ধ করে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার মত দানব স্বৈরাচারকে হটিয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের সভাপতিত্বে সভায় ভূমি প্রতিমন্ত্রী ও উত্তরাঞ্চল ছাত্রফোরামের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নাজমুল হাসান, ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ এর সদস্য সচিব মোকছেদুল মোমিন মিথুনসহ উত্তরাঞ্চলের ছাত্রনেতারা বক্তব্য দেন।